সংকলনে- হাবিবা মুবাশ্বেরা
দুআ’র গুরুত্ব
’ দুআ ’ শব্দের অর্থ আল্লাহকে ডাকা, কিছু চাওয়া, প্রার্থনা করা। দুআ’র মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার বিশেষ যোগসূত্র তৈরি হয়।
দুআ এমন একটি ইবাদত যা একদিকে বান্দার আনুগত্য, অক্ষমতা ,অসহায়ত্ব,বিনয়, নিরহংকারিতার প্রকাশ ঘটায়, অপর দিকে আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ব, সর্বব্যাপী ক্ষমতা ও সীমাহীন দয়ার প্রতি বান্দার সুগভীর বিশ্বাসকে তুলে ধরে।
আল্লাহ নিজেও তাঁর নিকট দুআ করাকে পছন্দ করেন।
রাসুল (সা.) বলেন,
‘আল্লাহর নিকট বান্দার দুআ অপেক্ষা অধিক মূল্যবান জিনিস আর কিছু নেই।’
( তিরমিজি : ৩২৯২)
অপর দিকে যারা তাঁর কাছে দুআর মাধ্যমে সাহায্যপ্রার্থী হয় না তাদের প্রতি তিনি অসন্তুষ্ট হন।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) বলেন—
‘যে আল্লাহর কাছে চায় না, আল্লাহ তার প্রতি নারাজ হন । ’ ( তিরমিজী ২৬৮৬)
দুআ’র ক্ষমতা এতটাই শক্তিশালী যে, তা তাকদীরকে পর্যন্ত পরিবর্তন করতে পারে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা:) বলেছেন-
“দুআই কেবলমাত্র তকদীরকে পরিবর্তন করতে পারে। আর নেক কাজই একমাত্র হায়াতকে বৃদ্ধি করতে পারে। নিশ্চয়ই মানুষ তার রিযিক থেকে বঞ্চিত হয় তার কৃত গোনাহের কারণে। ”
( তিরমিযী :২১৩৯)
দুআর গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল (সা:) বলেন-
” দুআ হচ্ছে ইবাদতের মগজ বা মূল। ”
মানুষের কাছে কোনো কিছু বারবার চাইলে সে স্বাভাবিকভাবেই বিরক্ত হয়। এমনকি সবচেয়ে আপন মানুষও তার কাছে বারবার চাওয়া পছন্দ করে না। অথচ আল্লাহর কাছে যে বান্দা যতো বেশি চায় আল্লাহ তাকে ততো বেশি পছন্দ করেন।
রাসূল (সা:) বলেছেন-
“ তোমাদের প্রত্যেকেই যেন আল্লাহর কাছে নিজ প্রয়োজন পূরণের জন্য দুআ করে। এমনকি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলেও আল্লার কাছে দুআ করবে । ” (তিরমিজী)
এখানে ’জুতার ফিতা’ কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বান্দা যেন তার সবচেয়ে ছোট প্রয়োজনটিও আল্লাহর কাছে চাইতে পারে সে ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহর কাছে বান্দার সব প্রয়োজনই গুরুত্বপূর্ণ। বরং তিনি যখন দেখেন বান্দা নিজের যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য তার মুখাপেক্ষী হচ্ছে তখন আল্লাহ অনেক বেশি সন্তুষ্ট হন।
দুআ’র আদব
# দুই হাত উত্তোলন করা :
দুই হাত উত্তোলন করে দুআ করা উত্তম।
সালমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) বলেছেন,
‘নিশ্চয়ই তোমাদের সুমহান রব হচ্ছেন লজ্জাশীল ও মহান দাতা। বান্দা যখন তাঁর কাছে দু’হাত তোলে তখন তিনি সে হাতদ্বয় শূন্য ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন’। (আবু দাউদ)
এ সময় হাতের তালু থাকবে আকাশের দিকে।
মালেক বিন ইয়াসার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) বলেছেন,
‘যখন তোমরা আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইবে তখন হাতের তালু দিয়ে চাইবে; হাতের পিঠ দিয়ে নয়’। (আবু দাউদ)
# ক্বিবলামুখী হওয়া
দুআ করার সময় ক্বিবলামুখী হয়ে দুআ করা উত্তম।
উমর বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
বদর যুদ্ধের দিন রাসূল (সা:) মুশরিকদের দিকে তাকালেন; তাদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। আর তাঁর মুসলিমদের সংখ্যা ছিল তিনশত ঊনিশ। তখন তিনি ক্বিবলামুখী হয়ে হাত প্রসারিত করলেন, তারপর তাঁর রবকে ডাকতে শুরু করলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছেন সেটা বাস্তবায়ন করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটা দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি যদি মুসলমানদের এ দলটিকে ধ্বংস করে দেন তাহলে পৃথিবীতে আপনার ইবাদত হবে না’। এভাবে দুই হাত প্রসারিত করে ক্বিবলামুখী হয়ে তাঁর রবকে ডাকতে থাকলেন। (মুসলিম)
ইমাম নববী (রহঃ) ‘শারহু মুসলিম’ গ্রন্থে বলেন, এই ঘটনায় ক্বিবলামুখী হওয়া ও দুই হাত তুলে দুআ করা মুস্তাহাব হওয়ার পক্ষে প্রমাণ রয়েছে।
# নীরবে-নিভৃতে দুআ করা :
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের রবকে ডাকো।’ (সূরা আরাফ:৫৫)।
আল্লাহ তা‘আলা যাকারিয়া (আঃ)-এর প্রশংসা করে বলেন,
‘যখন তিনি তাঁর রবকে ডেকেছিলেন নিভৃতে’। (সূরা মারিয়াম:৩)
# তাড়াহুড়া না করা
রাসূল (সা:) বলেন-
বান্দার দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করা হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দা ফলাফল প্রাপ্তিতে তাড়াহুড়া করে।
জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাড়াহুড়া বলতে কী বুঝাচ্ছেন?
