
এই সিরিজটি ড.ইয়াসির ক্বাদী’র “Parables of Quran” শীর্ষক লেকচার সিরিজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভাবানুবাদ করা হয়েছে।
পর্ব- ১
মহান আল্লাহতাআলা পবিত্র কুরআনে অসংখ্য উপমা ব্যবহার করেছেন। এই সিরিজে আমরা এরকম কয়েকটি উপমা নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
“যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে। প্রত্যেক শীষে একশ শস্য দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সূরা বাকারাহ : ২৬১)
এই আয়াতে ’সাদাকাহ’কে একটি ’বীজে’র সাথে তুলনা করা হয়েছে। আমরা যদি এই উপমাকে বিশ্লেষণ করি তবে এর পেছনে বেশ কিছু হিকমাহ দেখতে পাবো। যেমন –
বীজ থেকে যে শস্য উৎপাদিত হয় তা যেমন অন্য প্রাণীকুলের খাদ্যের সংস্থান করে তেমনই সাদাকাহর দ্বারাও সমাজের অন্য ব্যক্তি, গোষ্ঠী উপকৃত হয়। সালাত, হজ্ব, জিকির– এই ইবাদতগুলো ব্যক্তির নিজস্ব আমলনামাকে সমৃদ্ধ করে কিন্তু সাদাকাহ ব্যক্তির আমলনামায় যেমন নেকি সংযোজন করে তেমনই এর দ্বারা সমাজের অন্য ব্যক্তিরাও উপকৃত হয়। তাই সাদাকাহ হল একটি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট মানের পরহিতব্রতী ইবাদত।
যে কোন শস্যের বীজ বপন করলে যেমন তা থেকে সাথে সাথে শস্য পাওয়া যায় না, ধৈর্য্য এর সাথে পরিচর্যা করতে হয় তেমনি সাদাকাহর সুফলও অনেক সময় সাথে সাথে দৃশ্যমান হয় না । আর্থিক সাদাকাহ করলে যে সেটার প্রতিদান একইভাবে পাওয়া যাবে তা নয় বরং তার বিনিময়ে অনেক সময় আসন্ন বিপদ কেটে যায় বা আটকে থাকা রিজিক সহজলভ্য হয়ে যায়। অর্থাৎ সাদাকাহ’র সুফল উপলব্ধি করার জন্যও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়।
একটি বীজ থেকে উৎপাদিত একটি শস্যের দানা থেকে যেমন পরাগায়নের মাধ্যমে অসংখ্য শস্যের বংশবৃদ্ধি ঘটে, তেমনি সাদাকাহ’র সুফলও multiply হয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি একজন এতিম দরিদ্র শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব নিয়ে সেই উদ্দেশ্যে
সাদাকাহ করে, তবে সেই শিশুটি যখন বড় হয়ে শিক্ষিত হয়ে তার অবস্থার পরিবর্তন করে
তখন তার দ্বারা তার পরিবার ও সমাজও উপকৃত হয়। অর্থাৎ একজন শিশুর শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগের ফলাফল বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়ে বহু মানুষকে উপকৃত করে। এটা সাদাকাহ’র একটি চমৎকার দিক।
বীজ থেকে উৎপাদিত শস্যের গুণগত মান যেমন বীজ পরিচর্যাকারীর যত্নের কোয়ালিটির ওপর নির্ভর করে তেমনি সাদাকাহর সুফল কতগুণ বৃদ্ধি পাবে তা সাদাকাহ প্রদানকারীর ইখলাসের ওপরও বহুলাংশে নির্ভর করে।
শস্য উৎপাদনের জন্য সঠিক মাটি নির্বাচন, পরিমিত সার, পানি, কীটনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত করলে যেমন ভাল শস্য পাওয়া যায় তেমনি কেউ যদি সঠিক নিয়তে সাদাকাহ করে তবে তার সাদাকাহর পরিমাণগত মান কম হলেও মহান আল্লাহর কাছে সেই সাদাকাহর গুণগত মান অনেক বেশি হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, যার কাছে ১০ হাজার টাকা আছে সে যদি ১০০ টাকা সাদাকাহ করে আর যার কাছে ১হাজার টাকা আছে সেও যদি ১০০ টাকা সাদাকাহ করে তবে উভয়ের সাদাকাহর পরিমাণ সমান হলেও একজনের হৃদয়ের উদারতা অন্যজনের চেয়ে নিঃসন্দেহে বেশি। তাই তার নেকির পরিমাণও মহান আল্লাহর ইচ্ছায় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে ইনশাআল্লাহ।
সবশেষে বলা যায়, সাদাকাহ এমন একটি ইবাদত, যা আপাতদৃষ্টিতে ’সম্পদ বিয়োগ’ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা একটি প্রবৃদ্ধিমূলক ইবাদত; যা মহান আল্লাহর ইচ্ছায় ইহকাল ও পরকালে বহুগুণে বহুরূপে ফিরে আসে।
মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক নিয়তে, সৎ উদ্দেশ্যে, সামর্থ্য অনুযায়ী সাদাকাহ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
পর্ব- ২
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাত বরবাদ করো না সে ব্যক্তির মতো যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, এ ব্যাক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মত যার উপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতঃপর এর উপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, অনন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। তারা ঐ বস্তুর কোন সওয়াব পায় না, যা তারা উপার্জন করেছে। আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরা বাকারা : ২৬৪)
এই আয়াতটি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, যারা সাদাকাহ করে তা প্রকাশ্যে বলে বেড়ায় এবং সাদাকাহ গ্রহীতার সাথে এমন আচরণ করে যা তার মনো:কষ্টের কারণ হয় তাদের সাদাকাহ কবুল হয় না। আমাদের অনেকের মধ্যে এই স্বভাবটি খুব Common. বিশেষ করে সাদাকাহ গ্রহণকারী ব্যক্তি যদি আমাদের আত্মীয় বা পরিচিত কেউ হয় তবে তাকে দান করার পর তা অন্য আত্মীয় বা পরিচিতদের বলে বেড়ানো এবং উক্ত ব্যক্তির Lifestyle judge করে তাকে খোঁটা দেওয়ার প্রবণতা আমাদের অনেকের মাঝে বিদ্যমান। অথচ এর ফলে যে আমাদের সাদাকাহ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায় তা আমরা নিজেরাই জানি না।
উপরোক্ত আয়াতে এ ধরনের ব্যক্তির উদাহরণ বোঝাতে কাফের বা অবিশ্বাসীদের উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। যারা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান রাখে না অর্থাৎ যারা কাফের তারা যখন দান করে তখন তাদের দানের উদ্দেশ্য পুরোটাই থাকে দুনিয়াবি। তারা সমাজের মানুষের চোখে দানশীল হিসেবে প্রশংসা পাওয়ার জন্য তাদের সম্পদ দান করে কিন্তু মহান আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয় না।
আমরা অনেক কাফির নায়ক, গায়ক, খেলোয়াড় বা অন্যান্য সেলিব্রেটিকে দেখি তাদের সম্পদের অংশ থেকে দান করতে বা Charity purpose এ কনসার্ট বা প্রোগ্রাম আয়োজন করতে। তাদের এই দানকৃত সম্পদ তাদের ফ্যান/ ফলোয়ারদের মাঝে তাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে এবং তাদেরকে মানসিক আত্মতৃপ্তি দেয় ঠিকই কিন্তু আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয় না।
কাফের বা অবিশ্বাসীদের হৃদয় যেন সেই পাথরের মতো যার ওপর আলগা মাটির ক্ষণস্থায়ী প্রলেপ পড়ে তাকে বাহ্যিকভাবে মাটি সদৃশ্য করে তোলে ঠিকই কিন্তু যখন বৃষ্টির পানি পড়ে সেই প্রলেপ ধুয়ে যায় তখন তার ভেতরের নিরেট পাথর দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। অর্থাৎ কাফেরদের অন্তর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস না আনার ব্যাপারে পাথর সদৃশ্য দৃঢ়,অনঢ় কিন্তু সাময়িকভাবে সেই দৃঢ় হৃদয়ে মানবিকতার আবরণ পড়ে তারা অন্য মানুষের জন্য দান সাদাকাহ করে। তবে যেহেতু তাদের সেই দানে আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো বিষয় থাকে না তাই তাদের সেই দান তাদের পরকালের কোনো কাজে আসে না।
এখন এই অবিশ্বাসী, কাফেরদের দানের মতোই মুসলিমদের দানও সম্পূর্ণ নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে দান করার পর তা ”বলে বেড়ানো” এবং ”দান গ্রহণকারীকে খোঁটা দেওয়া’র কারণে। ব্যাপারটি রীতিমতো ভয়ংকর তাই না!!!
