বিগত ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকারের একটা অন্যতম সফলতা হলো রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং নির্বাচন–এই বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। বিশেষ করে দেশের শিক্ষিত শ্রেণীর একটি অংশ, যারা নিজেদেরকে বুদ্ধিজীবী ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে তাদেরও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে ধারণা এত কম যে, তারাও জানে না নির্বাচনের আগে ঠিক কোন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে হয়, তর্ক-বিতর্ক করতে হয়।
এজন্যই ১৭ বছর পর যখন রাষ্ট্র পরিচালনা কারা করবে –এই বিষয়টি নির্বাচন করার একটি গুরু দায়িত্ব জনগণের সামনে এসেছে তখন এই শিক্ষিত , সুশীল শ্রেণির একটি অংশ ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ঝড় তুলছে নারীর পোশাক কি হবে, নারীকে কি নামে ডাকা হবে, দলের প্রধান নারী হবে কিনা—এসব বিষয় নিয়ে।
আর সোশাল মিডিয়ায় এক শ্রেণির মানুষ ঝড় তুলছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অধীনে ভোট দেয়া কুফরি/ জায়েজ হবে কিনা, গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট দেয়া উচিত হবে কিনা– এসব বিষয় নিয়ে।
অথচ নির্বাচনের আগে তুলনামূলক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হওয়া উচিত ছিল কোন দলের প্রার্থীরা কেমন, কোন দলের নির্বাচনী ইশতেহার কেমন —সেটা নিয়ে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে, বেকারত্ব দূর করতে, সুষ্ঠ বিচার নিশ্চিত করতে কোন দলের পদক্ষেপ কতটা বাস্তবসম্মত, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে কোন দলের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা নীতি কেমন সেটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল নির্বাচনের আগে আলোচনার মূল টপিক।
আপনি যদি একজন সি.এন.জি ড্রাইভার, যাকে সারাদিন ট্রাফিক জ্যামে বসে থেকে সি.এন.জি চালানোর পর ইনকামের একটা অংশ কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই কারও হাতে তুলে দিতে বাধ্য হতে হয়, তাকে জিজ্ঞেস করেন তার জীবনের প্রধান সমস্যা কি চাঁদাবাজি নাকি এলজিবিটি ইস্যু, তখন সে কি উত্তর দিতে দিবে?
আপনি যদি সারাদিন বিভিন্ন বাসায় সিঁড়ি ভেঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া একজন ছুটা বুয়াকে জিজ্ঞেস করেন তার জীবনের প্রধান সমস্যা কি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নাকি নাকি নারীর হাফপ্যান্ট পড়ার স্বাধীনতা, সে কি উত্তর দিবে?
আপনি যদি সীমান্তে প্রতিনিয়ত বিনা কারণে হয়রানির শিকার হওয়া একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করেন তার জীবনের প্রধান সমস্যা কি গণতন্ত্র নাকি প্রতিবেশী দেশের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলার মতো একটি সাহসী বি.জি.বি, তবে সে কি উত্তর দিবে?
আপনি যদি জুলাইয়ে সন্তান হারানো কোনো শহীদের মাকে জিজ্ঞেস করেন তার জীবনের প্রধান চাওয়া কি অপরাধীর বিচার নাকি দলীয় প্রধানের পদে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করা , তবে সে কি উত্তর দিবে?
অথচ এই মানুষগুলোই কিন্ত দেশের আপামর জনগণ। এদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই কিন্তু আজ আমরা ভোট দেয়ার অধিকার ফিরে পেয়েছি। তাই এদের কল্যাণের জন্য চিন্তা করা, তাদের জীবনের সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য পদক্ষেপ নিতে কোন দল কতটা আন্তরিক সেটাই হওয়া উচিত ছিল আমাদের বিতর্কের প্রধান টপিক।
ভোট দেয়ার ব্যাপারে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আসুন এই মানুষগুলোর জীবনের বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করি।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জুলাই সনদ সংবিধানের অংশ হবে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে “হ্যাঁ” অথবা “না” ভোট দেয়া। যথারীতি এই বিষয়টি নিয়েও তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকেই নানা মুনির নানা মত শুনে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
এবারে আমি গণভোটে “হ্যাঁ” / না” ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে রিয়েলিটি, প্রায়োরিটি এবং ভিশনারী—এই তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।
প্রথমেই আসি, রিয়েলিটির ক্ষেত্রে।
অনেকেই বলছেন গণভোটের ৮৪টি ধারাকে একসাথে “ “হ্যাঁ” অথবা “না” ভোটের অধীনে নিয়ে আসা ঠিক হয়নি।
আচ্ছা ধরেন, ৮৪ টা ধারাকে ১০টা সিমিলার ক্যাটাগরির অধীনে নিয়ে এসে আলাদাভাবে “ “হ্যাঁ” অথবা “না” সিলেক্ট করার সুযোগ দেয়া হলো। সেক্ষেত্রে ভোট দেয়ার জন্য আমাদের কি করতে হবে?
