ভূমিকা
স্কুল লাইফে যখন বিতর্কের টপিক সিলেক্ট করতাম তখন খেয়াল রাখতে হতো টপিকের পক্ষ -বিপক্ষ উভয়দিকে যুক্তি আছে কিনা। কিন্তু বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখি প্রতিটা টপিককেই বাঙালি বিতর্কের টপিক বানিয়ে ফেলতে পটু হয়ে গেছে। গাজায় গণহত্যার মতো সেনসিটিভ ইস্যু থেকেও হাজারটা সাইড ইস্যু বের করে সেটার পক্ষে-বিপক্ষে পোস্ট দিয়ে, কমেন্ট করে শুধু যে নিজের সময়, এনার্জি ব্যয় করছে তা নয়, বরং মূল ফোকাস থেকে সরে গিয়ে অনেকের মনেই কনফিউশন তৈরি করছে, পাজলড করে দিচ্ছে।
আমেরিকায় থাকা জায়েজ কি না ?
সেখানে পড়তে যাওয়া জায়েজ কি না?
বাংলাদেশে বসে প্রতিবাদ করা, বয়কট করা আদৌ ইফেক্টিভ কি না?
মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর নীরব ভূমিকা যৌক্তিক কি না ?
——————————————————————————-
এরকম বহুবিধ ইস্যুর ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে একটি মৌলিক প্রশ্ন–
চোখের সামনে এরকম ভয়াবহ মানবহত্যা দেখার পরও মুসলিম হিসেবে, মানুষ হিসেবে আমাদের প্রতিটি ইন্ডিভিজুয়াল এর করণীয় কি?
আমাদের লাইফ কি এখনো আগের মতোই কাজ করলাম ,খেলাম, ঘুমালাম– এই বৃত্তেই আটকে থাকবে নাকি আমূল বদলে যাবে?
নাকি যার যার অবস্থান থেকে নতুন করে চিন্তা -ভাবনা করার, ভিন্ন কিছু করবার দায়িত্ব আছে প্রত্যেকেরই??
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই সিরিজ।
পর্ব এক
যারা উচ্চশিক্ষা, গবেষণা বা জীবিকার কারণে বর্তমানে বিদেশে, বিশেষ করে আমেরিকাতে আছেন তারা অনেকে এই মুহূর্তে আত্মগ্লানিতে ভুগছেন এই ভেবে যে আপনাদের ট্যাক্সের টাকায় অস্ত্র কিনে তা ইসরাইলে পাঠানো হচ্ছে এবং সরাসরি ফিলিস্তিনে মুসলিম হত্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে। আপনাদের হৃদয়ের এই রক্তক্ষরণ প্রমাণ করে যে আপনাদের বিবেকবোধ জাগ্রত আছে এবং মুসলিম উম্মাহর প্রতি আত্মিক টানও আছে। প্রথমেই আপনাদের এই অনুভূতির জন্য সাধুবাদ জানাই ।
এবার আপনাদের এই মুহূর্তে কি করণীয় সে সম্পর্কে কিছু টিপস দিতে চাই।
প্রথমত: যে পরিমাণ অর্থ আপনারা ট্যাক্স দিতে বাধ্য হচ্ছেন তার সমপরিমাণ না হলেও কাছাকাছি অ্যামাউন্ট প্রতি মাসে সাদাকাহ করতে পারেন। গাজার ফান্ডে করতে পারলে ভালো, না পারলেও দেশের অন্য প্রজেক্টে করুন। এটা অনেকটা কাফফারের মতো এবং এটা যেন কবুল হয় সেজন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: বিক্ষোভ, প্রতিবাদে অংশ নিতে হবে । মহিলারা নিজেরা বাচ্চা সহ যেতে না পারলে পরিবারের পুরুষদের যেতে উৎসাহিত করতে হবে । সত্যি কথা বলতে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু কে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করা, প্রয়োজনে ক্ষমতাচ্যুত করার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এখন এই দুই দেশের অধিবাসীদেরই। এটা একটি রাষ্ট্রীয় পাপ এবং এই পাপমোচন এর দায়ভার সেখানকার জনগণকেই নিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম নেতারা এবং সেখানকার জনগণ কেন চুপ আছে– সেটা ভিন্ন আলাপ। তাদের হিসাব তারা দিবে। কিন্তু এই দুই দেশ, যারা সরাসরি গণহত্যায় জড়িত তাদের জনগণের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
আমরা যেমন হাসিনার ১৫ বছরের পাপ মোচন করতে রক্ত দিয়েছি জীবন দিয়েছি, তেমনি আপনাদেরকেও বাইডেন, ট্রাম্পের পাপ মোচন করতে প্রতিবাদ করতে হবে। দলে দলে বাংলাদেশে ফিরে আসা কোনো সমাধান নয় বরং তা কাপুরুষতা হবে। এতদিন যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন/ করেছেন তার বিনিময়ে তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত: এটা একটা নির্মম বাস্তবতা যে, প্রবাসে মুসলিমরা খুব একটা প্রভাবশালী অবস্থায় নেই। অন্যদিকে ভারতীয়রা বরং ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদেরকে প্রভাবিত করছে। এথেকেই মুসলিমদের দূরদর্শিতার অভাব বোঝা যায়।