কেন আল্লাহতাআলা এরকম একটি ভয়াবহ শাস্তির কথা বললেন?
কারণ আসমান ও জমিনে যা কিছু সম্পদ আছে তার প্রকৃত এবং একমাত্র মালিক স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। তিনি তাঁর এই সম্পদ থেকে কিছু অংশ কিছু মানুষকে ’দিয়ে’ পরীক্ষা করেন এবং কিছু মানুষকে না দিয়ে’ পরীক্ষা করেন । যাদের সম্পদ আছে এবং যাদের সম্পদ নেই তাদের মাঝে যোগসূত্র স্থাপনের কাজটিও তাঁরই ইশারাতে ঘটে থাকে।
তাই যার সম্পদ আছে সে যখন তা থেকে কিছু অংশ, যার সম্পদ নেই তাকে দান করে তখন সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সম্পদকেই হস্তান্তর করে মাত্র। এখানে তার নিজস্ব কোনো ক্রেডিট নেই। কিন্তু সে যখন এই সম্পদ হস্তান্তরকে নিজের উদারতা বলে প্রচার করে এবং দান গ্রহীতার চেয়ে নিজেকে Superior মনে করে তাকে কথা, ব্যবহারের মাধ্যমে কষ্ট দেয় তখন সে আদতে নিজেকেই তার সম্পদের একচ্ছত্র মালিক মনে করে যা– “আল্লাহ সকল সম্পদের মালিক” এই বিশ্বাসের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
আর এ কারণেই তখন সে সেইসব কাফেরদের মতো হয়ে যায়, যারা নিজস্ব আত্মতৃপ্তি লাভ এবং জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায় দান করে। অর্থাৎ বিশ্বাসে মুসলিম হয়েও চিন্তা-ভাবনা এবং মানসিকতার ভ্রান্তির কারণে তাদের দান সাদাকাহ কাফিরদের মতো মূল্যহীন হয়ে যায়।
কাফিরদের দান-সাদাকাহর ফলাফল তা ‘দেয়ার সময়ই শূণ্য থাকে’ আর বিশ্বাসীদের দান-সাদাকাহর ফলাফল ’দেয়ার পর শূন্য’ হয়ে যেতে পারে নিজেদের ভুল আচরণ এর কারণে।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের এই ধরনের দানশীল হওয়া থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
পর্ব- ৩
”যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছে, ক্রয়-বিক্রয়ও তো সুদ নেয়ারই মতো! অথচ আল্লা’হ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে।” (সুরা বাকারা : ২৭৫)
এই আয়াত বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই যারা সুদ খায় তারা কেয়ামতের দিন তাদের ন্যায় উত্থিত হবে যারা শয়তান দ্বারা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত। অর্থ্যাত এই দিন তারা বিভ্রান্ত অবস্থায় থাকবে, তাদের শরীরের অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তাদের উদ্ভ্রান্ত অবস্থা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাবে যে, তারা দুনিয়ায় সুদের সাথে জড়িত ছিল।
পার্থিব জীবনে শয়তান সবসময় চেষ্টা করে মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে, তার চিন্তা-চেতনাকে কলুষিত করতে, তার কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে। যারা শয়তানের এই ফাঁদে পা দেয় তাদের কাছে শয়তান হারাম জিনিসকে সুন্দর সুশোভিত করে পজিটিভ ভাবে উপস্থাপন করে। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হচ্ছে ’সুদ’।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় ’সুদ’ মানে সম্পদ বৃদ্ধি । কেউ কাউকে যত টাকা ঋণ দিল তার চেয়ে বেশি পরিমাণ ফেরত পেল, তার সম্পদ বাড়লো। অনেকে আবার ব্যবসার ক্ষেত্রে মুনাফার সাথে সুদকে মিলিয়ে ফেলে ’সুদ’কে জাস্টিফাই করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ কুরআনে এই আয়াতে সুস্পষ্ট ভাবে সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন।
আর মানুষ যখন হারামের সাথে জড়িত থাকে তখন সে কোনভাবেই শান্তি পায় না। পরকালে তো নয়ই, ইহকালেও নয়। বাহ্যিকভাবে মনে হয় সুদ গ্রহণ, লেনদেনের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা অনেক বিলাসী, সম্মানিত জীবন যাপন করছে, তাদের এই Luxurious lifestyle দেখে অনেকেই ঈর্ষান্বিত হয়। কিন্তু দিনশেষে একান্ত নিভৃত সময়ে তারা এক ধরনের হাহাকার, অস্বস্তি অনুভব করে। সবকিছু থাকার পরও কিছু একটা না থাকার অনুভূতি তাদের পাগল করে দেয়। এই অভাববোধটা যে ’সুকুন’ বা শান্তির অভাব তা তারা বুঝতে পারে না।দিনের পর দিন সুদের মতো হারামের সাথে জড়িত থাকায় তাদের অন্তর থেকে সুকুন চলে যায়।
অনেকে আবার জীবনে প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তির হিসাব মিলাতে পারে না। এক দিক থেকে এক ধাপ উপরে ওঠে তো আরেক দিকে দুই ধাপ পিছিয়ে যায়। ব্যবসায় একটা নতুন শোরুম উদ্বোধন করে তো আরেক দিকে সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে ঘরে অশান্তি করে, একটা নতুন গাড়ি কিনে তো আরেকদিকে পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে যায়। আসলে যে সুদের কারণে জীবন থেকে বরকত চলে গেছে তা তারা বুঝতেও পারেনা।
এভাবে সুদের সাথে সম্পৃক্ত জীবনকে শয়তান বাহ্যিকভাবে মোহনীয় রূপে উপস্থাপন করলেও প্রকৃতপক্ষে এই জীবন অন্ত:সারশূন্য, বিষাদময়। সুদযুক্ত জীবনে ইহকালে তো শান্তি নেইই, পরকালেও নিশ্চিত জাহান্নাম।
মহান আল্লাহ আমাদের সুদের লোভনীয় ফাঁদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার তৌফিক দান করুন। আমীন।
পর্ব- ৪
”আর যে মৃত ছিল অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন একটি আলো দিয়েছি, যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে। সে কি ঐ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে সেখান থেকে বের হতে পারছে না? এমনিভাবে কাফেরদের দৃষ্টিতে তাদের কাজকর্মকে সুশোভিত করে দেয়া হয়েছে।” (সূরা আনআম : ১২২)
পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল হামযা (রা) এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। হামযা (রা) ছিলেন রাসূল (সা:) এর আপন চাচা এবং বনু হাশেম গোত্রের একজন নেত্রীস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি তবে রাসূল (সা:) এর প্রতি ছিল তার অগাধ স্নেহ।
একবার তিনি শিকার করার জন্য মক্কার বাইরে গিয়েছিলেন, এমতাবস্থায় বনু মাখযুম গোত্রের কাফের নেতা আবু জাহেল রাসূল (সা:) কে জঘন্যভাবে অপমান করেন। শিকার থেকে ফেরার সাথে সাথে জনৈক দাস কর্তৃক এই ঘটনা জানতে পারে তিনি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে শিকারের তীর-ধনুক নিয়েই আবু জাহেলকে খুঁজতে বের হন। আবু জাহেলকে সামনে পাওয়া মাত্র তিনি তার হাতে থাকা ধনুক দিয়ে আবু জাহেলকে সজোরে আঘাত করে মারাত্মকভাবে জখম করেন।
আবু জাহেল তখন নিজের অপকর্মের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য বলে, ”তুমি কি জানো না মুহাম্মদ আমাদের দেব-দেবীদের সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে বেড়ায়?”
