আলী (রা:) এর মৃত্যু: ইসলামের ইতিহাসে প্রথম একই সময়ে দুইজন খলিফার আবির্ভাব
হিজরী ৩৭ সনে আলী (রা:) তার খিলাফতের রাজধানী স্থানান্তর করেন ইরাকের ‘কুফা’ শহরে। তখন তার সাথে হাসান (রা:) ও হুসেন (রা:) কুফাতে যান।
খারেজীদের হাতে আলী (রা:) শহীদ হওয়ার পর কুফার জনগণ হাসান (রা:) এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে।
অন্যদিকে সিরিয়ার জনগণ মুয়াবিয়া (রা:) এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। ফলে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম একই সময়ে দুইজন খলিফার আবির্ভাব দেখা দেয়।
তখন মুয়াবিয়া (রা:) খিলাফতের বিষয়টি ফয়সালা করার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কিন্তু সম্ভাব্য যে কোনো যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাসান (রা:) তার খিলাফতের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। হিজরী ৪১ সনে এই ঘটনা ঘটে।
তবে তার এই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি তৎকালীন কুফার জনগণ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। হাসান (রা:) অনেক চেষ্টা করে অবশেষে তাদের শান্ত করতে সক্ষম হন। ফলে ইরাকের জনগণ শেষ পর্যন্ত বাকি উম্মতের ভাগ্যের সাথে নিজেদের ভাগ্যকে মেনে নেয়। আর এর পরপরই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাসান (রা:) শান্তিপূর্ণভাবে মদিনায় ফিরে আসেন।
হুসেন (রা:)ও তার অগ্রজের এই দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তিনি প্রতিবাদও করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাসান (রা:) তাঁকেও শান্ত করেন এবং বোঝান উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে তিনি যেন এই সিদ্ধান্তকে মেনে নেন । হুসেন (রা:) শান্ত হোন এবং যতদিন হাসান (রা:) জীবিত ছিলেন তিনি এ বিষয়ে আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি।
হাসান (রা:) জীবনের বাকি দিনগুলো অনেকটা নিভৃতে কাটিয়ে দেন। তিনি ৫০ হিজরীতে মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
মুয়াবিয়া (রা:) কর্তৃক তার ছেলে ইয়াজিদকে খিলাফতের উত্তরাধিকার হিসেবে মনোনয়ন
হাসান (রা:) ইন্তেকালের পরপর মুয়াবিয়া (রা:) তার ছেলে ইয়াজিদকে খিলাফতের উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। ইতিহাসে আমরা ইয়াজিদের নাম প্রথম জানতে পারি যখন তার পিতা মুয়াবিয়া তাকে রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী জয় করার জন্য সেনাপতি হিসেবে অভিযানে প্রেরণ করেন। তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক ২০ বছর। এখানে উল্লেখ্য যে, হুসেন (রা:)ও এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অর্থ্যাৎ ইয়াজিদ
ও হুসেন (রা:) একসাথে রোমানদের বিরুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যদিও এই যুদ্ধের ২৫ থেকে ৩০ বছর পর এই দুজনের সামনে পুরো বিপরীত বাস্তবতা চলে আসে।
মুয়াবিয়া (রা:) শুধু ছেলে ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করে ক্ষান্ত হলেন না বরং তিনি জীবিত থাকা অবস্থাতেই এটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেন যে, যেন তার মৃত্যুর পর আর কেউ ইয়াজিদের খিলাফত নিয়ে কোন সংকট তৈরি করতে না পারে।
সেজন্য তিনি বিভিন্ন প্রদেশের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে ইয়াজিদের পক্ষে সমর্থন জোগাড় করার চেষ্টা করলেন। মুসলিম দেশের অনেক স্থান থেকে ইয়াজিদের পক্ষে সমর্থন আদায় করা সম্ভব হলো। কিন্তু মক্কা ও মদিনার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারকগণ পর্যন্ত কেউই এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত হলেন না। তবে মুয়াবিয়া (রা:) জীবিত থাকা অবস্থায় তারা কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেননি।
কুফাবাসীর পক্ষ থেকে হুসেন (রা:) কে আমন্ত্রণ
হিজরি ৬০ সালের রজব মাসে মুয়াবিয়া (রা:) ইন্তেকাল করেন। এরপর মদিনায় ইয়াজিদের নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর হুসেন (রা:) কে প্রকাশ্যে ইয়াজিদের প্রতি বাইয়াতের ঘোষণা দেয়ার জন্য বারবার চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এক পর্যায়ে হুসেন (রা:) বিরক্ত হয়ে সপরিবারে মক্কার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। গন্তব্য হিসেবে তিনি মক্কাকে বেছে নেন কারণ সেখানে ইয়াজিদের নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম ছিল।