বাসায় আগেই সবগুলো ক্যাটাগরি পড়ে ডিসাইড করতে হবে আমি কোন ক্যাটাগরিতে “ “হ্যাঁ” দিব আর কোন ক্যাটাগরিতে “না” দিব, এরপর সেই অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ক্যাটাগরি ধরে ধরে “হ্যাঁ” অথবা “না” ভোট দিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটা ভোটারের মিনিমাম কতটুকু সময় লাগবে এবং কি পরিমাণ হোমওয়ার্ক করতে হবে একটু চিন্তা করেন।
আমাদের মতো সুশীল যারা অনলাইনে পোস্ট লিখে দেশ উদ্ধার করি তারা নাহয় ৮৪টা ধারা পড়ার এবং কোনটাতে “হ্যাঁ” / না দিব সেটা ঠিক করার এই কষ্ট সহ্য করলাম কিন্ত আমার বাসার ছুটা বুয়া বা সেই সি.এন.জি ড্রাইভার যে সারাদিন, সারাবছর কায়িক পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে তাদের এই ঝামেলা নেয়ার সময়/ সুযোগ আছে কি?
অথচ তারাও তো দেশের নাগরিক, তাদেরও ভোট দেয়ার অধিকার আছে, নাকি?
প্রতিটা ধারা অনুযায়ী ক্যাটাগরি করে “হ্যাঁ” অথবা “না” ভোট দেয়ার অপশন রাখার দাবি যারা করছেন তারা এই বাস্তবতা ভেবে দেখেছেন কি?
এবার বলি ভোট গণণা নিয়ে।
আমি নিজে একবার ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। সারাদিন ভোট নেয়ার পর শুধু মার্কা অনুযায়ী আলাদা করে ভোট গণণা করতেই যেখানে রাত হয়ে যায়, ক্লান্তি এসে ভর করে সেখানে যদি কোন ক্যাটাগরিতে কতটি “ “হ্যাঁ” ভোট পড়েছে , কতটি “না” ভোট পড়েছে, কতটি “আপত্তিসহ ভোট” পড়েছে—–এভাবে ভোট কাউন্ট করতে হয় তবে সেটা কতটা সময়সাপেক্ষ এবং ক্লান্তিকর হবে তা ভেবে দেখেছেন কেউ? সেটা বাস্তবায়ন করার খরচ এবং মানবসম্পদ সেগুলো কি আদৌ আমাদের আছে?
এসব বাস্তবতা চিন্তা করেই কিন্ত জামায়াত, এন.সি.পি সহ কিছু রাজনৈতিক দল জোরালো দাবি জানিয়েছিল গণভোট আগেই আলাদাভাবে করার। তখন কিন্তু এই সুশীল, সচেতন জনগণ তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে পোস্ট দেয়নি, আন্দোলন করেনি। যদি তাই করতো তবে, বি.এন.পির একতরফা দাবির কাছে নতি স্বীকার করে সরকার একই দিনে দুই ভোট করার সিদ্ধান্ত নিত না। বি.এন.পি তো সবসময়ই চায় গণভোট যেন সফল না হয়, সংস্কার যেন করতে না হয়। নির্বাচনের শেষ সময়ে এসে অবাস্তব কিছু দাবি তুলে তাদের সেই চাওয়াকে সফল করতে আমরা ইন্ধন দিচ্ছি কিনা আসুন ভেবে দেখি।
এবারে আসি, প্রায়োরিটির ক্ষেত্রে।
গণভোটের ৮৪টি ধারার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর মাধ্যেমে মূলত চেষ্টা করা হয়েছে পরবর্তী যে কোনো সরকার যেন ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে সেই পথ বন্ধ করার। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একজন শাসক তখনই ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠে যখন সে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পায়, তার আশেপাশে এমনসব মানুষকে বসানোর সুযোগ পায় যারা তার যে কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে না । আর এই সুযোগগুলো বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছে এবারের সংস্কার প্রস্তাবে। কিভাবে-
১. জুলাই সনদ কার্যকর হলে সংসদে উচ্চ কক্ষ, নিম্ন কক্ষ দুইটা ভাগ থাকবে যেটার ফলে ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না।
২. প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মাঝে ভারসাম্য থাকবে।
৩. সেনাবাহিনী প্রধান, দুদক প্রধান, নির্বাচন কমিশন প্রধান এইসব রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে এককভাবে কাউকে নিয়োগ দেয়া যাবে না।
অর্থ্যাত, আওয়ামী লীগ যেমন রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপুর্ন পদে ইচ্ছামত নিজেদের লোক বসিয়ে জঙ্গী ট্যাগ দিয়ে সব ঘরানার ইসলামিস্টদের গুম, খুন করে লাইফটা জাহান্নাম বানিয়ে ফেলতে পেরেছে, সেটার রাস্তা বন্ধে একটা স্টেপ নেয়া হবে।

তাহলে জুলাই সনদে আপত্তিকর যেসব ধারার কথা বলে হচ্ছে সেগুলোর ব্যাপারে কিভাবে সিদ্ধান্ত নিব?
এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি যে আপত্তি তোলা হচ্ছে এমন সব ধারা গুলো আমি নিজে পড়ে দেখেছি এবং LGBT বিষয়ে একটি ওয়েবসাইট রেডি (https://www.fightingrainbow.com/) করার অভিজ্ঞতা থাকার সুবাদে এই বিষয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা আছে। শব্দের মারপ্যাঁচের মাধ্যমে কিভাবে এই বিষয়টিকে নর্মালাইজ করার চেষ্টা করা হয় সেই কৌশলগুলো সম্পর্কে আমি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।
কোন ধারাগুলো নিয়ে আসলে আপত্তি তোলা হচ্ছে? ছবিতে লক্ষ্য করুন প্লিজ।

এখানে’ ইনক্লুসিভ ‘ রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। যারা আপত্তি তুলছেন, তারা দাবী করছেন যে এভাবে শব্দের মারপ্যাঁচ দিয়ে সমকামী এজেন্ডাকে বাস্তবায়ন করা হবে। নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়েও তাদের আপত্তি। তাদের আশঙ্কা যে এর মাধ্যমে ট্রান্স জেন্ডার নারীরা সংসদে ঢুকে যাবে।
এইসব আশঙ্কা আসলে কতটুকু বাস্তবসম্মত সেটা একটু আলোচনার দাবী রাখে। এজন্য আমাদের একটু ভিশনারি হতে হবে।
শব্দের মারপ্যাঁচ দিয়ে LG বান্ধব নীতি বা ট্রান্সজেন্ডারদের ক্ষমতায় যাওয়া কখন সম্ভব?
১. যখন ইসলাম পন্থীরা চরম জুলুম, গুম, খুন নির্যাতনের শিকার যে তারা কোনো ইসলামিক দাওয়াতী কাজই করতে পারছে না।
২. রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের সব কমিশন, ক্ষমতাশীল পদগুলো বাম, ইসলাম বিদ্বেষী মানুষদের দিয়ে ভরে গেছে যারা পাঠ্যপুস্তকসহ সব জায়গায় এইসব বিষয় সুকৌশলে ঢোকাতে তৎপর।
আসেন এই জায়গায় একটু বিরতি নেই।
ঠিক এগুলো ঠেকানোর জন্যই কি আমরা জুলাই সনদ কার্যকরের ব্যাপারে জোর দিচ্ছি না?
সংস্কার প্রস্তাবের মূল কথাই তো হল নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে যেন ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে। যে দলই ক্ষমতায় যাক না কেন তারা যেন একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারে।
তর্কের খাতিরে যদি আমরা ধরেই নেই, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার LGBT বিষয়টিকে নরমালাইজ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করবে তখনি কিন্তু সেটাতে বাঁধা দেয়ার জন্য হলেও এবারের গণভোটের হ্যাঁ ভোট দিয়ে সংস্কার বিষয়ক ধারা গুলো পাশ হওয়া জরুরি।
সবশেষে আপনাদের কুরআনের একটা আয়াত মনে করিয়ে দিতে চাই —
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী একটি মাপকাঠি দেবেন, তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ তো বড় দানের মালিক।” (সূরা আনফাল: ২৯)
বিভিন্ন জনের নানা কথা শুনে বিভ্রান্ত হয়ে গেলে উপরের আয়াতের রেফারেন্স টেনে দুআ করতে পারি আমরা। হাদীসে সরাসরি এমন দুআ শিখানো আছে –
“হে জিবরাইলের রব, মিকাইলের রব, ইসরাফিলের রব! হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা! হে দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী! আপনার বান্দারা যে নিয়ে মতভেদ করে, আপনি তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা হয়েছে সে বিষয়ে আপনি আমাকে পথ দেখান। আপনি যাকে ইচ্ছা করেন, তাকেই সরল পথ দেখান।” (সহীহ মুসলিম: ৭৭০)
আল্লাহ আমাদেরকে আরো একবার জালিম শাসকদের কবলে পড়ার পরীক্ষা থেকে রক্ষা করুন, এমন শাসক বেছে নেয়ার তৌফিক দিন যারা দেশের স্বাধীনতা রক্ষা, দেশকে চাঁদাবাজ ও দুর্নীতি কমানোকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দিবে।