হামযা (রা) প্রত্যুত্তরে বলেন, ”মুহাম্মদ ভুল কিছু তো বলে নাই, তোমরা নিজেরা পাথরের মূর্তি তৈরি করে সেই নিষ্প্রাণ মূর্তিকেই আবার পূজা করো এটাতো নির্বুদ্ধিতাই। আজ থেকে আমিও মুহাম্মদের পক্ষে এবং আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।”
এরপর তিনি রাসূল (সা:) এর সাথে সাক্ষাৎ করে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেন । এভাবে অনেকটা ঝোঁকের বসেই হামযা (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর মতো একজন বীর যোদ্ধার ইসলাম গ্রহণের ফলে ঐ সময় ইসলাম অনেকটাই শক্তিশালী হয়।
আলোচ্য আয়াতে হামযা (রা:) কে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি মৃত ছিল যাকে আমরা পরে জীবিত করেছি” অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত হামযা (রা:) এর অন্তরে সত্যিকারের ঈমান ছিল না ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি শারীরিকভাবে জীবন্ত থাকলেও Spirituality dead ছিলেন। ঈমান আনার পর তিনি যেন পুনর্জন্ম লাভ করলেন।
”যাকে মানুষের মধ্যে চলার জন্য আলোক দিয়েছি”। অর্থাৎ ঈমান হচ্ছে সেই আলো যা একজন মুমিনকে তার জীবনের গন্তব্য চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
একজন মুমিনের সত্যিকারের গন্তব্য হচ্ছে জান্নাত এবং এই জান্নাত লাভের উদ্দেশ্যে মুমিন যখন তার জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত করে তখন তার জীবন হয় lively, active, প্রানোচ্ছল। পক্ষান্তরে যার অন্তরে ঈমানের আলো নেই সে উদ্দেশ্যহীন এর মতো অন্ধকারে পথ হাতরে বেড়ায়।
সে জানেনা তার জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি? কেনই বা সে ছক বাঁধা রুটিনে দৈনন্দিন জীবনযাপন করছে। একঘেয়ে জীবনের ক্লান্তি একসময় তাকে গ্রাস করে ফেলে, শারীরিকভাবে চলনক্ষম থাকলেও তার অন্তর হয়ে যায় নিষ্প্রাণ, নির্জীব।
আমরা যদি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করি তবে দেখব সমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে যাচ্ছে । কারণ মানুষ তার জীবনের আসল উদ্দেশ্যকে চিহ্নিত করতে পারছে না, কেউ পার্থিব সকল সুযোগ-সুবিধা পেয়েও আত্মিক শান্তি পাচ্ছে না,আবার কেউ জীবনের সামান্য স্ট্রাগেল, স্ট্রেস ফেস করতে না পেরে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। ফলে শরীর সচল, কর্মক্ষম থাকলেও আত্মিক মৃত্যু তাদেরকে শারীরিক মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে। তারা নিজের শরীরকে নিজেরাই হত্যা করছে।
এর মূল কারণ তারা উপলব্ধি করতে পারে না যে, চিরস্থায়ী শান্তি লাভ করা যাবে জান্নাতে গেলে এবং পার্থিব জীবনের প্রতিটি সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা, সংগ্রাম ,পরীক্ষা সেখানে যাওয়ার পথে এক একটি Hardle মাত্র। যারা এই Hardle গুলোকে অতিক্রম করে জান্নাতে যাওয়ার চেষ্টায় Involve থাকবে তারা কখনোই মৃতপ্রায়, নিষ্প্রাণ হয়ে পড়বে না।
মহান আল্লাহ আমাদের জীবন্মৃত মুসলিম হওয়া থেকে রক্ষা করুন। আমীন
পর্ব- ৫
“আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।” (সূরা আল-ইমরান : ১০৩)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহর রজ্জুকে একটি উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রসিদ্ধ তাফসীরকারদের মতে, আল্লাহর রজ্জু বলতে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে।
’রজ্জু’ অর্থ রশি বা দড়ি। কেন কুরআনকে রশির সাথে তুলনা করা হয়েছে তার বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা হতে পারে।
প্রথমত: রশি হচ্ছে এমন একটি বস্তু যা মানুষকে বিভিন্ন রকম বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে। কেউ যদি গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত হয় তবে তাকে টেনে তোলার জন্য রশি ব্যবহৃত হয়। আবার কেউ যদি খাদের কিনারে চলে যায় যেখান থেকে পতন অনিবার্য, তখন সেই অবস্থান থেকে তাকে টেনে আনার জন্য রশি ব্যবহার করা হয়।
একইভাবে কুরআন পাপের গভীরে ডুবে যাওয়া মুসলিমকে জাহান্নামের আগুনের দ্বারপ্রান্ত থেকে জান্নাতের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে। কুরআন এমন একটি গ্রন্থ যাতে রয়েছে পাপ- পূণ্যের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা, যা স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত। তাই বলা যায়, কুরআন হচ্ছে সেই রশি যার এক প্রান্তের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে স্বয়ং আল্লাহর কাছে আর অপরপ্রান্ত উন্মুক্ত রয়েছে বান্দার দিকে। যে বান্দা এই কুরআনকে আঁকড়ে ধরে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের দিকে টেনে নেন, জাহান্নাম থেকে বাচিঁয়ে দেন।
দ্বিতীয়ত: ‘রশি’ দিয়ে আরেকটি কাজ করা যায়, তাহলো অনেকগুলো বস্তুকে একসাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা। কুরআন এমন একটি পবিত্র গ্রন্থ- যা জাতি, বর্ণ, আর্থিক অবস্থান, সামাজিক অবস্থা– নির্বিশেষে সকল মুসলিমদের একই বন্ধনে আবদ্ধ করে ’একটি উম্মাহ’ হিসেবে ভাবতে/ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে ।
উপরোক্ত আয়াতে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার আগে আরবের বিভিন্ন গোত্ররা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত থাকতো, তাদের মধ্যে একতা ছিল না। কিন্তু কুরআন তাদেরকে একত্রিত করেছে, ব্যক্তিগত বিভেদ ভুলে সমষ্টিগতভাবে চিন্তা করতে, কাজ করতে শিখিয়েছে।
কুরআন ছিল তাদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ নিয়ামত আর এই নিয়ামতের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের সকল প্রান্তের মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ রাখার বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী।
মহান আল্লাহ আমাদের কুরআন নামক আল্লাহ প্রদত্ত এই বিশেষ রজ্জুকে আঁকড়ে ধরে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।