তিনি বললেন, বান্দা বলে যে, আমি দুআ করেছি, আমি দুআ করেছি। কিন্তু আমার দুআ কবুল হতে দেখিনি। তখন সে ব্যক্তি উদ্যম হারিয়ে ফেলে এবং দুআ করা ছেড়ে দেয়’। (বুখারী)
# মনোযোগী হওয়া
দুআ করার সময় পূর্ণ মনোযোগ থাকতে হবে। রাসূল (সা:) বলেন-
’আল্লাহ তা‘আলা অবহেলাকারী ও অমনোযোগী অন্তরের দুআ কবুল করেন না’। (আবু দাউদ)
# নবী করীম (সা:)-এর ওপর দরূদ পড়া
দুআর আরেকটি আদব হচ্ছে রাসূল (সা:)-এর উপরে দরূদ পাঠ করা। রাসূল (সা:) বলেন-
’দুআ আকাশ ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, তোমার নবীর প্রতি যতক্ষণ তুমি দরূদ পাঠ না করো ততক্ষণ তার কিছুই উপরে উঠে না’। (তিরমিজী)
দুআ করার উৎকৃষ্ট সময়
আল্লাহতায়ালা যে কোনো সময় বান্দার দুআ কবুল করেন। তবে কুরআন,হাদিসে বিশেষ কিছু সময়ের কথা উল্লেখ রয়েছে, যখন দুআ করলে তা কবুলের সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেমন :
# শেষ রাতে :
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন,
“ আল্লাহতায়ালা প্রতিদিন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, ‘কে আছো এমন, যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছো এমন, যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে তা দেব। কে আছো এমন, আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।” (বুখারি : ১০৭৯)।
# ফরজ নামাজের পরে :
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) কে প্রশ্ন করা হলো-
কোন সময়ের দুআ কবুল হয়? উত্তরে তিনি বললেন,
“রাতের শেষাংশে এবং ফরজ নামাজসমূহের পেছনের সময়। (অর্থাৎ, সালাম ফেরানোর আগে)। ” (তিরমিজি : ৩৪৯৯)।
# আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে :
রাসুল (সা.) বলেছেন,
“আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া কখনো প্রত্যাখ্যাত হয় না। ” (আবু দাউদ : ৫২১)
# জুমার দিন আসর ও মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ের দুআ
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন,
“ সূর্য উদয় হওয়া দিনসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন। এ দিন এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, কোনো মুসলিম যখন নামাজ অবস্থায় এই মুহূর্তটি পায়; আর সে আল্লাহর কাছে কিছু আশা করে, তখন অবশ্যই আল্লাহ তার এই আশা পূরণ করেন।”
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে সালামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে এই হাদিস প্রসঙ্গে জানালাম।
তিনি বললেন, আমি সে সময়টি জানি।
আমি বললাম, তাহলে আমাকেও বলে দিন, এ ব্যাপারে কৃপণতা করবেন না।
তিনি বললেন, এ সময়টি আসরের পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত।
আমি বললাম, তা কী করে আসরের পর হতে পারে? অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, বান্দা নামাজ অবস্থায় এই মুহূর্তটি পায়। কিন্তু আপনি যে সময়ের কথা বলেছেন, তখন তো নামাজ আদায় করা হয় না।
আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বললেন; রাসুল (সা.) কি বলেননি, যে ব্যক্তি নামাজের অপেক্ষায় বসে থাকে প্রকারান্তরে সে নামাজেই থাকে?
আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, সেটাই এ সময়। ” (তিরমিজি : ৪৯১)।
# রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পরে :
যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে এ দুআ পড়ে,
“ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহূ লা শারীকা লাহূ, লাহুল মুল্কু ওয়া লাহুল হাম্দু ওয়া হুয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। আলহাম্দুলিল্লাহি ওয়া সুবহানাল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”
তারপর বলে, হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। বা (অন্য কোনে) দুআ করে, তাঁর দুআ কবুল করা হয়’।[বুখারী)
# দুআ ইউনুস পাঠ করার পর
রাসূল (সা:) বলেছেন,
“ ইউনুস (আ:) যখন মাছের পেটের ভিতর ছিলেন তখন যে দুআ পড়েছিলেন – লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যালিমীন।
কোনো মুসলিম এটা পাঠ করে দুআ করলে তার দুআ কবুল করা হবে। ” (তিরমিজী)
# কদরের রাতে :
রাসুল (সা.) বলেছেন,
“যে লাইলাতুল কদরে ইমানের সঙ্গে সাওয়াবের আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তার পেছনের সমস্ত গোনাহ মাফ করা হবে। আর যে ঈমানসহ সাওয়াবের আশায় রমজানে রোজা রাখবে, তারও অতীতের সমস্ত গোনাহ মাফ করা হবে।” (বুখারি : ১৭৮০)।
আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, একবার আমি নিবেদন করলাম, আল্লাহর রাসুল, আপনি বলুন, যদি আমি শবেকদর সম্পর্কে জানতে পারি তাহলে তাতে কী (দোয়া) পড়ব? তিনি (রাসুল (সা.) বললেন, এই দোয়া,
‘হে আল্লাহ, আপনি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, ক্ষমা করা ভালোবাসেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ (তিরমিজি : ৩৫১৩)।
# সিজদারত অবস্থায় :
রাসূল (সা: ) বলেছেন-
”সিজদারত অবস্থায় বান্দা তার রবের সবচাইতে অধিক নিকটবর্তী হয়। সুতরাং তোমরা (সিজদায়) বেশী বেশী দুআ করবে।” (মুসলিম)
# কারও অনুপস্থিতিতে তার জন্য দুআ করলে
আবুদ দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা: ) বলেছেন-
“ যখন কোনো ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের জন্য তার অনুপস্থিতিতে দুআ করে তখন তার সাথে নিযুক্ত ফেরেশতা বলতে থাকেন, আল্লাহ তোমাকেও অনুরূপ দান করুন। আল্লাহ তোমাকেও অনুরূপ দান করুন। ” (মুসলিম : ২৭৩২ )
এছাড়া কোরআন তেলাওয়াতের পর, বৃষ্টির সময়, মোরগ ডাকলে, জমজমের পানি পানকালে,যুদ্ধের ময়দানে দুআ করলে তা কবুল হয়।
দুআ করার উৎকৃষ্ট স্থান
# কাবাঘরে দৃষ্টি পড়ার সময়: পবিত্র কাবার দিকে তাকিয়ে দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়। হজরত ইবনে জুরাইজ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) কাবা শরিফকে দেখে এই দোয়া পড়েছিলেন—
হে আল্লাহ! আপনি এই ঘরের সম্মান, মর্যাদা ও মহিমা বৃদ্ধি করে দিন। এবং যে ব্যক্তি এই ঘরের হজ ও ওমরাহ করে তারও সম্মান মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিন।’ (মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার: ৯৭৯৬)
# হাজরে আসওয়াদের নিকট: হজরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) হাজরে আসওয়াদকে দুই ঠোঁটে চুমু খেয়ে লম্বা সময় ধরে কান্নাকাটি করলেন। এরপর তাকিয়ে দেখলেন উমর (রা.)-ও কান্নাকাটি করছেন। বললেন, উমর! এটা অশ্রু ঝরার স্থান!’ (ইবনে মাজাহ: ২৯৪৫)
# আরাফাতের ময়দান: হজের সময় আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিন অর্থাৎ ৯ জিলহজ বান্দার দোয়া কবুল করা হয়।
হজরত আমর ইবনে শুয়াইব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন,
‘আরাফাতের দিনের দোয়া হলো সর্বোত্তম দোয়া।’ (তিরমিজি: ৩৫৮৫)
# মুজদালিফা: হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) মুজদালিফায় অবস্থানকালে বলেছেন,
‘তোমরা আল্লাহকে ডাকো। তোমাদের দোয়া কবুলের কিছু স্থান আছে। তবে জেনে রেখো আল্লাহতায়ালা গাফেল অন্তরের দোয়া কবুল করেন না।’ (তিরমিজি: ৩৪৭৯)
