Disclaimer:
মুসলিম উম্মাহ’র এই ক্রান্তিলগ্নে পারিবারিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করার কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটা বিষয় খেয়াল করছি, বিবাহিতা/ সন্তানের মা কোনো ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করলে এবং সেই অর্জনে স্বামীর সহযোগিতা আছে —তা প্রকাশিত হলেই বাকী মেয়েদের মধ্যে একধরনের আফসোস শুরু হয়ে যায়. আহ!! আমার যদি এমন স্বামী থাকতো তবে আমিও অনেক কিছু করে ফেলতাম …….
সত্যিই কি তাই!! বিয়ের পর নিজের জন্য কিছু করতে গেলে স্বামীর সাপোর্ট লাগে—এটা মুদ্রার এক পিঠ মাত্র। মুদ্রার অপর পিঠে রয়েছে আরও অনেক স্ট্র্যাটেজী, যা একজন নারীকেই মেইনটেইন করতে হয়।
আমি সবসময় ব্যালেন্সড লেখা লেখার চেষ্টা করি। এই লেখাটিতে তাই সবধরনের পয়েন্টগুলোকেই তুলে আনার চেষ্টা করেছি। – হাবিবা মুবাশ্বেরা
এই কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, একটা মেয়ে তার বিয়ের পর যদি পড়াশোনা, চাকরি কিংবা দাওয়াতি কাজ– যে কোনো কিছু কন্টিনিউ করতে চায় তবে সেজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সাপোর্টিভ হাসবেন্ড এবং সাপোর্টিভ শ্বশুরবাড়ি । শুধু হাসবেন্ড এবং শ্বশুরবাড়ির সাপোর্ট এর অভাবে অনেক মেধাবী মেয়ের জীবনের সম্ভাবনাগুলো বিয়ের পর আর বিকশিত হতে পারে না।
এই সাপোর্ট যে সবসময় সরাসরি লজিস্টিক সাপোর্ট হতে হবে–এমন কোনো কথা নেই। মানে একটা মেয়ে পড়বে বা চাকরি করবে বলে তার হাসবেন্ড বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার বাচ্চা পেলে দিবে কিংবা তাকে রান্না করে খাওয়াবে —-বিষয়টা সবসময় এমন হওয়া জরুরী না। বরং সবচেয়ে জরুরী হলো তাকে মেন্টালি সাপোর্ট দেয়া।
একটা মেয়ের মেধাকে মূল্যায়ন করা এবং তা কাজে লাগানোর জন্য তাকে উৎসাহিত করা—এটুকুই একটা মেয়েকে মেন্টালি বুস্টআপ করার জন্য টনিকের মতো কাজ করে।
“আমাদের নাতনী তোমার মতো গায়ের রং না পেলেও সমস্যা নাই, মেধাটুকু পেলেই হবে”—–একজন শ্বাশুড়ি যখন হাজার মাইল দূরে বসে এই আশ্বাস দেয় তখন তা একজন ছেলের বউকে কতটুকু আত্মবিশ্বাসী করে তুলে তা সহজেই অনুমেয়।
অন্যদিকে একজন মেধাবী বউয়ের শ্বশুরবাড়িতে যখন পিঠা বা আচার এর মতো অপশনাল খাবার বানাতে না পারার জন্য তাকে আন্ডারএস্টিমেট করা হয় তখন তা তাকে মানসিকভাবে কতটা আঘাত করে তা বোঝাও দু:সাধ্য নয়।
এই যে দুটি বিপরীতধর্মী কথা, যা শ্বশুরবাড়ির লোকদের মেন্টালিটির পরিচয় বহন করে তাই কিন্তু একটি মেয়ের বিয়ের পরবর্তী জীবনে তার ক্যারিয়ার/ পড়াশোনা/ দাওয়াতী কাজ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বিরাট ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে।
অনেক মেয়েই হাসবেন্ড/ শ্বশুরবাড়ির অসহযোগিতা ক্ষেত্রবিশেষে বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যায় আবার অনেকেই তা পারে না, শেষ পর্যন্ত অসহায় আত্মসমপর্ণ করে বাকী জীবন মানসিক কষ্ট নিয়ে কাটিয়ে দেয়।
এই পারা কিংবা না পারার মানসিক শক্তি কিংবা দুর্বলতাটুকু কিন্তু আবার নির্ভর করে একটি মেয়ে তার বিয়ের আগে নিজের পরিবারে কি ধরনের মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে তার উপর।