পর্ব – ৬
“পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত তো এরূপ যেমন আমি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি, পরে তা মিলিত, সংমিশ্রিত হয়ে তা থেকে যমীনের শ্যামল উদ্ভিদ বেরিয়ে এলো যা মানুষ ও জীব-জন্তু খেয়ে থাকে। তারপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয় এবং তার অধিকারিগণ মনে করে সেটা তাদের আয়ত্তাধীন, তখন দিনে বা রাতে আমার নির্দেশ এসে পড়ে, তারপর আমি তা এমনভাবে নির্মূল করে দেই যেন গতকালও সেটার অস্তিত্ব ছিল না । এভাবে আমি আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।” (সূরা ইউনুস :২৪)
আলোচ্য আয়াতে পার্থিব জীবনের সাথে প্রকৃতির তুলনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় মহান আল্লাহ তাআলা প্রকৃতির উপমা ব্যবহার করে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন। উক্ত আয়াত বিশ্লেষণ করলে প্রকৃতির সাথে পার্থিব জীবনের যা যা সাদৃশ্য পাওয়া যায় তা হলো-
প্রথমত: প্রকৃতিতে যেমন আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হলে তা থেকে শুষ্ক মাটিতে প্রাণের সঞ্চার হয়, তেমনই পৃথিবীতে মানুষের জীবনের সূচনা হয় এক ফোঁটা জলবিন্দু থেকে।
দ্বিতীয়ত: আলো,বাতাস, মাটি,পানি সব কিছুর সংমিশ্রণে যেমন বীজ থেকে উদ্ভিদের অঙ্কুরোদগম হয়, তেমনি শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর সমন্বয়ে তৈরি ’জাইগোট’ থেকে ভ্রুণের উৎপত্তি হয়।
তৃতীয়ত: উদ্ভিদের মধ্যে যেমন ভিন্নতা আছে, কিছু উদ্ভিদ মানুষের খাওয়ার উপযোগী আবার কিছু উদ্ভিদ জীবজন্তুর খাওয়ার উপযোগী, তেমনি মানুষের মধ্যেও বৈচিত্র্যময়তা রয়েছে । সবার জন্ম একই প্রক্রিয়ায় হলেও সবার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য একরকম হয় না। সৎ- অসৎ, বিনয়ী- অহংকারী, লোভী- নির্লোভ,
শান্ত- মেজাজী, পরোপকারী-হিংসুটে ইত্যাদি বহুমুখী ভিন্নতা মানুষে -মানুষে পার্থক্য তৈরি করে।
চতুর্থত: উদ্ভিদ যখন ফুল, ফল ও ফসলে সমৃদ্ধ হয়ে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে তখন সেই বাগান /ক্ষেতের তত্ত্বাবধানকারী নিজেকেই এই সবকিছুর একচ্ছত্র ’মালিক’ ভাবা শুরু করে। একইভাবে মানুষ যখন শিক্ষা, ক্যারিয়ার, অর্থ, বিত্ত, সুস্বাস্থ্য, পরিবার দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন সে নিজেকে এসব নিয়ামতের স্বত্বাধিকারী মনে করে অহংকারী হয়ে ওঠে।
পঞ্চমত: প্রকৃতিতে যেমন যেকোনো সময় যেকোনো দুর্যোগ (বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, ভূমিকম্প) এসে এই সমৃদ্ধ ফসলকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে তেমনি মানুষের জীবনেও যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ (শারীরিক অসুস্থতা, আর্থিক বিপর্যয়, পারিবারিক টানাপোড়েন) এসে তার জীবনের নিয়মতগুলোকে কেড়ে নিতে পারে।
উভয় ক্ষেত্রেই এই নিশ্চিহ্নতা এতটাই আকস্মিক হতে পারে যে, মনে হবে গতকাল এসবের কোন অস্তিত্বই ছিল না।
প্রকৃতির এই উত্থান-পতন থেকে চিন্তাশীল মানুষের জন্য শিক্ষা রয়েছে যে, মানবজীবন যতটাই আকর্ষণীয়, মোহময় মনে হোক না কেন তা অবিনশ্বর নয়, ক্ষণস্থায়ী। স্রষ্টার নির্দেশে দিন -রাতের ব্যবধানে তা নিমেষেই সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই পার্থিব জীবনের চাকচিক্যময়তায় আবিষ্ট হয়ে থাকলে হবে না।
মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।
পর্ব – ৭
“অবশ্য আমি ইচ্ছা করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতাম সে সকল নিদর্শনসমূহের দৌলতে। কিন্তু সে যে অধঃপতিত এবং নিজের রিপুর অনুগামী হয়ে রইল। সুতরাং তার অবস্থা হলো কুকুরের মতো; যদি তাকে তাড়া করো তবুও হাঁপাবে আর যদি ছেড়ে দাও তবুও হাঁপাবে। এটা হলো সেসব লোকের উদাহরণ; যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে আমার নিদর্শনসমূহকে। অতএব, আপনি বিবৃত করুন এসব কাহিনী, যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আরাফ : ১৭৬)
আলোচ্য আয়াতে বনি ইসরাইলের একজন আলেম ব্যক্তির পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।
তাফসিরকারদের মতে, বনি ইসরাইলে একজন আলেম ব্যক্তি ছিলেন যিনি তৎকালীন আসমানী কিতাব তাওরাতের জ্ঞান সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তার সামনে সুযোগ ছিল উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় তিনি সেই সুযোগ হারান।
তৎকালীন সময়ের একজন ক্ষমতাধর শাসক উক্ত ব্যক্তির মেধা ও জ্ঞানকে মুসা (আ:) এর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার জন্য প্রলুব্ধ করতে থাকে। প্রথমদিকে সে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও পরবর্তীতে যখন তাকে বারংবার অর্থ, ক্ষমতা ও খ্যাতির লোভ দেখানো হয় তখন সে শেষ পর্যন্ত তার নীতিতে অটল থাকতে ব্যর্থ হয়। সে মুসা (আ:) এর বিপক্ষে কাজ করে। এভাবে সে ক্ষমতাশীলদের কাছে নিজের জ্ঞানকে বিক্রি করে দেয় পার্থিব লোভ-লালসার বিনিময়ে।
এই পথভ্রষ্ট আলেম ব্যক্তির উদাহরণ দিতে গিয়ে কুরআনে যে উপমা ব্যবহার করা হয়েছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এ ধরনের ব্যক্তিকে তুলনা করা হয়েছে বন্য কুকুরের সাথে, যে সবসময় জিহ্বা বের করে হাপাঁতে থাকে। তার উপর ’বোঝা’ চাপলেও সে হাপাঁতে থাকে না চাপালেও সে হাপাঁতে থাকে।
অর্থাৎ বোঝা থাকা কিংবা না থাকাটা তার আচরণের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।
নিঃসন্দেহে সকল পশুপাখি মহান আল্লাহর সৃষ্টি। অনেক পশুকে তাদের গুণবাচক বৈশিষ্ট্যের জন্য ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন- সাহসিকতার জন্য সিংহের সাথে, ক্ষীপ্রতার জন্য চিতা বাঘের সাথে তুলনা করা হয়। কিন্তু বন্য কুকুর এমন একটি প্রাণী যার সম্পর্কে সব সম্প্রদায়ের লোকজনই নেগেটিভ ধারণা পোষণ করে। সমগ্র পশুকুলের সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং আল্লাহ তাআলাও পথভ্রষ্ট আলেম সম্প্রদায়ের উপমা দেওয়ার জন্য বন্য কুকুরকে বেছে নিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে অপমানজনক।