# জামারার নিকট: হাদিসে এসেছে, ‘হজরত ইবনে উমর (রা.) জামারায় সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন এবং প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের সময় তাকবির দিলেন। এরপর কেবলার দিকে মুখ করে লম্বা সময় দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে দোয়া করলেন। হজরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, আমি এভাবে রাসুল (সা.)-কে করতে দেখেছি।’ (বুখারি: ১৭৫২)
# মুলতাজাম: হজরত আমর ইবনে শুয়াইব (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি ইবনে উমর (রা.)-এর সঙ্গে হজে ছিলাম। ইবনে উমর (রা.) হাজরে আসওয়াদ ও কাবা শরিফের দরজার মাঝের দেয়ালের নিকট দাঁড়ালেন। নিজের বুক, দুই হাত ও কপাল লাগিয়ে দুআ করলেন এবং বললেন—রাসুল (সা.)-কে আমি এভাবেই করতে দেখেছি।’ (ইবনে মাজাহ: ২৯৬২)
এসব স্থান ব্যতীত পুরো হারাম শরিফেও দোয়া কবুল হওয়ার কথা বর্ণিত আছে।
দুআকে কার্যকরী ও শক্তিশালী করার উপায়
আরবিতে একটি শব্দ রয়েছে ‘তাওয়াসসুল’ । এর অর্থ নিজের দুআকে আরো বেশি কার্যকর ও গ্রহণীয় করে তোলা। ‘তাওয়াসসুল’ এর অনেকগুলো উপায় আছে। নিচে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো-
# আমলে সালিহ বা নেক কাজ করার মাধ্যমে দুআ করা
এই নেক কাজ অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে। রিয়া বা লোক দেখানোর জন্য করলে হবে না। যদি কোনো গুনাহর কাজও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা উল্লেখ করে দুআ করা যাবে।
উদাহরণ হিসেবে কুরআনের একটি দুআ’র কথা বলা যায়-
“হে আমার প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং আপনি আমাদের পাপ ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৬)
এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের পাপ মোচনের জন্য দুয়া শিখিয়েছেন। আমরা আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের জন্য এবং জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য দুয়া করছি ঠিকই কিন্তু তার আগে ঈমানের বিষয়টিও পরিষ্কার করেছি।
কুরআন থেকে আরেকটি উদাহরণ
“হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ নাযিল করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী। আমি নিঃস্ব ও অসহায়।” ( সূরা কাসাস: ২৪)
মুসা (আ:) এই দুআটি করেছিলেন দুইজন সম্পূর্ণ অপরিচিত নারীকে তাদের গৃহপালিত পশুকে পানি পান করানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করার পর। তিনি এই উপকারের বিনিময়ে উক্ত নারীদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান আশা করেননি। কিন্তু মহান আল্লাহতাআলা ঠিকই তার এই নিঃস্বার্থ উপকারকে স্বীকৃতি দিয়ে তার পুরস্কার স্বরূপ তার দুয়াকে কবুল করে নিয়েছিলেন।
এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই মুসা (আ:) একই সাথে চাকরি, বাসস্থান এবং উত্তম জীবন সঙ্গী পেয়ে যান।
এই ঘটনা থেকে আমরা দুআ কবুলের ক্ষেত্রে নেক আমলের গুরুত্ব বুঝতে পারি।
হাদীস থেকে উদাহরণ
আবদুল্লাহ ইবনে উমার (র) থেকে বর্ণিত, নবিজি বলেছেন-
একবার তিনজন লোক পথ চলছিল । তারা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হলো। অতঃপর তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ পাহাড় থেকে এক খন্ড পাথর পড়ে তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তারা একে অপরকে বলল, নিজেদের কৃত সৎ কাজের কথা চিন্তা করে বের করো যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়েছে এবং তার উছিলা করে আল্লাহর নিকট দোয়া করো। তাহলে হয়তো আল্লাহ আমাদের ওপর হতে পাথরটি সরিয়ে দেবেন।
তাদের একজন বলতে লাগলো, ”হে আল্লাহ!! আমার আব্বা ,আম্মা খুব বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট সন্তানও ছিল। আমি তাদের ভরণপোষণের জন্য পশুপালন করতাম, সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরতাম তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তানদের আগে আমার আব্বা, আম্মাকে পান করাতাম।
একদিন আমার ফিরতে দেরি হয় । এসে দেখি ,তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। তখন দুধ দোহন করলাম, যেমন প্রতিদিন দোহন করি। তারপর তাদের জন্য সে দুধ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তাদেরকে জাগানো পছন্দ করিনি এবং তাদের আগে আমার বাচ্চাদের পান করানো অসংগত মনে করেছি অথচ বাচ্চাগুলো দুধের জন্য আমার পায়ের কাছে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। এভাবে ভোর হয়ে গেল।