হুসেন (রা:) এর মদিনা ত্যাগের খবর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। নানা প্রদেশ ঘুরে যখন ইরাকে বিশেষত কুফায় এই সংবাদ পৌঁছলো, তখন কুফার মানুষ আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠলো, কারণ তারা কখনোই ইয়াজিদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিল না। এরপর থেকে তারা মক্কায় অবস্থানরত হুসেন (রা:) এর কাছে চিঠি ও প্রতিনিধি পাঠানো শুরু করল। প্রতিটি চিঠিতে তারা একই বার্তা দিল–” সময় হয়ে গেছে, আপনি দায়িত্ব গ্রহণ করুন ।আমরা আপনার সাথেই আছি। আপনি কুফায় চলে আসুন।”
বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ থেকে জানা যায় কুফা থেকে হুসেন (রা:) এর কাছে ৬০ এর বেশি চিঠি পাঠানো হয়। এতসব চিঠি, বার্তা ও তাদের প্রেরিত প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করার পর হুসেন (রা:) কুফাবাসীর এই আগ্রহকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে শুরু করলেন।
তবে শুরুতেই তিনি নিজে কুফায় যাওয়ার মতো ভরসা করতে পারলেন না। তাই তিনি তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিল কে আগে কুফায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কুফাবাসী যেমনটা দাবি করছে পরিস্থিতি আসলেই তেমন কিনা তা যাচাই করার জন্য মাত্র ৫ জন মানুষ নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন।
মুসলিম ইবনে আকিল কে কুফাবাসীর সাদরে গ্রহণ
হিজরী ৬০ সালের জিলকদ মাসে মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় পৌঁছলেন। আর ৬১ হিজরীর মহররম মাসে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। অর্থ্যাৎ কারবালার ঘটনার দুই মাস আগে মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় পৌঁছান । এই দুই মাস ছিল নানাধরনের নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ।
প্রথমে কুফাবাসী তাকে পেয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত হলো যে, হাজার হাজার মানুষ, ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী প্রায় ১২ হাজারের মতো মানুষ পরবর্তী দুই সপ্তাহে হুসেন (রা:) এর প্রেরিত প্রতিনিধি হিসেবে মুসলিম ইবনে আকিলের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করলো।
বাইয়াত অর্থ আনুগত্যের চূড়ান্ত নমুনা। বাইয়াত নেয়ার অর্থ হলো- একজন ব্যক্তি এই মর্মে স্বীকৃতি দিচ্ছে যে,” যা কিছুই ঘটুক না কেন আমরা আপনার সাথেই থাকবো, আপনার আদেশ মান্য করবো।”
১২০০০ মানুষ অর্থাৎ কুফা নগরীর প্রায় অধিকাংশ মানুষ বাইয়াত গ্রহণ করায় মুসলিম ইবনে আকিল অভিভূত হয়ে গেলেন এবং তিনি হুসেন (রা:) কে চিঠি লিখে জানালেন, “কুফার মানুষ আপনাকে বরণ করে নেয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তাই বিলম্ব না করে আপনি কুফায় চলে আসুন।”
মুসলিম ইবনে আকিল হুসেন (রা:) কে এই চিঠি পাঠিয়েছিলেন হিজরী ৬০ সালের জিলকদ মাসে।
ইয়াজিদ কর্তৃক কুফার নতুন গভর্নর নিয়োগ এবং পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন
কুফার এসব ঘটনা দামেস্কে অবস্থানরত ইয়াজিদের কাছে পৌঁছালে সে কুফার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ইবনে জিয়াদ নামক একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ধূর্ত রাজনীতিবিদকে কুফার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। ইবনে জিয়াদ ছিল এমন একজন ব্যক্তি, যার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল শাসক মহলের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করে নিজের পদোন্নতি হাসিল করা।
দায়িত্ব পাওয়ার পর ইবনে জিয়াদ মাত্র ১৭ জন সঙ্গী নিয়ে কুফা নগরীতে প্রবেশ করে। সে কুফা নগরীতে প্রবেশ করে ফজরের নামাজের পরপর। এসময় সে পাগড়ী দিয়ে নিজের মুখ ও মাথা ঢেকে রেখেছিল । ভোরবেলা এরকম একটি পোশাকে যখন সে শহরে প্রবেশ করেছিল তখন অনেকেই মনে করেছিল হুসাইন (রা:) কুফায় এসেছেন। তাই জনগণ তাকে স্বাগত জানিয়ে স্লোগান দিতে শুরু করে।
মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত স্লোগান ও অভিবাদন দেখে ইবনে জিয়াদ বুঝে গেল কুফায় বিদ্রোহের বীজ গজিয়ে ওঠার যে তথ্য সে পেয়েছিল তা গুজব নয় বরং সত্য। মূলত সে সাধারণ মানুষের মনোভাব বোঝার জন্যই মুখ ঢেকে শহরে প্রবেশ করেছিল। আর তার সেই কৌশল সফল হয়েছে।
মানুষ যখন এভাবে তাকে হুসেন (রা:) মনে করে অভিবাদন জানাচ্ছিল তখন ইবনে জিয়াদের সফরসঙ্গীদের একজন জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো, “ থামো তোমরা!! ইনি হুসেন নন বরং তোমাদের নতুন গভর্নর ইবনে জিয়াদ। “
সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উচ্ছ্বাস থেমে গেল। তারা চুপ হয়ে গেল। জনগণ বুঝে ফেলে যে তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে।
এদিকে ইবনে জিয়াদ দায়িত্ব বুঝিয়ে নিয়ে তার আবাসস্থলে চলে গেল এবং সেখানে বসে তার পরবর্তী কর্মকৌশল নির্ধারণ করলো। প্রথম প্রশাসনিক আদেশ হিসেবে সে নির্দেশ দিল মুসলিম ইবনে আকিলকে গ্রেফতার করতে হবে।
কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা
মুসলিম ইবনে আকিলকে খুঁজে বের করার জন্য ইবনে জিয়াদ নিজের ধূর্ত বুদ্ধি প্রয়োগ করলো। সে তার সঙ্গে আসা ১৭ ব্যক্তির মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করলো, যাকে কুফার মানুষ চিনতো না। সেই ব্যক্তিকে পর্যটকের ছদ্মবেশ ধারণ করার নির্দেশ দিল এবং এরপর তাকে অনেক স্বর্ণ মুদ্রা দিল।
ইবনে জিয়াদ তাকে বললো, ”তুমি সিরিয়ার একজন পর্যটক হিসেবে কুফাতে বসবাসরত শিয়াদের কাছে যাবে এবং তাদের বলবে যে, তুমি এই স্বর্ণ মুদ্রাগুলো শিয়াদের প্রধান দলপতির কাছে প্রদান করতে চাও। আরও বলবে সিরিয়ার শিয়ারা তোমার কাছে এই স্বর্ণ মুদ্রা আমানত হিসেবে দিয়েছে, তাই আমানতদারিতার সাথেই এই স্বর্ণ মুদ্রাগুলো শিয়া নেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া তোমার দায়িত্ব। শিয়াদের মূল নেতাকে পাওয়া ছাড়া আর কারো কাছে তুমি এই অর্থ হস্তান্তর করবে না।”
ইবনে জিয়াদের পরামর্শ মোতাবেক এই গুপ্তচর পরবর্তী কয়েক দিন কুফায় অবস্থানরত প্রসিদ্ধ সব শিয়া ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে তার ইচ্ছা প্রকাশ করল এবং এভাবে একপর্যায়ে সে সেই শিয়া ব্যক্তির কাছে পৌঁছলো যিনি মূলত মুসলিম ইবনে আকিলকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
এই ব্যক্তির নাম ছিল হানি ইবনে উরওয়া। কুফার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে গভর্নর মহলেও বেশ পরিচিত ছিলেন। তবে ভিতরে ভিতরে তিনি শিয়া এবং মুসলিম ইবনে আকিলকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছিলেন ।এখানে উল্লেখ্য যে তখনও পর্যন্ত শিয়া একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছাড়া আর কিছুই ছিল না, আকীদা বিষয়ে তাদের ভিন্নতাও ছিল না।
শেষ পর্যন্ত তিনি গুপ্তচর এর ফাঁদে পড়ে যান এবং গুপ্তচরকে বলেন, ”তুমি আমাকে তোমার অর্থ দাও, আমি মুসলিম ইবনে আকিলকে পৌঁছে দেব।”
হানি ইবনে উরওয় ‘র হাতে অর্থ পৌঁছে দিয়ে গুপ্তচর ইবনে জিয়াদের কাছে যায় এবং জানায় যে, মুসলিম ইবনে আকিল আছেন হানি ইবনে উরওয়া ‘র আশ্রয়ে। ইবনে জিয়াদ তৎক্ষণাৎ হানি ইবনে উরওয়াকে তলব করেন এবং প্রস্তাব দেন যে, মুসলিম ইবনে আকিল’কে তাদের হাতে তুলে দিলে তাকে সসম্মানে ছেড়ে দেয়া হবে।
হানি ইবনে উরওয়া অবশ্য নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করতে চাননি, বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দিয়ে এই অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ইবনে জিয়াদ তখন তার সেই গুপ্তচরকে দরবারে ডেকে আনে এবং তাকে দেখে হানি ইবনে উরওয়া বুঝে যায় যে, সত্য গোপনের চেষ্টা করে লাভ নেই।
ইবনে জিয়াদ এর নির্দেশে এরপর হানি ইবনে উরওয়াকে বর্ষা দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।
এদিকে ইবনে জিয়াদের প্রাসাদে হানি ইবনে উরওয়া কে আটকে রেখে নির্যাতনের খবর কুফায় ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম ইবনে আকিলও বুঝে গেলেন পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হয়ে যাচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি গোপন কোড ব্যবহার করে তার অনুসারী শিয়াদের কাছে কিছু বার্তা পাঠিয়ে দিলেন। এভাবেই শিয়াদের মধ্যে গোপন কোড ব্যবহারের কৌশল শুরু হয়।
মুসলিম ইবনে আকিল যে কোডটি ব্যবহার করেন তা ছিল, ”ইয়া মনসুর আমিত অর্থাৎ হে বিজয়ীরা ! তোমরা মৃত্যুকে বরণ করে নাও ।”
এটা ছিল সর্বাত্মক প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কুফার এত বিপুল সংখ্যক মানুষ মুসলিম ইবনে আকিল এর কাছে বাইয়াত নিলেও তিনি যখন সর্বাত্মক প্রতিরোধের ডাক দিলেন তখন তার ডাকে সাড়া দিলেন মাত্র ৪হাজার মানুষ। অর্থাৎ ১২ হাজার বাইয়াত গ্রহণকারীর মধ্যে মাত্র চার হাজার হাজির হলেন। এত কম মানুষ সাড়া দেয়ায় তিনি কিছুটা ধাক্কা খেলেন, তারপরও মেনে নিলেন।
কারণ ইবনে জিয়াদের হাতে গোনা কয়েকজন সৈন্যকে মোকাবেলা করার জন্য ৪০০০ মানুষ যথেষ্ট ছিল। এই ৪০০০ সেনাকে নিয়ে মুসলিম ইবনে আকিল অভিযানে বের হলেন এবং তারা ইবনে জিয়াদের প্রাসাদের বাইরে ক্যাম্প স্থাপন করলেন।