তাই মহান আল্লাহ তাআলা যাদেরকে মেধা ও জ্ঞান এর নিয়ামত দান করেছেন তাদের উচিত এই নিয়ামতকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করে উম্মাহ’র কল্যাণের কাজে লাগানো এবং ক্ষমতাশীল ব্যক্তিরা যেন তাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত না করতে পারে সেজন্য সতর্ক থাকা, পারোতোপক্ষে ক্ষমতাশীলদের সঙ্গ পরিত্যাগ করা। নাহলে তারা বন্য কুকুরের মতোই ঘৃণিত ও অপমানিত হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের এ ধরনের অপমান থেকে হেফাজত করুন । আমীন।
পর্ব – ৮
“সত্যের আহ্বান একমাত্র তাঁরই। যারা তাঁকে ছাড়া অন্যকে আহ্বান করে, তারা তাদেরকে কোনো কিছুতেই সাড়া দেয় না ; তাদের দৃষ্টান্ত সে ব্যক্তির মতো, যে তার মুখে পানি পৌঁছবে এই আশায় তার দুহাত মেলে ধরে পানির দিকে, অথচ তা তার মুখে পৌঁছার নয়, আর কাফিরদের আহ্বান তো কেবল ভ্রষ্টতায় নিপতিত।” (সূরা আর’ রাদ : ১৪)
আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে কোনো কিছু পাওয়ার জন্য আহ্বান করতে হলে, ডাকতে হলে একমাত্র আল্লাহ’কেই ডাকতে হবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কোনো কিছু চাইলে তা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এক্ষেত্রে ’উপমা’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সেই ব্যক্তির নির্বুদ্ধিতাকে; যে পানির দিকে দুহাত প্রসারিত করে এই আশায় থাকে যে, পানি তার তৃষ্ণা নিবারণ করবে। অথচ বাস্তবতা হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে পানিকে হাতে নিয়ে নিজের মুখ পর্যন্ত এগিয়ে আনবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার পিপাসা মিটবে না।
অর্থাৎ কোন কিছু পাওয়ার জন্য সঠিক কর্মপদ্ধতি জানা দরকার।
একইভাবে দুআ করার জন্য শুধু দুই হাত প্রসারিত করলেই হবে না, হাত দুটো কার সমীপে তোলা হয়েছে সেটাও জরুরী। পার্থিব অনেক চাওয়া পূরণের জন্য অনেক সময় আমরা সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন ব্যক্তিদের ক্ষমতাশালী মনে করি। যেমন- কর্মক্ষেত্রে প্রমোশনের জন্য ’বস’কে, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য শিক্ষককে, রোগ থেকে মুক্তি পাবার জন্য চিকিৎসককে, মামলা -মোকদ্দমা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আইনজীবীকে প্রভৃতি। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তিরদের তোষামোদ করার জন্য আমরা তাদের কাছে হাতজোড় করে প্রার্থনা পর্যন্ত করি।
অথচ আমরা ভুলে যাই যে, পদোন্নতি, ভালো ফলাফল, সুস্থতা– এসব কিছুই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। আর রিজিকের একমাত্র ’মালিক’ আল্লাহ, বাকি সবাই সেই রিজিক বান্দার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ’মাধ্যম’ মাত্র। তাই ’মাধ্যম’ এর কাছে না চেয়ে সরাসরি মালিকের কাছে হাত পেতে চাইতে হবে, তবেই তা পাওয়া যাবে।
মালিকের কাছে চাওয়ার আরেকটি ভুল পদ্ধতি হলো, নিজেকে direct interection এর যোগ্য মনে না করে আপাতদৃষ্টিতে ’পূণ্যবান’ তকমা পাওয়া জীবিত /মৃত কোনো ব্যক্তিকে নিজের চাওয়া উপস্থাপন করার ’উসিলা’ হিসেবে ব্যবহার করা। সেটা হতে পারে পীর, দরবেশ, আউলিয়া প্রভৃতি উপাধি পাওয়া জীবিত বা মৃত কেউ। কিন্তু এভাবে নিজেকে অযোগ্য মনে করে তদবির করার জন্য অন্য কারও দ্বারস্থ হওয়া শয়তানের একটা কৌশল মাত্র। শয়তান মানুষকে এই ওয়াসওয়াসা দেয় যে, “ তুমি পাপী, তোমার দোয়া কবুল হবে না।” অথচ আল্লাহর দরবারে সব ধরনের বান্দার হাত তোলার সমান অধিকার/ সুযোগ রয়েছে। তাই চাইতে হবে নিজেকে, সরাসরি মালিকের কাছে।
বস্তুত: আলোচ্য আয়াতের উপমা থেকে আমরা দুআ করার প্রকৃত পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারি।
শুধু দুই হাত প্রসারিত করে চাইলেই হবে না, আরাধ্য বস্তুটিকে নিজের কাছে পাওয়ার জন্য সেটিকে সঠিক পদ্ধতিতে নিজের দিকে টেনে আনতে হবে। আর সেই সঠিক পদ্ধতি হলো –
প্রকৃত মালিকের কাছে চাওয়া, অন্য কোনো সত্ত্বার কাছে চাইলে হবে না।
নিজে সরাসরি চাওয়া, চাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো মাধ্যম ব্যবহার করা যাবে না।
মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক উপায়ে তার কাছে দুই হাত তুলে চাইবার তৌফিক দান করুন। আমীন।
পর্ব – ৯
“তিনি আকাশ হতে বৃষ্টিপাত করেন, ফলে উপত্যকাসমূহ তাদের পরিমাণ অনুযায়ী প্লাবিত হয় এবং প্লাবন তার উপরের আবর্জনা বহন করে। এরূপে আবর্জনা উপরিভাগে আসে যখন অলংকার বা তৈজসপত্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে কিছু আগুনে উত্তপ্ত করা হয় । এভাবে আল্লাহ্ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকেন। যা আবর্জনা তা ফেলে দেয়া হয় এবং যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিতে থেকে যায়। এভাবে আল্লাহ্ উপমা দিয়ে থাকেন।“ (সূরা আর রাদ : ১৭)
আলোচ্য আয়াতে দুটি উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। তা হলো বৃষ্টি ও আগুন। কুরআনের অন্যান্য জায়গায়ও একই বিষয়কে বোঝাবার জন্য এমন বিপরীতধর্মী দুটি উপমা ব্যবহার করা হয়েছে।
এই আয়াতে বলা হয়েছে, যখন বৃষ্টিপাত হয় তখন শুষ্ক উপত্যকাসমূহ তাদের নিজ নিজ গভীরতা অনুযায়ী বৃষ্টির পানিকে ধারণ করে। যদি উপত্যকাটি বড় হয়, তবে বেশী পানি ধারণ করে। আর যদি ছোট হয় তবে অল্প পানি ধারণ করে। এসময় উপত্যকার উপরিভাগে বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা (গাছের পাতা, ডাল প্রভৃতি) ভেসে ওঠে ।
একইভাবে যখন কোনো ধাতু দিয়ে অলংকার বা তৈজসপত্র বানানোর উদ্দেশ্যে তাকে আগুনে উত্তপ্ত করা হয় তখন সে ধাতুর সাথে মিশ্রিত খাদগুলো আলাদা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় এবং খাঁটি অংশটুকু রয়ে যায়।