হে আল্লাহ! আপনি জানেন, আমি যদি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্য এ কাজ করে থাকি তবে আপনি গুহার মুখ হতে পাথরটা খানিক সরিয়ে দিন, যাতে আমরা আসমানটা দেখতে পাই।”
তখন আল্লাহ পাথরটিকে একটু সরিয়ে দিলেন এবং তারা আসমান দেখতে পেল।
দ্বিতীয় ব্যক্তি বললো, “ হে আল্লাহ!! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। পুরুষরা যেমন মহিলাদের ভালোবাসে, আমি তাকে তার চেয়েও অধিক ভালোবাসতাম। একদিন আমি তাকে কাছে পেতে চাইলাম। (অর্থ্যাৎ খারাপ কাজ করতে চাইলাম)। কিন্তু সে অস্বীকার করলো এবং বললো,আমি যেন তার জন্য ১০০ দিনার নিয়ে আসি।
অনেক চেষ্টা করে আমি তা জোগাড় করলাম এবং তার কাছে গেলাম। যখন আমি সম্ভোগ করতে তৈরি হলাম, তখন সে বললো, “হে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় করো। অন্যায়ভাবে আমার কুমারীত্ব নষ্ট করো না।”
তখন আমি থেমে গেলাম।
”হে আল্লাহ আপনি জানেন, আমি শুধু আপনার সন্তুষ্টির জন্যই সেদিন পাপ কাজ থেকে বিরত ছিলাম, অতএব, আপনি আমাদের জন্য পাথরটা সরিয়ে দিন। তখন পাথরটা আরো একটু সরে গেল।
তৃতীয় ব্যক্তি বললো,” হে আল্লাহ! আমি এক ফারাক চালের বিনিময়ে একজন শ্রমিক নিযুক্ত করেছিলাম। যখন সে তার কাজ শেষ করলো, আমি তাকে তার পাওনা দিতে গেলে সেটা নিল না। আমি তা দিয়ে কৃষিকাজ করতে লাগালাম এবং এর দ্বারা অনেক গরু ও রাখাল জমা করলাম। বেশ কিছুদিন পর সে আমার কাছে এলো এবং বললো, “আল্লাহকে ভয় করো, আমার মজুরি দাও।”
আমি বললাম, ”এইসব গরু ও রাখাল নিয়ে যাও ।”
সে বললো, ”আল্লাহকে ভয় করো, আমার সাথে ঠাট্টা করো না।”
আমি বললাম, ”আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, এগুলো নিয়ে যাও।”
তখন সে তা নিয়ে গেল। ” হে আল্লাহ! আপনি জানেন, যদি আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজটি করে থাকি, তবে পাথরের বাকিটুকু সরিয়ে দিন।”
তখন আল্লাহ পাথরটিকে সরিয়ে দিলেন। এর ফলে পাথরটি সম্পূর্ণ সরে গেল এবং সকলেই গুহা থেকে মুক্তি পেল। (সহীহ বুখারী ২৩৩৩)
# নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দুয়া করা।
আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার সময় নিজের অসহায়ত্ব ও কঠিন অবস্থা তুলে ধরে দুয়া করলে তা দ্রুত কবুল হওয়া সম্ভবনা থাকে। আর্থিক সংকট, পারিবারিক অশান্তি, শারীরিক অসুস্থতা– যে কোনো সমস্যায় দুনিয়ার কোনো মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়ে সরাসরি আল্লাহর কাছে নতজানু হয়ে দুয়া করলে রাহমানুর রাহিম তা সমাধান করে দিতে সক্ষম।
কুরআন থেকে উদাহরণ
নূহ (আ:) যখন তার শত্রুদের হুমকির মুখে অসহায়ত্ব অনুভব করেছিলেন তখন তিনি আল্লাহর কাছে দুয়া করেছিলেন এভাবে-
“আমি অক্ষম। অতএব আপনি এর একটি সমাধান করুন।” (সূরা কামার: ১০)
# আল্লাহর গুণবাচক নাম উল্লেখ করে দুয়া করা
আল্লাহর গুণবাচক নাম ব্যবহার করার বিষয়টি পবিত্র কুরআনে অনুমোদন করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন-
” আর আল্লাহ’র জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাকো এবং দুয়া করো।” সূরা আরাফ ( ১৮০)
আমরা কোনো একটি দুয়ায় আল্লাহ’র সেই নামটিই ব্যবহার করবো, যা প্রাসঙ্গিক। যেমন-
যখন আমরা ক্ষমা চাইবো তখন বলবো, “ ইয়া গাফুর, ইয়া গাফফার।”
যদি আমরা আল্লাহর করুণা ও নিয়ামত ভিক্ষা চাই তাহলে বলবো- “ ইয়া রহমানু, ইয়া রহিম।”
যদি আমরা রিজিকে এবং টাকা পয়সায় বরকত চাই তাহলে আল্লাহকে ডাকবো- “ইয়া রাজ্জাক. ইয়া কারিম. ইয়া মান্নান।” বলে।
যদি আমরা অসুস্থ হই, তাহলে সুস্থতা কামনা করে আল্লাহকে ডাকবো, “ ইয়া শাফি, ইয়া কাফি। ”
আর যখন সন্তানের জন্য দুয়া করবো তখন বলবো, “ইয়া খাইরুল ওয়ারিসিন।”
আল্লাহ’র নামের সবচেয়ে বড় মুজিজা হলো, আমরা যে সমস্যাতেই পড়ি না কেন তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আল্লাহর সিফাতি নাম ঠিকই পেয়ে যাবো।
বিশেষ করে আল্লাহর এমন দুটো নাম আছে, যা সব ধরনের দুয়ার সাথেই উল্লেখ করা যায়। কুরআনেও এই দুইটি নাম সবচেয়ে বেশিবার উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো, “আল্লাহুম্মা, আর অন্যটি হলো “রব্বানা” বা “রাব্বি।”
