পর্ব-১
সত্যি কথা বলতে, ছাত্ররা যখন দেশের চরম এক ক্রান্তিলগ্নে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড: মুহাম্মদ ইউনুস এর নাম ঘোষণা করলো তখন অন্য অনেকের মতো আমি নিজেও শতভাগ খুশি হতে পারিনি।
কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততোই বুঝতে পারছি, ছাত্রদের নেয়া সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল এটি।
তিনি ছাড়া অন্য কেউ দেশী, বিদেশী এত ধরনের বহুমুখী চাপকে হ্যান্ডেল করতে পারতেন না।
তবে উনি যে প্রাথমিক অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নিতে রাজী হয়েছেন এবং দায়িত্ব নেয়ার পর আন্তরিকতার সাথে দেশটাকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এর পেছনে যে মনস্তাত্বিক কারণ রয়েছে বলে আমি মনে করি তা একটু ব্যাখ্যা করি,
ধরুন, আপনার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় আপনি অনেক মেধাবী, ইনোভেটিভ। সেই সাথে রয়েছে নিজেকে আপডেট করার প্রতিভা এবং প্রচন্ড পরিশ্রম । এসব কিছুর সমন্বয়ে আপনি আপনার অন্যান্য ভাই, বোন , আত্মীয়দের তুলনায় অনেক এগিয়ে গেলেন, পরিবারের গন্ডী ছাড়িয়ে বাইরের মানুষদের কাছে সুপরিচিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু যেহেতু আপনার পরিবারের বাকী সদস্যরা কেউ সেই জায়গায় পেঁৗছতে পারে নাই, তাদের সেই যোগ্যতা বিশেষ করে নিজেকে বদলানোর সদিচ্ছাও নাই তাই তারা আপনাকে পাত্তা দিতে চায়না (মনে মনে স্বীকার করলেও ব্যবহারে তা প্রকাশ করে না।)
এমতাবস্থায় আপনি যদি তাদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য নিজের বর্তমান অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে কোনোরূপ সহযোগিতার চেষ্টাও করেন তবে তারা সেটাতেও রেসপন্স করে না, কারণ ঐ যে, তাদের নিজেদের স্বভাব পরিবর্তন করার সদিচ্ছা তাদের নিজেদেরই নাই। তখন আপনি মনের দু:খে বাইরের মানুষদের জন্যই কাজ করে গেলেন। কিন্তু নিজের পরিবারের জন্য কিছু করার সুপ্ত বাসনা মনের মধ্যে রয়েই গেল।
এরপর হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের কেউ কেউ আপনার মূল্যায়ন করতে পারলো, আপনার মতো একজন সুপরিচিত ব্যক্তি যে আপনার পরিবারের গৌরব –এটা অনুধাবন করে আপনাকে আমন্ত্রণ জানালো পারিবারিক গেট টুগেদারে। আপনাকে অনুরোধ করলো পরিবারটাকে আধুনিকভাবে ঢেলে সাজানোর।
আপনি পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্বত্ত্বেও নতুন প্রজন্মের অনুরোধে রাজি হলেন কিছুটা আবেগ, কিছুটা দায়বদ্ধতা থেকে।
কিন্তু অভিমান ভুলে পরিবারের জন্য কাজ শুরু করবার পর থেকেই প্রতি পদে পদে মুখোমুখি হতে হলো প্রতিবন্ধকতার।
কি কি প্রতিবন্ধকতা ?
কেন এই প্রতিবন্ধকতা?