এভাবে উভয় ক্ষেত্রে আবর্জনা/ খাদ আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার উপমা দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, যখন হেদায়েতের বাণী আসে তখন কে কিভাবে সেটা গ্রহণ করে তা থেকে বোঝা যায় কে হকের পথে আছে আর কে বাতিল হয়ে যাওয়ার যোগ্য।
বিভিন্ন উপত্যকার যেমন বৃষ্টির পানি ধারণক্ষমতা ভিন্ন, তেমনি বিভিন্ন মানব হৃদয়েরও ইসলামের চিরন্তন বাণীসমূহ উপলব্ধি করার ক্ষমতা ভিন্ন। কেউ সেগুলোর মর্মার্থ গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে, কেউ মোটামুটিভাবে উপলব্ধি করতে পারে আবার কেউ কেউ তা আদৌ উপলব্ধি করতে পারে না বলে সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে। এভাবে কারা প্রকৃত মুমিন আর কারা ভন্ড তা চিহ্নিত হয়ে যায়।
প্রকৃত মুমিনদের জন্য এই আয়াতটি নিঃসন্দেহে একটি আশাজাগানিয়া আয়াত। আমরা যদি বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করি তবে দেখব, যারা ইসলামের প্রকৃত অনুসারী নয় তারাই দুনিয়াবী বিভিন্ন ক্ষেত্রে টপ লেভেলে অবস্থান করছে ; ঠিক যেমন আবর্জনা বৃষ্টির পানির উপরিভাগে ভেসে থাকে।
কিন্তু একসময় যেমন উপরের আবর্জনা সরে গিয়ে নিচের স্বচ্ছ পানি বেরিয়ে আসে তেমনই এসব ইসলাম বিদ্বেষী সাময়িকভাবে সর্বক্ষেত্রে শীর্ষে অবস্থান করলেও একসময় তাদের পতন হবে এবং প্রকৃত মুমিনরা তাদের উপর বিজয়ী হবে ইনশাআল্লাহ। ততদিন পর্যন্ত প্রকৃত মুমিনদের ইসলামের পথে দৃঢ় ও অটল থাকতে হবে। অল্প সময়ের জন্য শীর্ষ স্থান পাওয়ার লোভে ঈমানের পথ থেকে বিচ্যুত হলে চলবে না।
মুমিনের জীবনে ব্যর্থতা, দরিদ্রতা, অপমান, হতাশা প্রভৃতি নানা রকম পরীক্ষা আসবে। এই পরীক্ষার আগুনে পুড়ে যারা খাঁটি ঈমানদার তারাই টিকে থাকবে, আগুন যেমন খাদকে বাতিল করে ধাতুকে পুড়িয়ে আরো খাঁটি করে তোলে, মুমিনের জীবনের পরীক্ষাগুলোও তেমনই প্রকৃত ঈমানদারদের চিহ্নিত করে তাদেরকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত করে তুলবে।
মহান আল্লাহ আমাদের প্রকৃত মুমিন হওয়ার তৌফিক দান করুন, আমরা যেন আবর্জনা বা খাদের মতো বাতিল না হয় ইসলামের জন্য উপকারী মুসলিম হতে পারি। আমীন।
পর্ব- ১০
“আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ্ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা উপরে বিস্তৃত।” ( সূরা ইবরাহীম : ২৪)
আলোচ্য আয়াতের প্রথমাংশে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত উপমাসমূহের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বলেছেন। এই আয়াতে ‘পবিত্র বাক্য’কে পবিত্র বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
এখানে ‘পবিত্র বাক্য’ অর্থ কালিমা তাইয়্যেবা- ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ । এই বাক্যকে বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয়েছে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে। যেমন-
প্রথমত: প্রকৃতির সকল উপাদানের মধ্যে বৃক্ষ হচ্ছে সেই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন নিঃসরণ করে প্রকৃতিতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। তদ্রুপ কালিমা তাইয়্যেবা হচ্ছে সেই মহা মূল্যবান বাক্য যা উচ্চারণ করে একজন ব্যক্তি ’মুসলিম’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঈমানের মূল ভিত্তিই হচ্ছে কালিমা তাইয়্যেবা, যা অন্তরে ধারণ করে একজন মুসলিম বেঁচে থাকে।
দ্বিতীয়ত: বৃক্ষের যেমন সকল অংশই উপকারী (ফুল সুবাস ছড়ায়, ফল খাদ্যের সংস্থান করে, কাণ্ড লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়) তেমনি যে ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানদার অর্থাৎ যে হৃদয়ে কালিমা তাইয়্যেবা ধারণ করে তার প্রতিটি কথা, কাজ, আচরণই উম্মাহ’র জন্য উপকারী।
তৃতীয়ত: বৃক্ষ যেমন তার সুশীতল ছায়া দিয়ে তার নিচে আশ্রয় নেওয়ার জন্য অন্য প্রাণীকে আকৃষ্ট করে তেমনই ঈমানদার ব্যক্তি তার চরিত্রের মাধুর্য ও সৌন্দর্য দিয়ে অন্য ধর্মের মানুষকেও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করে।
চতুর্থত: বৃক্ষ যতোই বড় হয় তার শিকড় ততোই মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়ে, দৃঢ়তা অর্জন করে। ফলে দমকা বাতাসে তখন সে আর দোদুল্যমান হয় না। একইভাবে কালেমা তাইয়্যেবার প্রতি বিশ্বাস যতো দৃঢ় হয়, ব্যক্তির ঈমান ততোই মজবুত হয়। সে তখন শয়তানের বহুমুখী প্ররোচনাতে বিভ্রান্ত হয় না ।
পঞ্চমত: বৃক্ষ যতো বৃদ্ধি পায় তার শাখা ততোই উপরের দিকে উত্থিত হয়। তেমনই ব্যক্তির ঈমানের লেভেল যত বৃদ্ধি পায়, তার নেক আমলের পরিমাণও ততো বাড়তে থাকে। আর এই নেক আমল তাঁকে জান্নাতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
মহান আল্লাহ আমাদের কালিমা তাইয়্যেবা হৃদয়ে ধারণ করে একজন প্রকৃত ও উপকারী মুমিন হবার তৌফিক দান করুন। আমীন।
পর্ব – ১১
“আল্লাহ্ উপমা দিচ্ছেন অন্যের অধিকারভুক্ত এক দাসের, যে কোনো কিছুর উপর শক্তি রাখে না এবং এমন এক ব্যক্তির যাকে আমরা আমার পক্ষ থেকে উত্তম রিযক দান করেছি এবং সে তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে; তারা কি একে অন্যের সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্রই প্রাপ্য ; বরং তাদের অধিকাংশই জানে না ।” (সূরা আন-নহল : ৭৫)
“আল্লাহ আরেকটি দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, দু’ব্যক্তির, একজন বোবা কোনো কাজ করতে পারে না। সে মালিকের উপর বোঝা। যেদিকে তাকে পাঠায়, কোন সঠিক কাজ করে আসে না। সে কি সমান হবে ঐ ব্যক্তির, যে ন্যায় বিচারের আদেশ করে এবং সরল পথে কায়েম রয়েছে।” (সূরা আন-নহল : ৭৬)