আল্লাহুম্মা নামটি বলে আমরা স্বীকার করে নিই, একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাবতীয় ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, শুধু তারই ইবাদত করা যায়। আল্লাহুম্মা বলে আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি।
আর রব্বানা বলার মাধ্যমে আল্লাহকে আমাদের অভিভাবক, সকল সমস্যার সমাধানদাতা এবং সর্বোপরি প্রতিপালক হিসেবে মেনে নিই।
# কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দুয়া করা
ইতিপূর্বে আল্লাহ আমাদেরকে যেভাবে সাহায্য করেছিলেন, যেভাবে কোনো একটি বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন তা উল্লেখ করে আবারও আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া যায়-এটাই কৃতজ্ঞতা।
কুরআন থেকে উদাহরণ
যাকারিয়া (আ:) যখন বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সন্তান লাভের আশায় দুয়া করেছিলেন তখন তিনি দুয়া করেছিলেন এভাবে-
“হে আমার পালনকর্তা! আপনাকে ডেকে আমি কখনো বিফল মনোরোথ হইনি।” (সূরা মারইয়াম:৪)
# ভবিষ্যতে কিছু করার আশ্বাস দিয়ে দুয়া করা
আমরা এভাবে দুয়া করতে পারি, “ হে আল্লাহ!! আমাকে আর্থিক সামর্থ্য দিন, তাহলে আমি একটি মসজিদ নির্মাণ করবো।”
এভাবে দুআ করা অনুমোদিত হলেও তা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এভাবে শর্ত জুড়ে দেয়া, আল্লাহর কাছে ওয়াদা করার নামান্তর। যদি এই শর্ত পূরণ করতে আমরা ব্যর্থ হই, তবে আমরা আল্লাহর সাথে শর্ত ভঙ্গকারী হিসেবে গণ্য হবো এবং আমাদের পরিণতি হবে মুনাফিকদের মতো।
কুরআন থেকে উদাহরণ
মূসা (আ:) যখন ফেরাউনকে তাওহীদের দাওয়াত দেয়ার জন্য আল্লাহ’র কাছ থেকে আদেশপ্রাপ্ত হলেন, তখন তিনি তাঁর সাহায্যকারী হিসেবে তার ভাইকে নবুয়ত দেয়ার জন্য আল্লাহ’র কাছে এভাবে দুআ করলেন-
” যাতে আমরা বেশি করে আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারি এবং বেশি করে আপনাকে স্মরণ করতে পারি।” ( সূরা ত্বাহা: ৩৩-৩৪)
এই দুয়া আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যে, আল্লাহর কাছে দুয়া করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কিছু করার আশ্বাস দেয়ার সুযোগ আছে।
তবে আমরা যদি নিজেদের ওয়াদা পূরণের প্রতি আস্থাশীল হই, তবেই এভাবে দুয়া করার ঝুঁকি নিতে পারি। এক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী মুনাফিকদের শাস্তির কথা মাথায় রাখতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে-
“ তাদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছে, যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছিল-” তিনি যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ দান করেন, তবে অবশ্যই আমরা ব্যয় করবো এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকবো।” অতঃপর যখন নিজ কৃপায় তাদের দান করলেন,তখন তারা এ বিষয়ে কার্পণ্য করল এবং বিরুদ্ধভাবাপন্ন হয়ে মুখ ফেরালো। পরিণামে তিনি তাদের অন্তরে কপটতা স্থিত করলেন আল্লাহর সাথে তাদের সাক্ষাৎ দিবস পর্যন্ত । কারণ তারা আল্লাহর নিকট যে অঙ্গীকার করেছিল-সেটা ভঙ্গ করেছিল এবং এজন্য যে তারা ছিল মিথ্যাচারী। ” (সূরা তাওবা:৭৫-৭৭)
# আল্লাহর কোনো নেককার বান্দার কাছে গিয়ে দুয়া করার জন্য সুপারিশ করা
দুআ করার এই পদ্ধতিটি অনুমোদিত হলেও তা খুব বেশি উৎসাহিত করা হয় না। কারণ কুরআনে শুধু
রাসূল (সা:) এর সুপারিশ এর বিষয়েই অনুমোদন করা হয়েছে। আর এ কারণেই যতদিন নবীজি জীবিত ছিলেন সাহাবীরা তার কাছে গিয়ে সমস্যার সমাধানের জন্য দুয়া করতে অনুরোধ করতেন।
আবু হুরায়রা (রা:) এর মা শুরুর দিকে ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি এ বিষয়ে রাসূল (সা:)কে দোয়া করতে বললেন। এর পরপরই আবু হুরায়রা রা:) বাড়ির দিকে ছুটে গেলেন তিনি বাড়ি পৌঁছানোর আগেই আল্লাহ নবীজির দোয়া কবুল করে নিলেন এবং তার মা ইসলাম গ্রহণ করেন।
তাই নবীজির কাছে দুয়া করার অনুরোধ করার বিষয়টি অনুমোদিত।
কিন্তু এরপরও যদি কাউকে খুব বেশি নেককার মনে হয় তাহলে তার কাছে দোয়া চাওয়ার বিষয়টিকে ইসলামিক স্কলাররা অনুমোদন করেছেন শর্তসাপেক্ষে। শর্তটি হলো, যাকে দিয়েই দোয়া করানো হোক না কেন নিজে দোয়া করা কোনভাবেই স্থগিত করা যাবে না।