ইবনে জিয়াদ তখন নতুন কৌশল প্রয়োগ করলো। সে প্রথমে চিহ্ণিত করলো, কোন কোন গোত্রের লোকেরা মুসলিম ইবনে আকিলকে সাহায্য করছে । এরপর সেইসব গোত্রের প্রধানদের প্রত্যেকের সাথে আলাদা আলাদা ভাবে কথা বলা শুরু করলো। তাদের অভাব- অভিযোগ শুনলো, তাৎক্ষণিকভাবে অনেক সুবিধা প্রদান করল যেন তারা মুসলিম ইবনে আকিলের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে আসে।
যেহেতু সেসময় গোত্র প্রথার প্রচলন প্রচলন ছিল এবং প্রতিটি গোত্রের লোকেরা তাদের নেতাকে নিঃশর্তভাবে অনুসরণ করতো, তাই গোত্রপতিদের নির্দেশে একের পর এক গোত্র মুসলিম ইবনে আকিলের ক্যাম্প থেকে চলে যেতে শুরু করে।
এছাড়া ইবনে জিয়াদ মুসলিম ইবনে আকিলের ক্যাম্পে থাকে সেনাদের পিতা-মাতা ও স্বজনদেরও ব্যবহার করা শুরু করে। সেনাদের পিতা,মাতা, স্বজনকে হুমকি দিয়ে কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের মুসলিম ইবনে আকিলের শিবির থেকে বের করে আনে।
ইবনে জিয়াদের এসব কৌশলের ফলাফলস্বরূপ সেনাসংখ্যা অকল্পনীয় গতিতে কমে যেতে থাকে। ফজরের সময় যখন তিনি ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন তখন সৈন্য সংখ্যা ছিল ৪০০০ আর আসরের ওয়াক্তে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ালো মাত্র ৭০ জনে। দিনশেষে যখন মুসলিম ইবনে আকিল মাগরিবের নামাজে দাঁড়ালেন তখন তার সাথে আছে মাত্র ৩০ জন । নামাজের পর যখন অন্ধকার নেমে এলো তখন রয়ে গেল মাত্র ১০ জন।
এই দৃশ্য দেখে তিনি রাগে- ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। চিৎকার করে বললেন, “ কুফাবাসী তোমরা এমনটা কিভাবে করতে পারলে?”
এরপর তিনি তার সাথে থাকা দশ জনকে নিয়েই তার সমর্থক গোষ্ঠীর এলাকার দিকে যাত্রা শুরু করলেন ।কিন্তু হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো অন্ধকারে মুসলিম ইবনে আকিল যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন তার পেছনের ১০ জনও নীরবে প্রস্থান করলো। তখন তিনি একদমই একা অচেনা শহরে অন্ধকারে হেঁটে চললেন কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতার নীরব সাক্ষী হয়ে।
মুসলিম ইবনে আকিল এর মৃত্যুদন্ড
একাকী ঘুরতে ঘুরতে যখন আর নিজ পায়ে দাঁড়ানোর মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই তখন মুসলিম ইবনে আকিল আল্লাহর উপর ভরসা করে অজানা ,অচেনা একটি ঘরের দরজায় গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন।
ঘরে তখন এক বৃদ্ধা মহিলা ছাড়া আর কেউ ছিল না। তিনি মুসলিম ইবনে আকিলের পরিচয় জানতে পেরে কিছু শুকনো খাবার ও পানি দিলেন এবং রাতে থাকার সম্মতি দিলেন।
পরদিন সকালবেলা মহিলার ছেলে কাজ থেকে ঘরে ফিরে একজন অপরিচিত মানুষ দেখে তার পরিচয় জানতে চাইলো।বৃদ্ধা বাধ্য হয়ে তাকে সব কথা খুলে বললো এবং অনুরোধ করলো যেন সে কাউকে তার ব্যাপারে না জানায় ।
কিন্তু বৃদ্ধার ছেলে ছিল অর্থলোভী। তাই সে দুই -একদিন চুপ থাকলো ঠিকই, কিন্তু এরপর সে মসজিদে গিয়ে সেখানে দায়িত্বপালনরত ইবনে জিয়াদের সৈন্যদের জানিয়ে দিল যে, মুসলিম ইবনে আকিল তাদের ঘরে লুকিয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেনারা তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলল এবং বাড়িটি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিল। তখন মুসলিম ইবনে আকিল বাড়ি থেকে বের হয়ে সেনাদের হাতে ধরা দিলেন।
সেনাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আব্দুর রহমান । গভর্নরের প্রাসাদে যাওয়ার পথে মুসলিম ইবনে আকিল তাকে অনুরোধ করলেন সে যেন হুসেন (রা:) এর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, “মুসলিম ইবনে আকিলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হয়তো তাকে হত্যা করা হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে হুসেন (রা:) যেন কুফায় না আসেন।
যদি ইতিমধ্যে রওনা দিয়েও থাকেন তবে যেন যাত্রা স্থগিত করে মক্কায় ফিরে যান। কারণ কুফার মানুষ তার সাথে বেইমানি করেছে।”
আব্দুর রহমান এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং হুসেন (রা:) এর কাছে মুসলিম ইবনে আকিলের এই বার্তাটি পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।
এরপর মুসলিম ইবনে আকিলকে নিয়ে যাওয়া হয় ইবনে জিয়াদের প্রাসাদের সর্বোচ্চ চূড়ায়। সেদিন ছিল আরাফার দিন অর্থাৎ ৯ জিলহজ্জ্ব। এই পবিত্র দিনে তাকে সমস্ত কুফাবাসীর সামনে সেই উঁচু স্থান থেকে
ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করা হয়।