আসলে ব্যক্তিজীবন, পরিবার কিংবা রাষ্ট্র– সব ক্ষেত্রেই মানুষের মনস্তত্ব কম-বেশি একইরকম। তাই ব্যক্তি, পরিবার জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে রাষ্ট্র, রাজনীতিকে রিলেট করতে পারলে তা বুঝতে সহজ হয়। এই লেখায় সেটাই করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
( পর্ব ২)
নতুন প্রজন্মের আহ্বানে নিজের পরিবারের জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়ে আপনি যখন নিজের গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ স্থগিত রেখে পরিবারের কাছে ছুটে এলেন তখন আপনার সমবয়সীরা সেটা মন থেকে মেনে নিতে না পারলেও নতুনদের চাপে আপনাকে হাসিমুখে বরণ করলো। আপনিও উচ্ছস্বিত হয়ে সবার সাথে আলোচনা শুরু করলেন কিভাবে সবাইকে সাথে নিয়ে উন্নতি করা যায়!!!।
আপনি দেশের বাইরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাজ করে অভ্যস্ত মানুষ, তাই আপনি চাইলেন নতুন, পুরাতন সবার আইডিয়া নিয়ে একটা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে। ধরুন, হতে পারে সেটা নিজেদের পুরানো পৈতৃক বাড়ি ভেঙ্গে নতুন ডিজাইনের বাড়ি করা। সেই বাড়ির আর্কিটেকচার কেমন হবে, ইন্টেরিয়র কেমন হবে, ফার্নিচার কেমন হবে —সবকিছুতেই আপনি প্রফেশনালদের দিয়ে কাজ করাতে চান। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা সবাই আপনাকে সমর্থন দেয়া শুরু করলো। কিন্তু বাঁধা দেয়া শুরু করলো আপনারই সমবয়সী ভাই, বোন কাজিন রা। কারণ অনেকগুলো-
প্রথমত: তারা মনে করে এসব কাজ প্রফেশনালদের দিয়ে করানো মানে অহেতুক পয়সা খরচ। তারা নিজেরাই ভালো বুঝে । অথচ আপনি বুঝেন যে, যে কোনো কাজ প্রফেশনাল কাউকে দিয়ে করালে তার কোয়ালিটি লেভেল অন্যরকম হয়।
দ্বিতীয়ত: নতুন প্রজন্মের সদস্যদের অভিজ্ঞতা নাই, তারা কম বুঝে (অথচ বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে যে কোনো বিষয়ে আইডিয়া নেয়ার জন্য যে তথ্যের অবাধ ভান্ডার রয়েছে এ সম্পর্কে তারাই ওয়াকিবহাল নয়)। তাই তারা বলা শুরু করলো নতুনদের মতামতকে এত পাত্তা দেয়ার দরকার নাই, তাহলে তারা প্রশ্রয় পেয়ে মাথায় উঠে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আদতে নতুনদের সাথে আপনার এই মেলবন্ধনকে তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। তারা নতুনদের ডোমিনেট করেই অভ্যস্ত, তাদের সাথে ডিসকাশনে অভ্যস্ত না।
তৃতীয়ত: তারা এতদিন যে কাজ সবাই মিলে করতে পারেনি (আসলে করতে চায়নি) আপনি উড়ে এসে জুড়ে বসে সেই কাজ করে সবার প্রশংসার পাত্র হয়ে যাবেন –এটা তারা মন থেকে মেনে নিতে পারছে না হিংসাবশত।
কিন্তু মুখে এসব স্বীকার না করে তারা নানারকম কৌশল অবলম্বন শুরু করলো। যেমন-
আপনি কিংবা নতুন প্রজন্ম বাড়ির যে ডিজাইন নিয়ে আসেন না কেন, কোনো না কোন ভুল ধরে সেটা রিজেক্ট করে দেয়া।
বাড়ির জমির দলিল বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেয়ার ব্যাপারে টালবাহানা করা।
নতুন প্রজন্মের বিভিন্ন ভুল আপনার সামনে তুলে ধরে তাদের সাথে আপনার সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করা।
নিজেরা বাধা দিয়ে সফল না হলে বাইরের অন্যান্য প্রভাবশালী মানুষকে দিয়ে হুমকি দেয়া
——————- ইত্যাদি ইত্যাদি।
এসব কিছুর উদ্দেশ্য একটাই, আপনি যেন ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে এখান থেকে চলে যান। তাহলেই তারা আবার আগের মতোই চলতে পারবে।
এখন আপনি কি করবেন?
নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকে ইগনোর করে নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে চলে যাবেন?
নাকি শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের লড়াইটা চালিয়ে যাবেন?