প্রসিদ্ধ ইসলামিক চিন্তাবিদরা বলেন, আল্লাহ যদি শয়তানের আবেদন মঞ্জুর করেন তাহলে আমরা তো তার থেকে নিকৃষ্ট হয়ে যাইনি, তাহলে আমাদের আল্লাহর কাছে দুয়া করতে সংকোচ বোধ করা উচিত নয়।
তাছাড়া নিজের জন্য দোয়া নিজের চেয়ে ভালো করে আর কেউই করতে পারবে না। কারণ নিজের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে পুরোপুরি অবগত থাকার কারণে যা-ই বলে দোয়া করা হোক না কেন তার নেপথ্যে যে আন্তরিকতা, সততা, একনিষ্ঠতা থাকবে তা বলাই বাহুল্য।
দুআ কবুলের ব্যাপারে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি
মহান আল্লাহ দুআ কবুলের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে কুরআনে বলেছেন-
“তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব । ” (সুরা মুমিন:৬০)
বান্দা যখন দুআ করে তখন তা কোনো না কোনোভাবে কবুল হয়। এ প্রসঙ্গে হাদীসে বলা হয়েছে-
“ যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি দুআ করে ; যে দুআতে কোনো পাপ থাকে না এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় থাকে না, তখন আল্লাহ তাআলা তিন পদ্ধতির কোনো এক পদ্ধতিতে তার দুআ অবশ্যই কবুল করে নেন। যে দুআ সে করেছে তা হুবহু সেভাবে কবুল করেন অথবা তার দুআ’র প্রতিদান আখিরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন কিংবা এ দুআর মাধ্যমে তার ওপর আগত কোনো বিপদ দূর করে দেন।” (সহীহ বুখারী)
যাদের দুআ কবুল হয়:
# অসুস্থ ব্যক্তির দুআ :
উমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) আমাকে বললেন,
“তুমি কোনো রোগীকে দেখতে গেলে তাকে তোমার জন্য দুআ করতে বলবে। কেননা তার দুআ ফেরেশতাদের দুআর মতো।” (মিশকাত : ১৪৮৮)
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন,
“তোমরা রোগীর সেবা করো এবং তাকে বলো, যেন তোমাদের জন্য দুআ করে। কেননা অসুস্থ ব্যক্তির দুআ আল্লাহ কবুল করেন। অসুস্থতার সময় আল্লাহ মানুষের গোনাহ ক্ষমা করে দেন। ” (ইবনে মাজাহ : ৩০৪৫)
# রোজা পালনকারী ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর দুআ :
রাসুল (সা.) বলেছেন,
“ তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না । ১. সায়িম বা রোজাদার ব্যক্তির দুআ যখন সে ইফতার করে ২. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দুআ ৩. মজলুমের দুআ। ’ (তিরমিজি : ৩৫৯৮)।
# সন্তানের জন্য পিতার এবং মুসাফিরের দুআ :
রাসুল (সা.) বলেছেন,
তিন ব্যক্তির দুআ নিঃসন্দেহে কবুল হয় ; মজলুম, মুসাফির এবং সন্তানের জন্য পিতার দোয়া। (সুনানু ইবনে মাজাহ : ৩৮৬২)।
# নেক সন্তানের দুআ :
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন,
“যখন কেনো মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমল ছাড়া – ১. সাদাকায়ে জারিয়া ২. উপকারী ইলম ৩. নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। ” (মুসলিম : ১৬৩১)।
# মাযলূমের দুআ :
মাযলূম বা অত্যাচারিত ব্যক্তি দুআ করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়ে না।
নবী করীম (সা:) বলেন,
”মাযলূমের দুআ হতে বেঁচে থাকো। কারণ তার ও আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা নেই। ”(বুখারী)
# যেসব কারণে দুআ কবুল হয় না
# আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব তথা শিরক করা
যখন আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নাম ধরে কোনো কিছু চাওয়া হয় তখন সে দুয়া কবুল হয় না।
# পাপ কাজে লিপ্ত থাকা
ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো পাপ কাজে জড়িয়ে থাকলে এবং সেখান থেকে ফিরে আসার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফিরে না আসলে দুয়া কবুল হয় না।
# জীবিকা হালাল না হওয়া
দো‘আর অন্যতম আদব হচ্ছে জীবিকা হালাল হওয়া। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন-
জনৈক ব্যক্তি দীর্ঘ সফর করে উষ্কখুষ্ক চুল নিয়ে ধুলিমলিন অবস্থায় দুই হাত আকাশের দিকে তুলে দো‘আ করে, ইয়া রবব, ইয়া রবব! অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, সে পরিপুষ্ট হয়েছে হারাম খেয়ে, তাহ’লে তার দো‘আ কিভাবে কবুল হবে?’