”আল্লাহ্ তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্যে একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছেন। তোমাদেরকে আমরা যে, রিয্ক দিয়েছি, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের কেউ কি তাতে অংশীদার? ফলে তোমরা কি এ ব্যাপারে সমান? তোমরা কি তাদেরকে সেরূপ ভয় করো যেরূপ তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভয় করো? এভাবেই আমরা নিদর্শনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করি সে সম্প্রদায়ের জন্য, যারা অনুধাবন করে । ”
(সূরা আর-রূম :২৮)
”আল্লাহ্ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছেন: এক ব্যক্তির প্রভু অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক প্রভুর অনুগত; এ দু’জনের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্ৰশংসা আল্লাহরই; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না ।” (সূরা আয-যুমার : ২৯)
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে মূলত: মহান আল্লাহর একত্ববাদ , স্বাতন্ত্র্য, সর্বময় ও বহুমুখী ক্ষমতার সাথে অন্যান্য উপাস্যদের অক্ষমতা ও অসহায়ত্বের তুলনা করা হয়েছে বিপরীতবৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বিভিন্ন ব্যক্তির উপমা ব্যবহার করে।
প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে একজন অন্যের নিয়ন্ত্রণাধীন দাস; যার নিজের স্বাধীনভাবে কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই, সে যেমন একজন সম্পদশালী ব্যক্তি; যার নিজের সম্পদ ইচ্ছা মতো ব্যয় করার স্বাধীনতা রয়েছে তার সাথে তুলনীয় হতে পারে না, ঠিক একইভাবে মহান আল্লাহ যিনি আসমান ও জমিনের সব সম্পদের অধিকারী এবং তা থেকে যাকে ইচ্ছা সম্পদ দান করার সক্ষমতা রাখেন তিনি কখনোই সেসব নিষ্প্রাণ মূর্তি; যাদেরকে তৈরি করার জন্য দুনিয়া থেকে বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহের প্রয়োজন হয় তাদের সমতুল্য হতে পারেন না।
দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, একজন বোবা ব্যক্তি, যে তার পরিবারের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, সে যেমন একজন বাকপটু ব্যক্তি যে তার কথা দ্বারা অন্যকে পরিচালিত /মোটিভেট করতে পারে তার সমকক্ষ হতে পারে না; তেমনি মূর্খ ও বধির মূর্তিগুলো, যাদেরকে তৈরি করার পর উপাসনাকারীদের নিজেদেরই বহন করে নিয়ে আসতে হয় তারা কখনো মহান আল্লাহ তায়ালা; যার নির্দেশে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালিত হয় তার সমপর্যায়ের হতে পারে না।
তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, একজন দাস যেমন তার মনিবের সম্পদের অংশীদার হয় না, তাকে যেমন সমান মর্যাদা /সম্মান দেওয়া হয় না, তেমনি মহান আল্লাহ যিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা তিনি কখনোই তার সৃষ্টির সাথে উপাসনার অংশীদার হতে পারেন না (অনেকেই যেমন সূর্য, চন্দ্র, আগুন প্রভৃতিকে উপাসনা করে) । অর্থ্যাৎ সৃষ্টি কখনোই স্রষ্টার সমতুল্য হতে পারে না।
চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যদি পরস্পরবিরোধী মনোভাবসম্পন্ন একাধিক ব্যক্তির নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হয় তবে সে যেমন প্রতি পদক্ষেপে কনফিউজড হয়ে যায়,তার কাজগুলো যেমন একজন একক মনিবের অধীনে কর্মরত কর্মচারীর মত সুশৃংখল হয় না, তেমনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু যদি একাধিক প্রভুর নির্দেশে পরিচালিত হতো তবে সবকিছু এতো সুনিপুণভাবে চলতো না। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় বলেই তার নির্দেশনায় সবকিছু সুশৃংখলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর একত্ববাদ ও অনন্য গুণাবলীসমূহ উপলব্ধি করে একমাত্র্র তাঁরই ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
পর্ব – ১২
”মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সাজদায় অবনত দেখবেন। তাদের লক্ষণ তাদের মুখমণ্ডলে সাজদার প্রভাবে পরিস্ফুট; এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইঞ্জীলে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি চারাগাছ, যা থেকে নিৰ্গত হয় কচিপাতা, তারপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ।” (সূরা আল ফাতহ : ২৯)
আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, রাসূল (সা:) এর সাহাবীরা হলেন সেইসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যাদের সম্পর্কে তাওরাত ও ইঞ্জিলে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল এবং তাদের অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে তাদের প্রশংসা করা হয়েছিল।
তাওরাতে তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল, তারা ছিলেন কাফেরদের প্রতি কঠোর কিন্তু নিজেদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় তারা নিয়মিত রুকু ও সিজদায় নিবেদিত থাকতেন এবং তাদের চেহারা সেই পূণ্যের নূরে আলোকিত হতো।
ইঞ্জিলে তাদের উপমা দেওয়া হয়েছে একটি চারা গাছের সাথে, যা থেকে প্রস্ফুটিত হয় কচিপাতা এবং সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ তা শক্ত ও পুষ্ট হয়ে কাণ্ডের উপর দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান হয়। একইভাবে সাহাবীরাও প্রথম দিকে সংখ্যায় অল্প ছিলেন, দুর্বল ছিলেন। তাদের ইবাদত ছিল অপ্রকাশ্য যেমন মাটির নিচে বীজ লুকায়িত থাকে। সময়ের সাথে সাথে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, সাহসিকতা বেড়েছে এবং তাদের ত্যাগ ও অবদানের ওপর ভিত্তি করে ইসলাম একটি দৃঢ় ও মজবুত অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের উত্থান কাফেরদের অন্তর্জালার কারণ হয়েছে।
বস্তুত: সাহাবীদের এই অনুপম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো যে কোনো নওমুসলিম বা দ্বীনের পথে নতুন যাত্রা আরম্ভকারীদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে । নওমুসলিম বা নতুনভাবে দ্বীনপালনকারী ব্যক্তিরা প্রাথমিকভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, নিজেদেরকে Minority মনে করা শুরু করেন, নিজেদেরকে দুর্বল ও অসহায় অনুভব করেন।