তাই আপাতত মুসলিমদের যেটা করতে হবে তা হলো নিজেদের সার্কেলের অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতি কার্যক্রম বাড়াতে হবে। যেহেতু গাজার মুসলিম নিধন এখন আর শুধু ধর্মীয় ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই, এটা মানবতাবিরোধী অপরাধে পরিণত হয়েছে, তাই এই ইস্যুতে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা এখন অপেক্ষাকৃত সহজতর হওয়ার কথা। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে।
আশার কথা এই যে, ২০২৩ এর পর বিভিন্ন দেশে অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এবং এই রিভার্টেড মুসলিমরাই ইসলামের পারপাস সার্ভ করার ক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকা রাখবে বলে আমার ধারণা। তাই অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াতী কাজ পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবী।
চতুর্থত: সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, আপনাদের সন্তানরা যারা সে দেশের নাগরিক তাদেরকে সঠিক ইসলামিক জ্ঞান দেয়া এবং তাদেরকে সঠিক ইসলামিক জীবনচারণে অভ্যস্ত করার ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া।
তারা যেহেতু আমেরিকার নাগরিক এবং একই সাথে মুসলিম– এই বিষয়টিকে আশীর্বাদে পরিণত করতে হবে। ফেরাউনের ঘরে যেমন মুসা আলাইহিস সালাম প্রতিপালিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়েছিল তেমনি আপনাদের সন্তানদেরকেও এক একজন মূসা হিসেবে তৈরি করুন ,যেন তারা আমেরিকায় জন্ম নেয়া এবং বড় হওয়ার এডভান্টেজ নিয়ে সেখানকার জনগণের মাঝে দাওয়াতী কাজ করতে পারে এবং ডিসিশন মেকিং এ ভূমিকা রাখতে পারে । ওখানে born & broughtup হওয়ার কারণে তারা ওখানকার জনগণের পালস ভালোভাবে বুঝতে পারবে এবং তাদের সাথে কমিউনিকেট করা তাদের জন্য সহজ হবে।
আমি জানি, এতক্ষণ যা লিখলাম তার সবকিছু বাস্তবে রূপ দেয়া কঠিন। তবে নিয়ত ঠিক রাখলে এবং আন্তরিকতার সাথে দুয়া করলে আল্লাহ সহজ করে দেবেন ইনশাআল্লাহ।
নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের চেষ্টাটুকু দেখেন। ফলাফল দেয়ার মালিক তো তিনিই।
পর্ব ২
আমরা বাংলাদেশীরা যারা হাজার মাইল দূরে বসে গাজায় মুসলিম নিধন দেখে আবেগ-আপ্লুত হচ্ছি তারা ইসরায়েলি/ আমেরিকান পণ্য বয়কট করা , বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সমাবেশ করা ছাড়াও ইমপ্যাক্টফুল যে কাজটা করতে পারি তা হলো দুয়া করা।
কিন্তু এই দুয়ার ক্ষেত্রে আমার প্রাইম কনসার্ন হলো আমাদের দুয়া কি আদৌ কবুল হবে কিনা বা হচ্ছে কিনা!!
তাছাড়া আমরা যে সৎোসাহে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমরা নীরব আছে বলে তাদের ধিক্কার জানাচ্ছি, আমরা কি নিজেদের দিকে তাকিয়ে আত্মসমালোচনা করেছি যে এতদিন নিজেদের দেশে কত জুলুম মেনে নিয়েছি? বিডিআর হত্যা, শাপলা চত্বরে হত্যা, গুম, খুন, দুর্নীতি, ব্যক্তিপূজা—এরকম কত ধরনের অন্যায় ঘটেছে আমাদের নিজের দেশেই। আমরা তারপরও ৩৪ বছর যাবৎ একটি মুসলিম প্রধান দেশে নারী নেতৃত্ব মেনে নিয়েছি, যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।
জাতিগতভাবে নাহয় বাদ দিলাম, ব্যক্তিজীবনেও আমরা ২০২৩ এর অক্টোবরের পর থেকে কতটুকু Better Muslim হতে পেরেছি??
আসুন একটা চেকলিস্ট করি–
# ইনকাম হালাল তো?
# কোনো না কোনো ভাবে সুদের সাথে জড়িত নেই তো?
# শরীরের কোথাও তাবিজ নেই তো?
# গীবত করা ছাড়তে পেরেছি? হিংসা করা?
# সোশাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড দেয়া বন্ধ করেছি।
মুসলিম হিসেবে এই বেসিক ক্রাইটেরিয়াগুলো ফিলআপ করতে না পারলে ফিলিস্তিনিদের জন্য যতই আবেগ থাকুক, আমাদের দুয়া কবুল হবে তো?