যে আপনি দেশে-বিদেশে বিবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতে লড়াই করে সফল হয়েছেন , সেই আপনি নিজের পরিবারের জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়েও কি ব্যর্থ হয়ে নিজের জগতে ফিরে যাবেন নিজের পরিবারের সদন্যদের অসহযোগিতার কারণেই???
এ এক অদ্ভূত ডাইলেমা !!!
আমি নিশ্চিত, ড: মুহাম্মদ ইউনুস এখন এই ডাইলেমাতেই আছেন।
কারা, কি স্বার্থে তাকে অসহযোগিতা করে চলে যেতে বাধ্য করছে তা আমরা সবাই জানি, বুঝি।
কিন্তু জনগণ হিসেবে আমাদের করণীয় কি?
আমরা কি তাকে বিফল হয়ে চলে যেতে দিব?
নাকি দেশ পুনর্গঠনের এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগাবো?
(পর্ব ৩)
দেশ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আমি কেন ড: মুহাম্মদ ইউনুস কে সুযোগ দিতে চাই, এবার তা ব্যখ্যা করি।
উনার একটি প্রতিষ্ঠানকে শূণ্য থেকে তৈরি করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে।
(যদিও সেই প্রতিষ্ঠান সুদকে প্রমোট করেছে, কিন্তু সেটা ভিন্ন আলাপ)।
এ থেকে বোঝা যায়, উনি একজন ভিশনারী ব্যক্তি এবং সেই ভিশনকে বাস্তবে রূপ দেয়ার ব্যাপারে উনি ফোকাসড থাকতে পারেন। যত প্রতিবন্ধকতা আসুক না কেন, সেটাকে ট্যাক্টফুলি হ্যান্ডেল করে উনি উনার লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম।
এছাড়াও একজন মানুষ যখন একটি প্রতিষ্ঠান চালান তখন তার মধ্যে বিভিন্ন কোয়ালিটি ডেভেলপ করে। যেমন- Money management, Work management, Ownership mentality । এই তিনটি বেসিক কোয়ালিটি একটি দেশ চালানোর জন্যও খুব জরুরী।
তবে আমি বরাবরের মতো পরিবার দিয়ে উদাহরণ দিতে চাই।
আপনি যখন একটা একক পরিবার চালান, তখন আপনাকে হিসাব করতে হয় একটা নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে আপনি কিভাবে মাসের ৩০ দিন চালাবেন। বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে ময়লার বিল দেয়া পর্যন্ত প্রতিটি খাত হিসাব করতে হয়। তখন মন চাইলেই আপনি একটা ট্যুর দিতে পারেন না কিংবা একটা দামী মোবাইল কিনতে পারেন না। সেজন্য টাকা জমাতে হয়, সেটা হতে পারে ব্যয় সাশ্রয় করে অথবা আয়ের নতুন উপায় খুজে বের করে। এভাবেই আপনার মধ্যে Money management capacity build up করে।
আবার আপনি যখন একটি একক পরিবার চালান তখন একটা সংসারের সব ধরনের কাজের ব্যাপারে আপনার আইডিয়া থাকতে হয়। রান্না, ঘর গুছানো, বাচ্চা পালা থেকে শুরু করে বারান্দা থেকে শুকনা কাপড় আনা পর্যন্ত—প্রতিটা কাজ কিভাবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে শেষ করবেন সেই ব্যাপারে আপনাকে কনসার্ন থাকতে হয়। এক্ষেত্রে কোন কাজগুলো আপনি নিজে করবেন, কোন কাজগুলো পরিবারের বাকি সদস্যদের মাঝে ভাগ করে দেবেন আর কোন কাজে হেল্পিং হ্যান্ডের সাহায্য নিবেন— এসব কিছু ম্যানেজ করতে গিয়ে আপনার মধ্যে Work management capacity build up করে।
তবে সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট হলো Ownership mentality । আপনি যখন নিজের সংসারকে ”নিজের” বলে মনে করা শুরু করেন তখন আপনি সেই সংসারকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য নিজের মধ্যে একটা তাগাদা অনুভব করেন। তখন ঘরের পাপোশ থেকে শুরু করে বারান্দার মানিপ্ল্যান্ট টাকেও আপনার “আপন” লাগে। এই আপন লাগার অনুভূতি টা আপনাকে নিজের অনেক পারসোনাল ডিমান্ড স্যাক্রিফাইস করতে মোটিভেট করে।
এবারে ড: মুহাম্মদ ইউনুসের গত কয়েক মাসের পারফর্মেন্স বিবেচনা করে দেখি। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে উনি এই বিষয়গুলো কিভাবে মেইনটেইন করেছেন।
উনার কাছে যখনই কোনো প্রকল্প বা কোনো ইভেন্টের বিল যায়, উনি বারবার মিটিং করে সেটা কমানের চেষ্টা করেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বৈদেশিক লোন শোধ হচ্ছে, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা হচ্ছে, বিদেশ সফরগুলোতে যথাসম্ভব কম লোক নিয়ে যাচ্ছেন। এককথায় Money management এর ক্ষেত্রে উনি সফল।