শাহাদাতের আগে মুসলিম ইবনে আকিল তওবা ও ইস্তেগফার করেছিলেন। মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি বারবার বলেছিলেন, ”হে আল্লাহ!! আপনি আমার ও আমাদের সমর্থক দাবীদার জনগোষ্ঠীর বিচারক হয়ে যান। তারা আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে, তারা আমাদের ত্যাগ করে চলে গেছে।”
হত্যার পর মুসলিম ইবনে আকিলের লাশ শহরের মাঝখানে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তিনি ছাড়া আরও যারা হুসেন (রা:)কে শেষ পর্যন্ত সমর্থন করেছিল, তাদেরকেও খুঁজে বের করে হত্যা করে তাদের লাশ একইভাবে শহরের মোড়ে মোড়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
এসব ঘটনার মাধ্যমে ইবনে জিয়াদ কুফাবাসীকে বার্তা দিয়েছিল যে, ভবিষ্যতে তারা যদি বিরোধিতা করে তাহলে তাদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। এর ফলে কুফা নগরীর মূল কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলেই ইবনে জিয়াদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়।
হুসেন (রা:) এর কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা
এদিকে হুসেন (রা:) ততদিনে কুফার পথে রওনা হয়ে গেছেন। তিনি জানতেন না তার প্রেরিত প্রতিনিধি
মুসলিম ইবনে আকিল এরই মাঝে শহীদ হয়ে গেছেন। কারণ তখনকার বাস্তবতায় কুফা থেকে মক্কা পর্যন্ত দূত মারফত সংবাদ পোঁছাতে দুই থেকে আড়াই সপ্তাহ সময় লেগে যেত।
মুসলিম ইবনে আকিল প্রেরিত ১ম চিঠির প্রেক্ষিতে হুসেন (রা:) যখন কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার ঘোষণা দেন, তখন যে কয়জন বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবী জীবিত ছিলেন তারা সবাই হুসেন (রা:) এর সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করলেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ও জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ–সবাই হুসেন (রা:)কে তার এই
সিদ্ধান্তের বিপরীতে পরামর্শ দেন । কিন্তু হুসেন (রা:) নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। কারণ তার হাতে ছিল কুফা’র মানুষের অগণিত চিঠি এবং আনুগত্যের আশ্বাস সংক্রান্ত বার্তা। এগুলো দেখিয়ে তিনি সাহাবীদের কাছে নিজের অবস্থানকে যৌক্তিক হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।
মূলত ইখলাস এবং ইসলামের প্রতি আন্তরিকতা থেকে তিনি কুফার উদ্দেশ্যে তার যাত্রার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি বলেন, ”আমি যেখানেই থাকি সেখানেই রক্তপাত হবে। কারণ ওরা সেখানে চলে আসবে ।তার চেয়ে বরং আমি দুই পবিত্র নগরীর (মক্কা ও মদিনা) বাইরে গিয়ে সেই ঝুঁকিকে মোকাবেলা করতে চাই। আমি মক্কা ও মদিনায় রক্তপাত করার চেয়ে অন্য যে কোনো জায়গায় গিয়ে শহীদ হতেই বেশি পছন্দ করবো।”
শেষ পর্যন্ত হুসেন (রা:) এর কাফেলা যখন মক্কা ত্যাগ করে তখন তার সঙ্গী ছিল ১০০র কিছু বেশি, যার মধ্যে নারী এবং শিশুরাও অর্ন্তভূক্ত ছিল।
কুফার সন্নিকটে হুসেন (রা:) এর কাফেলার যাত্রা স্থগিত
হুসেন (রা:) এর কাফেলা যখন কুফার একেবারে সন্নিকটে পৌঁছে গেল ঠিক সেই সময় আব্দুর রহমান এর
বার্তাবাহকও সেখানে পৌঁছায়। তার মাধ্যমে হুসেন (রা:) জানতে পারেন কুফার বর্তমান পরিস্থিতি। এই অবস্থায় তিনি যাত্রা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন।
সেই সাথে তিনি কুফার প্রকৃত অবস্থা কাফেলায় থাকা লোকদের অবহিত করে ঘোষণা দেন যে, যারা কুফায় যেতে আগ্রহী নন তারা ফিরে যেতে পারেন।
এই ঘোষণা শুনে তার পরিবারের সদস্য ছাড়া বাকীদের মধ্যে কেউ কেউ চলে গেল । এরপর তার সাথে সব মিলিয়ে ৭০ জনের মতো মানুষ ছিল।
এদিকে ইবনে জিয়াদ যখন জানতে পারল যে, হুসেন (রা:) কুফার কাছাকাছি চলে এসেছেন তখন সে ইয়াজিদের কাছে বাড়তি সৈন্য চেয়ে বার্তা পাঠালো। সেসময় ইয়াজিদের আ্ওতাধীন ৪ হাজার সেনা বর্তমান তুরস্কের সীমানায় দালামান নামক অঞ্চলে সেখানকার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবেলা করার জন্য রওনা হয়েছিল্ ।
ইবনে জিয়াদ এর বার্তা পেয়ে ইয়াজিদ এই সেনাদের দালামান থেকে কুফা যাওয়ার নির্দেশ দিল।
এই সেনাদল কুফার সন্নিকটে কারবালা নামক স্থানে হুসেন (রা:) এর কাফেলার মুখোমুখি হলো।
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা
হিজরি ৬১ সালের ৩ মহররম ইবনে জিয়াদের বিশাল সেনাবাহিনী হুসেন (রা:) এর ক্ষুদ্র কাফেলার মুখোমুখি হয় কারবালা প্রান্তরে। এই সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন উমর ইবনে সাদ। তার নির্দেশে সেনাবাহিনী হুসেন (রা:) এর কাফেলা ঘেরাও করে ফেলল। ফলে তারা আর সম্মুখে অগ্রসর হতে পারলো না।
এরপর উমর ইবনে সাদ একজন বার্তাবাহক পাঠিয়ে হুসেন (রা:) এর কাছে জানতে চাইলেন , তিনি কি উদ্দেশ্যে কুফায় যেতে চাচ্ছেন?