একটি মেয়ে যদি তার নিজের পরিবারে এই মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠে যে, মেয়ে মানেই তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য একটি ভালো বিয়ে হওয়া এবং শিক্ষাগত ডিগ্রী তার এই ভালো বিয়েতে একটি বাড়তি অনুষঙ্গ মাত্র তবে সেই মেয়ে বিয়ের পর হাসবেন্ড/ শ্বশুরবাড়ি থেকে সামান্য বাধা আসলেও সহজেই হার মেনে নিবে, লড়াই করার কোনো রকম চেষ্টা করবে না।
অন্যদিকে নিজের পরিবারে যদি একটি মেয়েকে “মেয়ে” হিসেবে নয় বরং “মানুষ” হিসেবে ভাবতে শেখানো হয়, তাকে শিক্ষা সহ সবধরনের বেসিক স্কিল ডেভেলপ করতে উৎসাহিত করা হয়, প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়া হয়—এই মানসিকতা থেকে যে, এসব স্কিল তাকে শুধুমাত্র ভালো বউ হতে নয় বরং তাকে
Better human being হতে সাহায্য করবে তবে এই মানসিকতা তাকে একজন আত্মবিশ্বাসী নারীতে পরিণত করে। ফলে বিয়ের পর হাজার রকম বাধা আসলেও সে হার মেনে নেয় না, লড়াই করে যায়।
তবে লড়াইটা যে সবসময় কদর্য লড়াই হবে তা কিন্তু নয়।
পৃথিবীতে যে কোনো কিছু আদায় করার দুইটা উপায় আছে।
একটা শোভন আরেকটা অশোভন উপায়।
অশোভন উপায়টা হচ্ছে সরাসরি কদর্য লড়াই করা আর শোভন উপায়টা হচ্ছে কৌশলে কাজ আদায় করা।
একটা মেয়ে যদি বিয়ের পরও নিজের পড়াশোনা, চাকরি কিংবা দাওয়াতি কাজ– যে কোনো কিছু কন্টিনিউ করতে চায় তবে তাকে শোভন উপায়ে, কৌশলে তা আদায় করতে হবে। এবার এমন কিছু কৌশল নিয়ে আলাপ করবো।
প্রথমত: নিজের ডিগ্রী/ ক্যারিয়ার কোনো কিছু নিয়েই হাসবেন্ড/ শ্বশুরবাড়ির কাছে এক্সট্রা ভাব নেয়া যাবে না। অর্থ্যাৎ শিক্ষাগত/ পেশাগত জীবনে আপনি যতই সফল হোন না কেন সেটার জন্য নিজের ঘরের মানুষদের কাছেও দাম পাওয়ার আকাঙ্খা বাদ দিতে হবে। ফলে যেটা হবে তারা আপনাকে অহংকারী ভাববে না।
অনেক পরিবারেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিয়ের পর পড়াশোনা/ চাকরি করতে দেয় না—এই ভয়ে যে তাহলে ঘরের বউ বেয়াদব হয়ে যাবে, কথা শুনবে না …। এ ক্ষেত্রে বউকেই এই ভয়টা যে অমূলক তা প্রমাণ করতে হবে। আপনি বাইরের জগতে যত বড় কেউকেটাই হন না কেন নিজের সংসারে সেটা প্রকাশ না করা—- রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট এর একটা বেসিক ট্রিকস। এই কৌশল ফলো করলে আপনি শ্বশুরবাড়িতে জনপ্রিয় হতে পারবেন, যা আপনাকে আপনার নিজের কাজ উদ্ধারে সাহায্য করবে। তবে তাই বলে নিজের আত্মসম্মান বিকিয়ে দেয়া যাবে না।
আত্মসম্মান আর অহংকার –এই দুইয়ের মাঝে একটা Thin line আছে। আবার বিনয় আর নিজেকে বিলিয়ে দেয়া– এই দুইয়ের মাঝেও একটা Thin line আছে। এই দুই লাইনের মাঝখানে থাকতে হবে। আত্মসম্মান বজায় রেখে বিনয়ী হতে হবে।
দ্বিতীয়ত: পারিবারিক জীবন আর কর্মজীবনের মধ্যে প্রায়োরিটি মেইনটেইন করে চলতে হবে। এই বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধরেন, আপনাকে রান্না করতে হবে আবার পড়তে বসতেও হবে কিংবা একটা পারিবারিক দাওয়াত এটেন্ড করতে হবে আবার একটা দাওয়াহমূলক ওয়েবিনারও নিতে হবে। সেক্ষেত্রে আপনি যদি রান্না করে টেবিলে সাজিয়ে রেখে পড়তে বসেন কিংবা দাওয়াত থেকে early leave নিয়ে ওয়েবিনার এটেন্ড করেন তাহলে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের ডিপ্রাইভড ফিল করবে না বরং প্রিভিলেজড ফিল করবে এবং আপনার কাজে বাধা দিবে না।
তৃতীয়ত: মাঝে মাঝেই পরিবারের সদস্যদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে, সেটা যে প্রকাশ্যেই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। প্রকাশ্যে করলে বরং বদনজর লাগার সম্ভাবনা থাকে, তাই পারিবারিক গেট টুগেদার বা একান্ত সময়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন।