আবার বিডা সহ বেশ কিছু জায়গায় যথাযোগ্য লোক নিয়োগ দিয়ে উনি প্রমাণ করছেন Work management capacity ও উনার আছে। তাছাড়া উনি নিজে যেভাবে এই বয়সেও নিরলসভাবে কাজ করছেন, বিদেশ সফর করছেন এবং প্রতিটা বিদেশ সফরের প্রতিটা মুহূর্তকে কাজে লাগাচ্ছেন তা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, কাজের ব্যাপারে উনি কতটা ডেডিকেটেড।
সবশেষে বলবো, দেশ নিয়ে উনার Ownership mentality বিষয়ে। এই ব্যাপারে উনি সবার থেকে এগিয়ে।
১ম পর্বেই বলেছিলাম, দেশের জন্য কিছু করার সুপ্ত আকাঙ্খা ছিল বলেই উনি দেশের এই চরম ক্রান্তিলগ্নে দায়িত্ব নিতে রাজী হয়েছিলেন। এই দেশপ্রেমটাই উনার সবচেয়ে বড় গুণ, যার প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে। প্রতিটা dealings এ উনি দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।
”আমরা বিদেশে যাবো না, ওরা আমাদের কাছে আসবে”— উনার এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, উনি নিজের দেশকে কতটা Own করেন।
তাই স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এদেশকে আত্মমর্যাদাশীল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এই মূহূর্তে উনার কোনো বিকল্প নেই।
তবে তাই বলে কি উনার সকল কাজ সমালোচনার ঊর্ধ্বে?
উনার কি কোনো সীমাবদ্ধতা নেই?
ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে উনার দেশ পরিচালনাকে কিভাবে মূল্যায়ন করা যায়?
আবেগের বশে আমিও কি উনাকেও ৫ বছর চাই?
দেশের সচেতন জনগণ হিসেবে আমাদের চাওয়া কি হওয়া উচিত?
(শেষ পর্ব)
এই সিরিজের শেষ পর্বটি লেখার জন্য আমি সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলাম, দেশের চলমান ঘটনাবলী বিভিন্ন অ্যাংগেল থেকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। অবশেষে মনে হলো আজকেই সঠিক সময় সিরিজটি শেষ করার।
আমার আশংকাকে সত্যি প্রমাণ করে ড: মুহাম্মদ ইউনুস গতকাল (22/05/2025) পদত্যাগের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। (যদিও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উনি এই শেষ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন) । তবে উনার এই পদত্যাগ করতে চাওয়ার ইচ্ছাটাই উনার হতাশা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে।
উনার মতো একজন সভ্য, রুচিবান, সেলফ-মেইড, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষকে যখন বার বার কাজ করতে বাধা দেয়া হয়, উনার ইনটেনশনকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, সবচেয়ে বড় কথা উনাকে রিকোয়েস্ট করে ডেকে এনে যখন নিজেদের অর্ডারমাফিক পাপেটের মতো কাজ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয় তখন উনার নিজে থেকে সসম্মানে চলে যাওয়ার ইচ্ছা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আমি নিজে ব্যক্তিজীবনে এরকম তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। সেই অনুভূতি থেকেই সিরিজটার নাম দিয়েছিলাম “ড: মুহাম্মদ ইউনুস কে আমি যেভাবে রিলেট করতে পারি”
একটা ভদ্র, রুচিশীল পরিবেশ থেকে এসে যখন কাউকে একদল নোংরা মনের মানুষের সাথে সহাবস্থান করে একটা নোংরা পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করতে বলা হয়, তখন তার উপর কি ধরনের মনস্তাত্বিক চাপ তৈরি হয়, তা আমি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারি। নিজের লেভেলকে নিচে নামিয়ে না তাদের মতো হওয়া যায়, আবার তাদের এতদিনের স্বভাবকে রাতারাতি বদলে ফেলাও যায় না। ফলাফল হলো– প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয় এবং এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে মনে হয়- “Let me quit”.