শুধু নিজে বদলালেই হবে না, নিজের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, কলিগ, বন্ধু-বান্ধব, সর্বোপরি দেশের মানুষের মাঝে দাওয়াতী কার্যক্রম না করে হুজুগের বশে হাজার মাইল দূরে গিয়ে জিহাদ করতে চাইলে সেটা আদৌ ইসলামের জন্য কবুল হবে তো?
আসুন, চিন্তা করি। আত্মসমালোচনা করি। আবেগ নয়, বিবেককে কাজে লাগাই।
নিজের অবস্থানে থেকে কিভাবে আত্মোয়ন্নয়ন করা যায়, নিজের দেশের মানুষকে সচেতন করা যায় সেদিকে মনোযোগী হই।
একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, গাজার ঘটনা আমাদের দেশের মানুষদের জন্য একটা বিরাট শিক্ষা।
মুসলিমদের শত্রুরা কতটা দূরদর্শী, ফোকাসড এবং লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তার প্রমাণ এই ঘটনা।
গাজা দখলের পরিকল্পনা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বরং ইসরায়লীদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার নির্মম বাস্তবায়ন মাত্র। তাই এই ঘটনা থেকে আমাদের সচেতন হতে হবে আমাদের নিকটবর্তী শত্রু সম্পর্কেও।
তারা ইসরাইলীদের অন্যতম মিত্র এবং চরিত্রগত দিক থেকেও অনেক সাদৃশ্য রয়েছে।
তারা দীর্ঘদিন আমাদের শোষণ করেছে এবং আরও দীর্ঘমেয়াদে শোষণ করবে বলে পরিকল্পনা সাজিয়ে ধাপে ধাপে আগাচ্ছিল। ৫ আগস্ট ২০২৪ এ তাদের ‘বাড়া ভাতে ছাই’ পড়েছে। তাই শত্রুরা এখন তাদের
প্রভুত্ব পুনরায় কায়েমে মরিয়া।
তাছাড়া তাদের দেশেও মুসলিমদের অবস্থা ক্রমশ নাজুক হচ্ছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে তাদের দেশের মুসলিমদের হক আমাদের উপর অনেক বেশি। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের মুসলিমরা একটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সেই সময়ের জন্য নিজেদেরকে, পরবর্তী প্রজন্মকেও প্রস্তুত করতে হবে এখন থেকেই। নিজের ঈমান, আমল মজবুত করার পাশাপাশি প্রচুর দাওয়াতী কাজ করতে হবে অনলাইন এবং অফলাইনেও।
উপসংহার
উপরোক্ত দুই পর্বেই আমি বিদেশে এবং দেশে উভয় জায়গায় অবস্থানরত মুসলিমদের দাওয়াতী কাজ করার ব্যাপারে গুরুত্বআরোপ করেছি। এবার এই দাওয়াতী কাজ করার ক্ষেত্রে কিছু টিপস শেয়ার করি-
# যে যেই টপিকে কাজ করতে চান সেই টপিকে আগে নিজে পড়াশোনা করে কনসেপ্ট ক্লিয়ার করেত হবে।
# এক- দুই বারের চেষ্টায় সফলতা অর্জনের প্রত্যাশা না করে সময় নিয়ে ধাপে ধাপে আগাতে হবে।
# একার প্রচেষ্টায় সম্ভব না হলে সমমনাদের নিয়ে দল গঠন করতে হবে এবং প্রত্যেকের field of expertize অনুযায়ী কাজ ভাগ করে নিতে হবে।
# দাওয়াতী কাজ করতে গিয়ে নিজের পরিবারের হককে উপেক্ষা করা যাবে না।
এক্ষেত্রে আমি ব্যক্তিগতভাবে যে টেকনিক ফলো করি তা হলো, প্রতিটি দিনের কার্যক্রমকে তিনভাগে ভাগ করে নেই। নিজের ব্যক্তিগত আমল করা, পারিবারিক দায়িত্ব পালন করা এবং উম্মাহ’র জন্য উপকারী হবে এমন কিছু কাজ করা।
এভাবে প্রতিটি দিন শেষে যদি নিজের তিন ধরনের কাজের চেকলিস্ট করতে পারি তবে সব ধরনের হক আদায়ের ব্যাপারেই নিজেকে আপডেট রাখা যাবে ইনশাআল্লাহ।
সবশেষে বলতে চাই , এই সিরিজে যা কিছু লিখেছি তা আমার একান্তই নিজস্ব মতামত । সবাইকে সব মতের সাথে একমত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই।
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার নিয়ত জানেন এবং বিচারের মালিক তিনি।
যদি এই সিরিজ পড়ে একজনও উপকৃত হন, তবে আলহামদুলিল্লাহ।

আপনি দারুণ লিখেছেন। এভাবেই লিখে যান ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ্ আপনাকে আরও হিদায়াত ও রহমত দান করুন।