মনে রাখতে হবে, যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে স্রষ্টার প্রতিও কৃতজ্ঞ হতে পারে না। তাছাড়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অপরপক্ষকে তার সহোযোগিতা কন্টিনিউ করার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করে।
চতুর্থত: বিভিন্ন উপলক্ষে পরিবারের সদস্যদের উপহার দিতে হবে এবং সম্ভব হলে পারিবারিক খরচের যে কোনো একটি বা দুইটি খাতে নিয়মিত কন্ট্রিবিউট করার চেষ্টা করতে হবে। যে কোনো স্যাক্রিফাইস বা ত্যাগের বিনিময়ে মানুষ বস্তুগত লাভ প্রত্যাশা করে—এটা মানুষের একটা বেসিক ফিতরাত। এটাকে নেগেটিভলি নেয়ার কিছু নেই। কেউ যখন অন্যের এচিভমেন্টে নিজেও বেনিফিটেড হয়, তখন সে সেটাতে হেল্প করতে আগ্রহী হয়।
পঞ্চমত: প্রয়োজনীয় অনুযায়ী পড়াশোনা/চাকরীতে ব্রেক নিতে হবে। মেয়েদের একটা দুর্বলতা হলো তাদের ক্যারিয়ার এবং বিয়ে, সন্তানধারণের সবচেয়ে প্রোডাক্টিভ টাইম একই সময়ে। তাই অনেক সময় যে কোনো একটিকে সিচুয়েশন অনুযায়ী বেছে নিতে হয় এবং আরেকটিকে বিরতি দিতে হয়। তবে এই Pause যেন Full stop না হয়ে যায়, সেই ব্যাপারে একটা মেয়েকেই mentally strong থাকতে হবে।
হয়তো এই সাময়িক বিরতির ফলে সে অন্যদের তুলনায় পড়াশোনা/ ক্যারিয়ারে পিছিয়ে পড়বে, নতুন করে সবকিছু শুরু করার পর তাকে কর্মক্ষেত্রে জুনিয়র পোস্টে, জুনিয়র কলিগদের সাথে কাজ করার
মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে তবে একেবারেই থেমে যাওয়ার চেয়ে এটা অনেক বেটার।
ষষ্ঠত: সন্তানদের সহযোগিতা নিতে হবে। বিয়ের পরেও মেয়েদের যে কোনো ধরনের প্রোডাক্টিভ কাজে ইনভলভ থাকার ক্ষেত্রে সন্তানদের পজিটিভ মাইন্ডসেট খুব গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে বোঝাতে হবে যে, মাতৃত্বের দায়িত্বের বাইরেও মানুষ হিসেবে একজন মায়ের নিজস্ব কিছু দায়িত্ব রয়েছে সমাজের প্রতি, উম্মাহ’র প্রতি। তাই তাকে তার নিজের কাজ করার জন্য টাইম এবং সুযোগ দিতে হবে। এভাবে সন্তান যদি মা’কে প্রোডাক্টিভ কাজে ইনভলভ দেখে বড় হয়, তবে সে নিজেও একসময় মা’কে সম্মান করবে, নিজের জীবনেও প্রোডাক্টিভ হবার অনুপ্রেরণা পাবে। যে সন্তান মা’কে সারাদিন রান্নাঘরে কাজ করতে আর অবসরে গসিপ করতে দেখে বড় হয় সে সন্তান নিজেও পরবর্তীতে আনপ্রোডাক্টিভ হয়–এটা আমার নিজের চোখে দেখা।
অন্যদিকে আমাদের নিজের মা বিয়ের পর সন্তানদের নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন, চাকরি করেছেন। তাই আমরা দুই বোন সংসার, সন্তান সামলেও সবসময় প্রোডাক্টিভ কিছু না কিছু করার জন্য মুখিয়ে থাকি, যেভাবেই হোক সময় বের করি। আমাদের দুই বোনের তিনটা মেয়ে আলহামদুলিল্লাহ। ওরাও এখন থেকেই মায়েদের কাজের ব্যাপারে যথেষ্ট হেল্পফুল এবং নিজেরাও প্রোডাক্টিভ আলহামদুলিল্লাহ।
সবশেষে বলতে চাই, নি:সন্দেহে একটা মেয়ের জন্য স্ত্রী, মা, ছেলের বউ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর নিজের জন্য যে কোনো কিছু করা (পড়াশোনা/ চাকরি বা দাওয়াতি কাজ) অত্যন্ত স্ট্রেসফুল। তবে তারপরও কিছু করার জন্য অন্যদের সাপোর্ট এর পাশাপাশি নিজের দৃঢ় ইচ্ছা থাকতে হবে এবং নিজেকে কিছু স্ট্র্যাটেজি মেইনটেইন করতে হবে।