কিন্তু তারপরও তারা যদি সাহাবীদের মতো বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি কঠোর থাকেন কিন্তু নিজেরা সংঘবদ্ধ হন, নিয়মিত আল্লাহর কাছে নিবেদিত হয়ে তাঁর সাহায্য কামনা করেন তবে আল্লাহর অনুগ্রহে একসময় ঠিকই তারা শক্ত ও দৃঢ় অবস্থানে পৌঁছাতে পারবেন। তাদের ঘুরে দাঁড়ানো দেখে বিরুদ্ধবাদীদের যতোই গাত্রদাহ হোক না কেন, তারা যতোই পদে পদে বাঁধা সৃষ্টির চেষ্টা করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর অনুসারীরাই বিজয়ী হবেন ইনশাআল্লাহ।
মহান আল্লাহ আমাদের সাহাবীদের মতো ঈমানদার হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।
পর্ব – ১৩
”আর তোমরা সে নারীর মতো হয়ো না, যে তার সুতা মজবুত করে পাকানোর পর সেটার পাক খুলে নষ্ট করে দেয়। ”(সূরা আন-নহল: ৯২)
আলোচ্য আয়াতে একজন নারীর নির্বুদ্ধিতাকে ’উপমা’ হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিমদের সতর্ক করা হয়েছে, যেন তারা নিজেরাই নিজেদের কৃতকর্ম দ্বারা নিজেদের পূণ্যগুলোকে ধ্বংস করে না দেয়।
একজন নারী যদি দীর্ঘ সময় ধরে অনেক শ্রম, যত্ন নিয়ে সরু সুতা বুনন করে মজবুত কোনো পণ্য (কার্পেট, ম্যাট) প্রভৃতি তৈরি করে আবার নিজেই সেটিকে খুলে ফেলে তবে সেটা যেমন নির্বুদ্ধিতার পরিচয়ক, তেমনই কোনো মুসলিম যদি নেক আমল করে পূণ্য সঞ্চয় করার পর নিজের কোনো ভুলের কারণে নিজেই সেগুলোকে বাতিল করে দেয়, তবে সেটাও হতাশাজনক।
আমরা যদি বাস্তব জীবনের উদাহরণ দেই তবে দেখবো, সারা রমাদানে আমরা সাওম, সালাত, কুরআন তেলাওয়াত, তারাবিহ ও অন্যান্য নফল ইবাদতের মাধ্যমে যে পূণ্য অর্জন করি ঈদের চাঁদ ওঠার পর চাঁদ রাত থেকে উচ্চস্বরে গান বাজানো, বেপর্দা হয়ে ঘোরাঘুরি, নাটক, মুভি দেখা প্রভৃতির মাধ্যমে সারা মাসের আমলকে এক রাতেই ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য নিজেরাই যেন উদগ্রীব হয়ে যাই। অথচ ইসলামে আনন্দ করতে বলা হয়েছে শরীয়তের নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে, বিধর্মীদের অনুকরণে নয়।
তাই মুসলিমদের শুধু নেক আমল করলেই হবে না, সেই আমল যেন বাতিল হয়ে না যায় সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। যেসব ভুলের কারণে মুসলিমের নেক আমলসমূহ বাতিল হয়ে যেতে পারে–
শিরকের মাধ্যমে। (মাজার পূজা, কবর পূজা)
রিয়ার মাধ্যমে। (জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায় দাওয়াতী কাজ করা)
অহংকার বা ঔদ্ধত্য প্রকাশের মাধ্যমে। (সাদাকাহ করার পর সেটা নিয়ে খোঁটা দেওয়া )
কুরআন ও সুন্নাহর ওপর নিজের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে। ( আলেমদের ক্ষেত্রে ফতোয়া দেওয়া হতে পারে)
বান্দার হক নষ্ট করার মাধ্যমে। (গীবত করা)
মহান আল্লাহ আমাদের নিজেদের আমল নিজেরাই নষ্ট করার মতো বোকা মুসলিম হওয়া থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
পর্ব – ১৪
”যারা আল্লাহ ছাড়া বহু অভিভাবক গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার ন্যায়,যে ঘর বানায়। আর ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো দু্র্বলতম, যদি তারা জানতো।” (সূরা আনকাবূত : ৪১)
আলোচ্য আয়াতে যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে রক্ষাকর্তা হিসেবে গ্রহণ করে তাদের সেই ভরসাকে মাকড়সার ঘরের মতো দুর্বল হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
যে কোনো প্রাণী ঘর তৈরি করে প্রকৃতির বৈরিতা বা শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য। অনুরূপভাবে মাকড়সাও জাল বুনে ঘরের মতো তৈরি করে কিন্তু এই জালগুলো খুবই সরু বলে তা দিয়ে তৈরি ঘর মজবুত হয় না। বাতাস, বৃষ্টি বা অন্যান্য সামান্য আঘাতে এই ঘর ভেঙ্গে যায়। তাই মাকড়সার এই ভঙ্গুর ঘর তাকে প্রকৃত সুরক্ষা দিতে পারে না।
অনুরূপভাবে যেসব ব্যক্তি মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে তাদের রক্ষাকর্তা মনে করে তারাও শেষ পর্যন্ত অরক্ষিত থেকে যায়। কারণ অন্য কোনো সত্তা বা মূর্তির ন্যূনতম ক্ষমতা নেই মানুষকে সমস্যা বা বিপদ থেকে উদ্ধার করার। একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আস্থা, সবর, শোকর – এসব কিছুই পারে মানুষকে সুরক্ষা দিতে। তাই বিপদ-আপদে বিভ্রান্ত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্বত্তার কাছে আত্মসমর্পণ না করে একমাত্র আল্লাহর কাছে নিবেদিত হতে হবে।
”আর যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করে সে যেন আকাশ হতে পড়ল, তারপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল“ (সূরা হাজ্জ : ৩১)
আলোচ্য আয়াতে যারা আল্লাহর সাথে শরীক করে তাদেরকে এমন এক ব্যক্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে যে আকাশ থেকে পতিত হবার পর পাখির শিকারে পরিণত হয় এবং তার সমস্ত শরীর টুকরো টুকরো হয়ে যায় অথবা কঠিন ঝড়ো হাওয়া তাকে বয়ে নিয়ে অনেক দূরে ফেলে আসে।
বস্তুত এই উপমা ব্যবহার করে এটা বোঝানো হয়েছে যে, তাওহিদ বা একত্ববাদের মহত্ত্ব আকাশের মতো সুউচ্চ ও বিশাল। এই একত্ববাদ থেকে যে বিচ্যুত হয়ে যায় সে আকাশ থেকে ভূপাতিত হওয়ার মতোই শিরকের অতল গহবরে পতিত হয়। এরপর সে শয়তানের শিকারে পরিণত হয়, তার অন্তর ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন হয়ে এক আল্লাহর আনুগত্য থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্বত্ত্বার দাসে পরিণত হয়।
কখনো সে স্বীয় প্রবৃত্তির পূজা করা শুরু করে যা তাকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিমুখ করে রাখে। এভাবে সে জান্নাত থেকে বহুদূরে চলে যায়। তার অবস্থান হয় জাহান্নামে।
মহান আল্লাহ আমাদের এইরূপ পতিত ব্যক্তি হওয়া থেকে রক্ষা করুন । আমীন।