একটি পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন জীবিকার প্রয়োজনে দেশের বাইরে বা অন্য শহরে থাকে তখন আমরা প্রধানত যে বিষয়টার প্রতি ফোকাস করি তা হলো স্বামী/ স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িয়ে যায়। কিন্তু আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমরা উপেক্ষা করে যাই তাহলো বাবা ছাড়া বেড়ে ওঠায় সেই পরিবারের সন্তানদের উপর যেসব বিরূপ প্রভাব পড়ে সেই বিষয়টি।
একটি সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য মা ও বাবা উভয়ের সাথে যৌথভাবে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি খুব কাছ থেকে কিছু পরিবারকে অবজারভ করে দেখেছি যেসব পরিবারে সন্তানরা বাবার শাসন ও সাহচর্য ছাড়া বড় হয় তাদের আচরণের মধ্যে অনেক কিছুর ঘাটতি রয়ে যায়।
সন্তান হিসেবে, স্বামী/স্ত্রী হিসেবে এবং পরবর্তীতে প্যারেন্ট হিসেবে তারা তাদের রোলগুলো পারফেক্টলি প্লে করতে পারে না। এবার এই তিন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করি।
প্রথমত: বাবা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঘরের বাইরে থাকবে, এরপর বাসায় ফিরে আসবে , অন্যদিকে বাবা রাতের বেলাতেও বাসায় ফিরবে না, সপ্তাহের শেষে ছুটির দিনে আসবে কিংবা প্রবাসী হলে বছর শেষে আসবে—এই দুটি বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
প্রথম ক্ষেত্রে সন্তান যখন জানে যে বাবা কাজ শেষে বিকালে/ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরবে, তাদের সাথে সময় কাটাবে, রাতের বেলা একসাথে খাবে তখন সে একদিকে যেমন আবেগ নিয়ে বাবার জন্য অপেক্ষা করবে অন্যদিকে তেমনি তার মনে বাবার শাসনের ভয়ও কাজ করবে।
অন্যদিকে সন্তান যখন জানে যে, বাবা প্রতিদিন বাসায় ফিরবে না তখন সে অনেকটাই স্বাধীনচেতা হয়ে যায়, যা একসময় তাকে বেপরোয়া করে তোলে। মা’ য়ের একার শাসনকে তখন সে পাত্তা দিতে চায় না। বাবা’কে সে তখন শুধু অর্থ উপার্জনের যন্ত্র মনে করে।
আমার এক প্রতিবেশীর শিশু সন্তানটি এই বয়সেই প্রচন্ড বেয়াদব এবং জেদী। তার কথা-বার্তা, আচার -আচারণে ভদ্রতাবোধ নেই। তার বাবা প্রবাসী এবং সেখান থেকে অঢেল টাকা পাঠায়। বাবার স্নেহ এবং শাসন থেকে বঞ্চিত হওয়ার সুস্পষ্ট প্রভাব তার মধ্যে পরিলক্ষিত।
এসব বাবারা সারাজীবন প্রবাসে কষ্ট করে কাজ করে সন্তানের সুন্দর ভবিষৎত নির্মাণ করতে চায় কিন্তু বিনিময়ে তাদের সাথে সন্তানের কোনো বন্ডিং গড়ে ওঠে না। শেষ বয়সে তারা যখন দেশে ফিরে আসে তখন দেখে সন্তানের সাথে সম্পর্কটায় কোনো আন্তরিকতা নাই।