# শুধু বিপদের সময় দুয়া করা
শুধু বিপদের সময় যারা রবের শরণাপন্ন হন তাদের দুয়া কবুল না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পবিত্র কুরআনে এই জাতীয় লোকদের তিরস্কার করে বলা হয়েছে-
”আর যখন মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে শুয়ে, বসে,দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে। তারপর আমি যখন তা থেকে মুক্ত করে দিই, সে কষ্ট যখন চলে যায়, তখন মনে হয়- কখনো কোনো কষ্টের সম্মুখীন হয়ে যেন আমাকে ডাকেইনি। “ (সূরা ইউনুস:১২)
# দুয়ার সাথে কর্ম ও প্রচেষ্টার সংযোগ না থাকা
শুধু দুয়া করে বসে থাকলেই চলবে না বরং সে অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালাতে হবে ।কেননা আল্লাহ তার এই প্রচেষ্টার মধ্যে বরকত ও রহমত দিবেন, যা তার দুয়া কবুল হওয়াকে তরান্বিত করবে। তাই কেউ যদি দুয়া করে অলসভাবে বসে থাকে তাহলে আল্লাহ তার দুয়া কবুল করবেন না।।
# মানুষকে ভালো কাজে আহ্বান না করা বা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে নিষেধ না করা
মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহবান করা বা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা দুয়া কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা: ) বলেন-
”তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজে বাধা দেবে। আর যদি তোমরা তা না করো আল্লাহ তোমাদের প্রতি শাস্তি নাজিল করবেন। অতঃপর তোমরা দুয়া করবে কিন্তু তিনি তা কবুল করবেন না।”
# দুয়া কবুল হলে তাতে উল্টো ক্ষতির সম্ভাবনা থাকা
অনেক সময় আমরা মহান প্রভুর কাছে এমন অনেক বিষয়ে আবেদন করে থাকি, যার ফলাফল সম্পর্কে আমরা অবগত নই, হয়তো সেগুলো পেলে তা আমাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর হিকমাহ প্রয়োগ করে সেগুলো প্রদান করা থেকে আমাদের বিরত থাকেন।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে তিনি বলেন-
” তোমাদের কাছে হয়তো একটা বিষয় পছন্দসই নয় অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর আর হয়তোবা কোনো একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয়, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহ যা জানেন, তোমরা তা জানো না ।” (সূরা বাকারাহ: ২১৬)
এই পৃথিবীতে যদি একজন মানুষও থাকতেন যিনি কোনো কিছু চাওয়া মাত্রই বিনা শর্তে কবুল করে নেয়া হয় তাহলে তিনি হতেন আমাদের প্রিয় রাসূল (সা:) । হাদিস থেকে জানতে পারি, আল্লাহ তাঁরও সব দুয়া কবুল করেননি।
সাদ ( রা:) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন,
রাসূল ( সা:) একদিন আলিয়া হতে এসে বনু মুয়াবিয়ায় অবস্থিত মসজিদের সন্নিকটে গেলেন। অতঃপর তিনি উক্ত মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন । আমরাও তাঁর সাথে সালাত আদায় করলাম । এ সময় তিনি তাঁর রবের কাছে দীর্ঘ সময় দুয়া করলেন এবং দুয়া শেষে আমাদের দিকে মুখ ফেরালেন।
তারপর বললেন “ আমি আমার রবের কাছে তিনটি বিষয় প্রার্থনা করেছি। তিনি আমাকে দুটি প্রদান করেছেন এবং একটি প্রদান করেননি। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করেছিলাম তিনি যেন আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করেন। তিনি আমার দুয়া কবুল করেছেন। তাঁর নিকটে আরও প্রার্থনা করেছিলাম তিনি যেন আমার উম্মতকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস না করেন। তিনি আমার এই দুয়াও কবুল করেছেন।
আমি তাঁর নিকট এই মর্মেও দুয়া করেছিলাম, যেন মুসলিমরা পরস্পর একে অপরের বিপক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে। তিনি আমার এই দুয়া কবুল করেননি।” ( মুসলিম)
পূর্ববর্তী জাতিগুলো যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ণ হয়ে গিয়েছিল, যেন তাঁর উম্মতও ধ্বংস না হয়, প্রথম দুটি দুয়ায় রাসূল (সা:) তাই চেয়েছিলেন। আল্লাহ তা কবুলও করেছিলেন। তবে উম্মতের মধ্যে অন্তর্কলহ না ঘটার জন্য তিনি যে দুয়া করেছিলেন আল্লাহ তা কবুল করেননি।
আল্লাহ কেন এই দুয়া কবুল করেননি তা আমরা জানি না। তিনি সর্বজ্ঞানী, সর্বদ্রষ্টা । তিনি কোন দুয়া কবুল করবেন বা করবেন না –এটা সম্পূর্ণই তাঁর এক্তিয়ার।
তাই আমরা যেন দুয়া কবুল হওয়া বা না হওয়াকে মুখ্য মনে না করি। আমরা যেন প্রকৃত মুমিনের মতো দুয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়াকেই বেশি অগ্রাধিকার দেই।