আমি জানি না উনি এই বয়সে এসে কতদিন ধৈর্য্য ধারণ করতে পারবেন!! আজকে হয়তো সবার অনরোধে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন, তবে আবারও যে এমন করবেন না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কারণ সত্যি বলতে এই দেশ থেকে উনার নিজের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। তাই উনি নিজের ইমেজ নষ্ট করে হলেও পদ আঁকড়ে থাকবেন না এটাই স্বাভাবিক।
এবারে দেশের এই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে কার কি কি ভুল ছিল সেই বিষয়ে আমার অবজারভেশন তুলে ধরতে চাই।
প্রথমত: ইন্টেরিম সরকারের To-Do list এ priority selection করতে না পারার ব্যর্থতা।
আমরা জানি এই সরকার দেশকে যে অবস্থায় পেয়েছে তার প্রতিটি সেক্টরেই ভগ্নদশা ছিল। এই অবস্থায় তারা যে আন্তরিকভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ করতে চেয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু তাদের ভুলটা হচ্ছে তারা কোন কোন কাজ তাদের ম্যানেজ করার ক্যাপাসিটি আছে তার কোনো তালিকা করে সেই অনুযায়ী কাজগুলোকে prioritize করিতে পারে নাই। যখন কারও To-Do list এ অনেক কাজ থাকে তখন Capacity and managing probability অনুযায়ী সেগুলোকে prioritize করতে পারা হিকমাহর বিষয় এবং এই ক্ষেত্রে হিকমাহ প্রয়োগ করতে পারা/না পারার উপর কাজের সাফল্য/ব্যর্থতা অনেকখানি নির্ভর করে।
এই সরকার সব কিছু একসাথে মেরামত করতে গিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা বানিয়ে ফেলেছে।
যার ফলে তারা কাজ করছে ঠিকই কিন্ত সেটার কোনো দৃশ্যমান আউটপুট ভিজিবল হচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত: যেহেতু ইন্টেরিম সরকারের অধিকাংশ উপদেষ্টাই নন-পলিটিকাল, সুশীল ব্যক্তি ( প্রধান উপদেষ্টা নিজেও) তাই অতিরিক্ত সুশীলতা দেখাতে গিয়ে তারা Existing set up নিয়েই সংস্কার, বিচার করতে চেয়েছে। অথচ তাদের বোঝা উচিত ছিল Existing set up তাদের নিজেদের চাকরির প্রয়োজনে উপরে উপরে তাদের সাথে ভদ্রতা দেখালেও ভিতরে ভিতরে তাদের নিয়োগদাতাদের পক্ষেই কাজ করবে এবং তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য গোপনে ষড়যন্ত্র করবে। তাই আমলাতন্ত্র, বিচারবিভাগ থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেটআপ পরিবর্তন করা জরুরি ছিল অনেক আগেই।
তৃতীয়ত: তথাকথিত রাজনৈতিক ঐক্যমতে পৌঁছার পর সিদ্ধান্ত নেয়ার নামে জরুরি বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নিতে অহেতুক কালক্ষেপণ করা। যেমন-সংবিধান সংস্কার, জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা, ফ্যাসিবাদী দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।
এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে সাধারণ জনগণের আত্মত্যাগের ফলে। অথচ জনমতকে গুরুত্ব না দিয়ে ব্যাকডেটেড রাজনৈতিক দল, যারা ১৬ বছর আন্দোলন করেও কোনো আউটকাম আনতে পারেনি তাদের অতিরিক্ত মূল্যায়ণ করা হয়েছে প্রতিক্ষেত্রে, ফলাফল হলো তারা আস্কারা পেয়ে এখন মাথায় উঠে নাচতেছে আর আম-জনতা সাফার করতেছে।
চতুর্থত: LGBT, নারীর অধিকার সংস্কার এর মতো বিতর্কিত এবং বর্তমান সময়ে অগুরুত্বপূর্ন বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসে অযথা নিজেদের ইমেজ নষ্ট করা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের সমর্থন নষ্ট করা।
এই তো গেল বর্তমান পরিস্থিতি তৈরির পেছনে ইন্টেরিম সরকারের কিছু ভুলের সারাংশ।
এবারে অন্যদের কথাও বলি।
প্রথমত: ছাত্রদের দল, যাদের নেতৃত্বে আমরা দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছিলাম এবং দেশের রাজনীতিতেও নতুন কিছু হবে বলে আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু এই দলটিও নিজেদের লক্ষ্যে ফোকাস থাকতে পারেনি।
গণ অভ্যুত্থানের ক্রেডিট ভাগাভাগি নিয়ে তারা যে ভুলের সূচনা করেছিল দল গঠনের কয়েকমাস পরেও তারা সেই ভুলের আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এই দলে হাসনাতের মতো সাহসী নেতা, সারোয়ার তুষার এর মতো তর্কবাগীশ নেতা থাকলেও তারা শুধু টক-শো, ফেসবুক স্ট্যাটাসেই রাজনীতি সীমাবদ্ধ রেখেছে।
তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে দল গোছানোর মতো অবশ্যকরণীয় কাজ শুরু করতে পারেনি। সারজিস, হান্নান মাসুদরা নিজেদের এলাকায় গিয়ে যাও বা কাজ শুরু করেছিল কিন্ত সেক্ষেত্রেও গতানুগতিক শো-অফ করে জনসংযোগ করতে গিয়ে উল্টো সমালোচিত হয়েছে।
তারপরও তাদের এই ভুলগুলোকে অভিজ্ঞতার অভাব হিসেবে ক্ষমা করে দিয়ে তাদের আরও একবার সুযোগ দিতে চাই। তাদের এখন উচিত ”রাজু তে আয়–” এই শ্লোগান এবং ঢাকাকেন্দ্রিক আন্দোলন থেকে বের হয়ে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে আসন্ন নির্বাচনের জন্য জনসমর্থন তৈরি করা।
দ্বিতীয়ত: জামায়াতে ইসলামীর জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল ৭১ এ ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে মাফ চেয়ে জনকল্যানমূলক কাজে নিজেদের ব্যাপকহারে সম্পৃক্ত করে নতুন প্রজন্মর কাছে ফ্রেশ একটা ইমেজ তৈরি করা। শিবির যদিও সায়েন্স ফেস্ট, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এর মতো দারুণ কিছু কাজ শুরু করেছিল কিন্ত আবার তাদের অফলাইন কর্মকান্ডে ভাটা পড়ে গেল কেন বুঝলাম না। এরকম স্বাধীন একটা পরিবেশ তারা কি আর আদৌ পাবে কখনও?