হুসেন (রা:) বার্তাবাহককে জানালেন যে, তিনি কুফাবাসীর আমন্ত্রণে সেখানে যাওয়ার জন্য এসেছেন। যদি তারা তাদের আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেয় বা তাকে সাহায্য করতে আগ্রহী না হয় তাহলে মক্কায় ফিরে যাবেন। তিনি এ ব্যাপারে কুফাবাসীর মতামত জানানোর জন্য অনুরোধ করেন।
হুসেন (রা:) এর এই মনোভাব উমর ইবনে সাদ বার্তাবাহকের মাধ্যমে ইবনে জিয়াদকে জানালো। জবাবে
ইবনে জিয়াদ জানালো, হুসেন (রা:) যেন তার কাছে গিয়ে বাইয়াত গ্রহণ করে ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার করে।
ইবনে জিয়াদ এর এই প্রস্তাব ছিল তার দম্ভ ও অহংকার এর প্রকাশ। যেখানে মুয়াবিয়া (রা:) এবং ইয়াজিদ নিজেও কোনোদিন সরাসরি এ ধরনের হুকুম করার সাহস পায়নি, সেখানে সে রাসূল (সা:) এর প্রিয়তম নাতিকে এ ধরনের বার্তা পাঠিয়ে চরম ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল।
স্বাভাবিকভাবেই হুসেন (রা:) ইবনে জিয়াদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং সেনাপতি উমরকে ডেকে তিনটি প্রস্তাব দিলেন। সেগুলো হলো-
১. আমাকে মক্কায় ফিরে যেতে দেয়া হোক।
অথবা
২. আমাকে ইয়াজিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হোক। আমি সরাসরি তার সাথে বোঝাপড়া করতে চাই।
অথবা
৩. আমাকে একাকী দূরবর্তী কোনো স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হোক।
ইবনে জিয়াদ এই তিনটি প্রস্তাবের কোনটিই গ্রহণ করল না। বরং সে বললো, হয় হুসেন (রা:)কে যুদ্ধ করতে হবে নতুবা বাইয়াত নিতে হবে।
এরপরই ইবনে জিয়াদ শিমার নামক একজন নৃশংস ব্যক্তিকে কারবালার প্রান্তরে প্রেরণ করে। শিমার যেদিন কারবালার প্রান্তরে পেঁৗছায় সেদিন ছিল ৯ মহররম। অর্থ্যাৎ হুসেন (রা:) এর কাফেলা কারবালা যাওয়ার পর ৫-৬ দিন বার্তা আদান-প্রদান হয়। একেকবার বার্তা আসতে প্রায় অর্ধেক দিন চলে যেত।
এখানে উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন ঐতিহাসিকের বয়ানে ৪০ দিন অবরোধ বা পানির কষ্টে কাতর হওয়া সংক্রান্ত যে বিবরণ পাওয়া যায় তার অধিকাংশ অতিরঞ্জিত। এসব বর্ণনা মর্মস্পর্শী হলেও এগুলোর সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
প্রকৃতপক্ষে অবরোধটি ছিল ৫-৬ দিনের। তৎকালীন সময়ে কুফা থেকে কারবালার যে দূরত্ব সেই বিবেচনায় ৪০/৪৫ দিন অবরোধ করে রাখা সম্ভবও ছিল না।
কারবালার প্রান্তরে ইতিমধ্যে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পোঁছে গেছে। উমর ইবনে সাদ এর অধীনে যে সৈন্যরা এসেছিল তারা নিজেরাও মানসিকভাবে ইয়াজিদ বা ইবনে জিয়াদের প্রতি আর ভক্তি ধরে রাখতে পারছিল না। এমনকি তাদের একটি ছোট দল হুসেন (রা:) এর পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থানও নিয়েছিল।
এক্ষেত্রে কুফাবাসীর অবস্থান ছিল পুরাই হতাশাজনক । কারবালা ছিল তাদের নাকের ডগায়। সেখানে টানা ৬দিন যাবৎ হুসেন (রা:) তাদেরই ডাকে সাড়া দিয়ে এসে অবরুদ্ধ ও অসহায় অবস্থায় পড়ে আছেন এটা জেনেও তারা কেউ কোনো ধরনের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি।
এভাবে ১০ মহররমের সকালে কারবালার প্রান্তরে মুসলিম ইতিহাসের জঘন্যতম ও ন্যাক্কারজনক যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। একদিকে ৬০ থেকে ৭০ জন নিরীহ মানুষ অন্যদিকে ৩-৪ হাজার সশস্ত্র সেনা।
আক্ষরিক অর্থে যুদ্ধ বলতে যা বোঝায় সেদিন কারবালায় তেমন কোনো যুদ্ধ সংঘটিতে হয়নি।
সেনারা যখন হুসেন (রা:) কে আক্রমণ করার জন্য এগিয়ে এলো তখন কাফেলা’র সদস্যরা তাকে ঘিরে প্রতিরক্ষা বুহ্য তৈরি করার চেষ্টা করলেন। সেনাদের অস্ত্রের আঘাতে একের পর এক পরিবারের সদস্যরা শহীদ হতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল,হুসেন (রা:) ছাড়া সবাই শহীদ হয়ে গেছেন।
কিন্তু সেনাদের মধ্যে কারও এত বড় ধৃষ্টতা ছিল না যে তারা রাসূল (সা:) এর নাতির বিরুদ্ধে তরবারি তুলবে। তাই সবাই তলোয়ার সরিয়ে নিতে শুরু করলো।
এই পরিস্থিতিতে সেই কুখ্যাত শিমার নিজেই তিন- চার জন সেনাকে সাথে নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে হুসেন (রা:)কে আক্রমণ করতে উদ্ধত হলো। আঘাতে আঘাতে যখন হুসেন (রা:) শাহাদত বরণ করলেন।