দ্বিতীয়ত: বাবা যদি অন্য শহর বা দেশের বাইরে থাকে তবে মা-বাবার স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক কি– সন্তান তা স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করে না । ফলে পরবর্তীতে নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্কেও তা প্রভাব ফেলে।
আমার এক নিকটাত্মীয় প্রবাসে বহুবছর বসবাসরত পিতার মেয়েকে অনেক যৌতুকসহ বিয়ে করার পর সংসার করতে গিয়ে তার প্রথম কমপ্লেইন ছিল, সে বাইরে থেকে ফেরার পর তার স্ত্রী তাকে যথাযথ এটেনশন দেয় না। কর্মক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরার পর পানি খেতে দেয়া, কাপড় এগিয়ে দেয়া, সাথে সাথেই অভাব-অভিযোগের ফিরিস্তি শুরু না করা, এক পক্ষ রেগে গেলে আরেক পক্ষ চুপ থাকা, একজনের দু:সময়ে আরেকজন সাপোর্ট দেয়া, বাইরের মানুষের কাছে সংসারের প্রাইভেসি মেইনটেইন করা—-এসব বেসিক দাম্পত্য ট্রিকসগুলো তার স্ত্রী জানে না। কারণ জ্ঞান-বুদ্ধি হবার পর থেকেই সে তার বাবাকে অতিথি পাখির মতো বেড়াতে আসতে দেখেছে। মা-বাবাকে একসাথে সংসার করতে দেখেনি। তাই দাম্পত্যের অনেক রসায়ন তার অজানা।
বাবার উপার্জিত অর্থের টাকায় তাদের নিজেদের ঘর-বাড়ি হয়েছে, লাইফস্টাইল উন্নত হয়েছে ঠিকই কিন্তু একটি আদর্শ পরিবার কিভাবে ফাংশন করে সেই অভিজ্ঞতা তাদের হয়নি। আর এর ফলশ্রুতিতে সে স্ত্রী হিসেবে তার বেসিক দায়িত্বগুলো পালন করতে বিরক্ত বোধ করে, সে প্রত্যাশা করে বাবার মতো তার স্বামীও একতরফাভাবে শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালন করে যাবে।
এই বাস্তবতা আমরা সবাই জানি যে, সন্তানরা অনেক কিছুই নিজের মা-বাবাকে দেখে শেখে। তাই সন্তানদের সামনে স্বামী-স্ত্রীর রিলেশনশীপের কোনো আদর্শ রোল মডেল যদি না থাকে তবে তারাও নিজেদের জীবনে এই রোল প্লে করতে ব্যর্থ হয়।
তৃতীয়ত: বাবার থেকে দূরে বড় হওয়া ছেলে-মেয়েরা যখন নিজেরা অভিভাবক হয় তখন তারাও পদে পদে ব্যর্থ হয়। ছেলে সন্তানরা যখন নিজেরা বাবা হয় তখন সন্তানকে স্কুলে দেয়া-নেয়া করা, বাজারে, মসজিদে সাথে নিয়ে যাওয়া, ডাক্তার দেখানো—-এরকম কাজগুলোকে তারা ঝামেলা মনে করে যেহেতু তারা নিজের বাবাকে এসব করতে দেখেনি। অন্যদিকে মেয়ে সন্তানরা যখন নিজেরা মা হয় তখন তারা সন্তানকে পরিপূর্ণ মনোযোগ দিয়ে বড় করার বদলে বাইরের কাজগুলোও নিজে করতে চায়। ফলে তাদের সন্তানও সংসারে মা-বাবার আদর্শ জেন্ডার রোল কি –তার যথার্থ বাস্তবায়ন দেখতে পায় না, কনফিউজড হয়ে বড় হয়।
এভাবে একটি আদর্শ পারিবারিক পরিবেশ না থাকার কুপ্রভাব বংশপরম্পরায় চলতে থাকে।
তাই আমার উপলব্ধি হলো, আর্থিক স্বচ্ছলতাকে স্যাক্রিফাইস করে হলেও সুসন্তান গড়ে তোলার জন্য মা-বাবা উভয়ের সান্নিধ্যেই সন্তানকে বড় করতে হবে এবং ইসলাম নির্ধারিত জেন্ডার রোলগুলো তাদের সামনে প্রোপারলি পারফর্ম করতে হবে। তাহলেই সন্তানদের প্রতি প্রকৃত হক আদায় করা হবে।