তৃতীয়ত: দেশের ইসলামপন্থী মানুষজন, যারা বিগত বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছেন, তারাও এই আকস্মিক এবং অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে সেটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেননি।
জন্মগতভাবে মুসলিম হলেও এদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে ইসলামের মূল কনসেপ্টগুলো যে ক্লিয়ার না এবং এগুলো ক্লিয়ার না করা পর্যন্ত দেশে ইসলামী শরিয়াহ, খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখা যে নিজেদের জনবিচ্ছিন্নতা ও অদূরদর্শীতার পরিচায়ক —–তা হয়তো তারা নিজেরাও বুঝতে পারছেন না। তাদের উচিত ছিল বাকস্বাধীনতা এবং কর্ম-স্বাধীনতার এই অপূর্ব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সুনিদিষ্টূ পরিকল্পনা করে দাওয়াতী কাজ শুরু করা। আমি জানি না তাদের বোধোদয় কবে হবে।
Last but not the least, দেশের এই বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সিংহভাগ দায়ী যে দলটি তা হলো বি.এন. পি। এই দলটিকে আমি ক্ষমতালোভী, বেঈমান, ব্যাকডেটেড—যত বিশেষণই দেই না কেন তা কম হয়ে যাবে। তাদের ভুল নিয়ে বিস্তারিত লেখার রুচিও আমার হয় না। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, তারা তাদের সাম্প্রতিক কাজ দিয়ে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করাতো দূরের কথা, পুরানো ভোটারদের অনেককেই হারিয়েছে। তারা না শোধরালে তাদের পরিণতিও একই রকম হবে।
সবশেষে বলতে চাই, আমরা যারা সাধারণ জনগণ আছি তাদের ভুলের কথা। এই আমরাও তো এই হঠাৎ পাওয়া স্বাধীনতার মূ্ল্যায়ন করতে পারিনি। হা-ভাতের মতো যার যা বকেয়া দাবি আছে তা নিয়ে যখন তখন রাস্তায় বসে পড়ার কালচার শুরু করেছি। কোনো একটা জাতীয় ইস্যু নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করা আর ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ইস্যু নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ার মধ্যে যে বিস্তর তফাৎ আছে, দাবি আদায়ের যে Proper timing and procedure আছে তা বুঝতে পারার মতো বিচক্ষণতা অনেক শিক্ষিত পেশাজীবীদের মধ্যেও দেখলাম না।
ইন্টেরিম সরকার যে সবার সব দায়িত্ব সমাধানের জন্য আসেনি, তাদের দ্বারা কোন কাজগুলো করিয়ে নিতে হবে আর কোনগুলো আপাতত না হলেও চলবে—এটা বুঝতে পারার মতো প্রজ্ঞা তো আমরাও দেখাতে পারেনি। বাকস্বাধীনতা পেয়ে সবাই যার যার মত প্রকাশ করছে, যাকে তাকে যা ইচ্ছা ট্যাগ দিচ্ছে, যাকে পছন্দ হচ্ছে না তাকেই পদত্যাগ করার জন্য পোস্ট দিচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও মিম বানিয়ে, ট্রল করে ব্যাপারগুলোকে খেলো করে দিচ্ছে। সবমিলিয়ে জাতি হিসেবে আমরাও যে অপরিপক্ক, আবেগী তার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
তাহলে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কি!!!
আমি নিজেও জানি না। ব্যক্তিজীবনে আমি নৈরাশ্যবাদী না হলেও এই জাতির প্রতিটি সেক্টর নিয়ে আমি হতাশ। একমাত্র আল্লাহর অপার অনুগ্রহ ছাড়া আমি এই দ্বিতীয় স্বাধীনতাকে সফল হওয়ার কোনো উপায় দেখি না। তবে আল্লাহও তো সেই জাতির অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা বদলায়। তাই আমাদের সবাইকেই যার যার জায়গা থেকে বদলানোের চেষ্টা করতে হবে। সবর, হিকমাহ’র পরিচয় দিতে হবে। সাথে দুআ অব্যাহত রাখতে হবে।
শেষ কথা: ড: মুহাম্মদ ইউনুস শেষ পর্যন্ত কতটুকু কি করতে পারবেন আমি জানি না, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি উনি উনার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন। আর মহান আল্লাহ তো বান্দার চেষ্টাটাই দেখেন। আল্লাহ যেন উনার চেষ্টাগুলোকে কবুল করে নেন এবং উনার এই চেষ্টার বিনিময়ে উনার ব্যক্তিগত দোষত্রুটিগুলোকে ক্ষমা করে দেন।
(যে কোনো মুসলিমের ব্যাপারে সুধারণা করা ইসলামিক আখলাকের মধ্যে পড়ে, তাই আমি উনার ব্যাপারে সুধারণা করেই সিরিজটা শেষ করলাম। বাকীটা আল্লাহ ভালো জানেন, নিশ্চয় তিনিই সর্বজ্ঞ)
-হাবিবা মুবাশ্বেরা