তখন শিমার হুসেন (রা:) এর মোবারক মাথাটি কেটে ফেলল।
সেদিন কারবালায় একমাত্র যে পুরুষ সদস্য বেঁচে যান তিনি হলেন হুসেন (রা:) এর ছেলে আলী জয়নুল আবেদীন। সেদিন তার প্রচন্ড জ্বর ছিল বলে নারীদের তাঁবুতে তার শুশ্রষা চলছিল। এভাবেই তিনি গণহত্যা থেকে বেঁচে যান আর আল্লাহর রহমতে তার মাধ্যমেই আজও হুসেন (রা:) এর বংশ পরম্পরা পৃথিবীতে টিকে আছে।
কারবালার ঘটনার প্রভাব : ধর্মতত্ত্ব হিসেবে শিয়া মতবাদের আবির্ভাব
কারবালার ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আলাদা ধর্মতত্ত্ব হিসেবে শিয়া মতবাদের আবির্ভাব হয় । এর আগে শিয়া মতবাদ নিছক একটি রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে বিদ্যমান ছিল কিন্তু এ ঘটনার পরপরই তা ধর্মতাত্বিক ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়।
হুসেন (রা:) এর শাহাদতের পরবর্তী চার বছর অর্থাৎ হিজরী ৬৫ সাল পর্যন্ত কুফাবাসী প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগেছিল। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যখন হুসেন (রা:) এর সহযোগিতার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল তখন তারা সহযোগিতা করেনি।
অবশেষে ৬৫ হিজরীর ১০ মহররম তাদের মধ্য থেকে নতুন একটি সম্প্রদায়ের উত্থান হয় যারা নিজেদের ‘তাওয়াবুন’ হিসেবে অভিহিত করতো। তাওয়াবুন অর্থ অনুতপ্ত। তারা হুসেন (রা:) এর হত্যার সাথে যারা যারা সম্পৃক্ত ছিল তাদের প্রত্যেককে খুঁজে খুঁজে হত্যা করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে কুফার হত্যা পর্ব শেষ করে তারা সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কারণ ইবনে জিয়াদ তখন সেখানে অবস্থান করছিল। পথিমধ্যে তারা কারবালাতে শিবির স্থাপন করে। হুসেন (রা:) এর কবর ছিল কারবালাতে। তারা তার কবরের পাশে সারা রাত জেগে কান্না করে শোক প্রকাশ করে শোকের কবিতা পাঠ করে।
এই সম্প্রদায়ের লোকরাই একমাত্র আলী (রা:) এর বংশধরকে ইমাম হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে।
কুফাবাসীর পুনরায় বিশ্বাসঘাতকতা এবং জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের উত্থান
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য কারবালার ঘটনার ৬০ বছর পর কুফাবাসী পুনরায় বিশ্বাসঘাতকতা করে। এবার একই ঘটনার শিকার হন আলী জয়নুল আবেদীনের ছেলে জায়েদ।
১১২২ হিজরী সনের ঘটনা। জায়েদ ছিলেন মদিনায়। এবারও কুফাবাসী তাকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আহ্বান জানায়।
জায়েদ এর সকল বয়স্ক আত্মীয়-স্বজন তাকে কুফায় যেতে নিষেধ করে । কিন্তু জায়েদ হুসেন (রা:) এর মতোই বয়স্ক আত্মীয়দের কথা না শুনে কুফায় গিয়েছিলেন। কারণ তারও মনে হয়েছিল এবার অন্তত কুফাবাসী পূর্বের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা নেবে এবং আগের মতো আচরণ করবে না। কিন্তু এবারও কুফাবাসী তাদের পুরনো চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটালো।
কুফাবাসী চেয়েছিল জায়েদ যেন আবু বকর (রা:) ও উমর (রা:) এর সমালোচনা করে, তাদের সম্বন্ধে কটু মন্তব্য করে। কারণ ততদিনে ধর্মতাত্ত্বিক চেতনার বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই পাল্টে গেছে। তাদের চোখে তখন আবু বকর (রা:) ও উমর (রা:) হলেন ঘৃণিত ব্যক্তি।
কিন্তু জায়েদ তা করতে রাজি হননি। তিনি বললেন, ”এই দুজন মানুষ রাসূল (সা:) এর সহযোগী ছিলেন। আমি কিভাবে তাদের সমালোচনা করবো? আমার পক্ষে এমনটা কখনোই সম্ভব নয়।”
তার এই অবস্থানের কারণে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক শিয়া আন্দোলনের সাথে ধর্মতাত্ত্বিক শিয়া আন্দোলনের সাংঘর্ষিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে । তারা আবু জায়েদকে ফেলে চলে যায় এবং এর পরিণতিতে তাকেও নির্মমভাবে হত্যার শিকার হতে হয় ।
আর এখান থেকেই ’জায়েদি শিয়া’ নামে নতুন আরেক সম্প্রদায়ের উত্থান হয়।
’জায়েদি শিয়া’ সম্প্রদায়ের সাথে বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের ভিন্নতা আছে। জায়েদিরা মূলত ইয়েমেনেই বেশি। অন্যদিকে পাকিস্তান, বাহরাইন, ইরান ও ইরাকে ’ইসনা আশারিয়া’ তথা ১২ ইমামে বিশ্বাসী শিয়াদের প্রভাব বেশি।
’জায়েদি শিয়া’ এবং ‘ইসনা আশারিয়া’ শিয়াদের বিশ্বাস, দর্শন এবং ধর্ম তাত্ত্বিকতায় বিস্তর ফারাক আছে। ’জায়েদি শিয়া’ রা আবু বকর (রা:) ও উমর (রা:)কে সম্মান করে। তারা সাধারণত সাহাবীদের গালিগালাজ করে না, অভিশাপও দেয় না । তাদের ধর্মতাত্বিক তেমন কোনো আলাদা অবস্থান নেই। অন্যদিকে ‘ইসনা আশারিয়া’ শিয়াদের সবকিছুই আলাদা।
ইসনা আশারিয়া শিয়া’দের ১২ ইমামের মতবাদ
আরবী “ইমাম” শব্দের অর্থ নেতা। শিয়ারা তাঁদের খলিফা ও উচ্চপর্যায়ের ধর্মীয় নেতাদের ক্ষেত্রে ইমাম শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।
১২ ইমাম মতবাদে বিশ্বাস করা হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ কর্তৃক ১২ জন ইমামকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে মুসলিম জাহানের নেতৃত্বদানের জন্য। তাঁরা তাঁদের কর্মের দিক থেকে ভুলত্রুটি মুক্ত এবং চারিত্রিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ নিষ্কলুষ। তাঁরা শরিয়তের ভিত্তিতে মানবজাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। ১২ জন ইমাম হলেন –
১। ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)
২। ইমাম হাসান ইবনে আলী (রাঃ)
৩। ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ)
৪। ইমাম জয়নুল আবেদিন (রাঃ)
৫। ইমাম মুহাম্মাদ আল বাকের (রাঃ)
৬। ইমাম জাফর সাদেক (রাঃ)
৭। ইমাম মুসা আল কাজিম (রাঃ)
৮। ইমাম আলী রেজা (রাঃ)
৯। ইমাম মুহাম্মাদ আল তাক্বি (রাঃ)
১০। ইমাম আলী আন নাক্বি (রাঃ)
১১। ইমাম হাসান আল আসকারি (রাঃ)
১২। ইমাম মুহাম্মাদ আল মাহদি (রাঃ)
ইমাম মাহদির ব্যাপারে শিয়াদের বিশ্বাস হলো তিনি ইমাম হাসান আল আসকারির ছেলে। তিনি জন্মগ্রহণ করার পর তাঁকে লুকিয়ে ফেলা হয়। তিনি এখনো জীবিত আছেন ও গুপ্ত অবস্থাতেই আছেন। আখেরী জামানায় যখন সারা পৃথিবী অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম ও ফাসাদে ভরে যাবে ও মুসলিমরা অসহায় অবস্থায় থাকবে তখন ইমাম মাহদি (আঃ) মানবজাতির ত্রাণকর্তা হিসাবে আবির্ভূত হবেন।
১২ ইমাম মতবাদের ব্যাপারে সুন্নীদের মতামত
ইসনা আশারিয়া’ শিয়াদের ১২ ইমাম মতবাদের প্রথম তিনজন ইমাম – হজরত আলী (রাঃ), ইমাম হাসান (রাঃ) ও ইমাম হোসেন (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর অতি নিকটবর্তী সাহাবী। কাজেই তাঁদের ব্যাপারে সুন্নীদের কোনো আপত্তি নেই।
ইমাম জয়নুল আবেদিন (রাঃ), ইমাম মুহাম্মাদ আল বাকের (রাঃ), ইমাম জাফর সাদেক (রাঃ), ইমাম মুসা আল কাজিম (রাঃ), ইমাম আলী রেজা (রাঃ), ইমাম মুহাম্মাদ আল তাক্বি (রাঃ), ইমাম আলী আন নাক্বি (রাঃ) ও ইমাম হাসান আল আসকারি (রাঃ) তাঁরা সবাই ছিলেন খাঁটি সুন্নী আলেম, ধার্মিকতা ও আধ্যাত্মিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁরা নিজেদের কখনো শিয়া বলে পরিচয় দিয়েছেন বা শিয়া নামে কোন দল তৈরি করেছেন বা শিয়া দলে যোগ দিয়েছেন এমন কোনো প্রমাণ নেই। তাঁরা ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর যোগ্য উত্তরসূরি, আদর্শবান ব্যক্তিত্ব। তাঁদেরকেও সুন্নীরা সম্মান ও শ্রদ্ধা করে।
তবে ইমাম মাহদি (আঃ) ইমাম হাসান আল আসকারি (রাঃ) এর ছেলে আর তিনি শত শত বছর ধরে ইরাকের সামারাহ শহরের পার্বত্য অঞ্চলের একটি গুহায় লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছেন এবং সময়মতো বেরিয়ে আসবেন— শিয়াদের এই ধারণায় সুন্নীরা বিশ্বাসী নয়।
কারণ হাদীস অনুসারে ইমাম মাহদি (আঃ) আখেরী জামানায় জনসমক্ষে আবির্ভূত হবেন প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়, কোনো কোনো বর্ণনায় চল্লিশ বছর বয়সে। সেক্ষেত্রে আখেরী জামানায় তাঁর আবির্ভাব ঘটার কয়েক বছর আগে পৃথিবীতে তাঁর আগমন ঘটার কথা।
এছাড়া ইতিহাসগ্রন্থগুলো থেকে জানা যায়, হাসান আল আসকারি (রাঃ) অল্প বয়সেই মারা যান নি:সন্তান হিসেবে। তাই তার ছেলেকে লুকিয়ে রাখার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
সংকলক – হাবিবা মুবাশ্বেরা
