
একটা প্রজন্ম কোন বিষয়ে বিনোদন পায় সেটা থেকে যেমন তাদের ম্যাচিউরিটি লেভেল, রুচিবোধ বোঝা যায় তেমনই কোনো সিরিয়াস ইস্যুতে তারা কিভাবে রিঅ্যাক্ট করে সেটা থেকে তাদের চিন্তার গভীরতা বোঝা যায়। অত্যন্ত উদ্যোগ ও দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি যে, ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুর মতো একটি সিরিয়াস বিষয়কে আমরা ক্রমশ: হাস্যরস, ট্রল, মিমস, টিকটক এর কন্টেন্ট বানিয়ে ফেলছি।
মনে মনে শিয়ালের নিজেকে মুরগি ভাবা, ১০০ টাকার নোটকে ১০০০ টাকা হিসেবে চালিয়ে দেয়া, ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা নিজেকে ভিসি মনে করা— এ ধরনের ফালতু পোস্ট লিখে, শেয়ার করে, ব্যাঙ্গাত্মক ভিডিওর নামে মানহীন টিকটক বানিয়ে আমরা ক্রমশ বিষয়টিকে গুরুত্বহীন করে ফেলছি।
অথচ আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, ক্লাস সেভেন পড়ুয়া টিনএজ বয়সীদের পাঠ্যপুস্তকে এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। তারা যেন অল্প বয়স থেকেই জেন্ডার পরিবর্তনের বিষয়টিকে একটি নরমাল বিষয় মনে করে বড় হয়, ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়– এটাই একটি বিশেষ শ্রেণীর মূল উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে অভিভাবক হিসেবে আমাদের প্রতিক্রিয়া এবং করণীয় কি হওয়া উচিত?
বইয়ের পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেলা বা বিষয়টিকে সংবেদনশীল হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। কারণ শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, মিডিয়ার মাধ্যমেও এই বিষয়টিকে নরমাল করার এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার প্রক্রিয়া অলরেডি শুরু হয়ে গেছে ।তাই আমরা চাইলেও আমাদের সন্তানদের এই সেনসিটিভ ইস্যু থেকে দূরে রাখতে পারবো না। তাদেরকে তাদের বয়স উপযোগী করে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ও সঠিক ধারণা দিতে হবে অভিভাবকদেরকেই।
আমার মেয়ে যখন গতবছর সপ্তম শ্রেণীতে ছিল তখন তাকে ট্রান্সজেন্ডার এবং হিজড়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা বুঝিয়েছিলাম। যেমন-
ক. ট্রান্সজেন্ডার অর্থ লিঙ্গ রূপান্তর করা আর হিজড়া অর্থ তৃতীয় লিঙ্গ,যারা পরিপূর্ণ নারী বা পুরুষ নয়।
খ. লিঙ্গ রূপান্তর করা মানুষের ইচ্ছাধীন, তার মন মানসিকতার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিরা জন্মগতভাবে শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মায়, এটা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।
গ. তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিরা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃত, তাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পাওয়ার মানবিক ও আইনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু লিঙ্গ পরিবর্তনকারী ব্যক্তিরা ধর্মীয়, সামাজিক ও আইনগত কোনোদিক থেকেই গ্রহণযোগ্য নয় বরং এ বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেওয়া, সমর্থন করা ইহকাল ও পরকালে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
এই বছর যেহেতু আমার মেয়ে আরেকটু ম্যাচিওর হয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে এই ইস্যুটি নতুন করে আলোচিত হওয়ায় বেশ কিছু নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছে তাই এবার ওকে এই সংক্রান্ত আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিলাম। অভিভাবকদের সুবিধার্থে তা শেয়ার করছি।
প্রথমত: জেন্ডার পরিবর্তন সুশৃঙ্খল সমাজের জন্য কেন হুমকিস্বরূপ?
কেউ যদি জেন্ডার পরিবর্তন করে পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হয় তখন সে সহজেই নারীদের জন্য সংরক্ষিত স্থানগুলোতে প্রবেশাধিকার পাবে। যেমন- ছাত্রী হল, কর্মজীবী নারীদের হোস্টেল, মেয়েদের কমনরুম, ওয়াশরুম, প্রেয়ার রুম, ব্রেসফিডিং রুম প্রভৃতি। এসব জায়গায় মেয়েরা এখন যেভাবে মেন্টালি রিলাক্স ভাবে সময় কাটাতে, movement করতে পারে যখন সে জানবে এসব জায়গায় রূপান্তরিত নারীরাও অবাধে প্রবেশ ও অবস্থান করতে পারছে তখন স্বাভাবিকভাবেই সে একটা মেন্টাল স্ট্রেস এর মধ্যে থাকবে, ইনসিকিউরিটিতে ভুগবে, এমনকি সার্বক্ষণিক ইনসিকিউর ফিলিংস থেকে ট্রমাটাইজড হয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এভাবে অল্প সংখ্যক ’রূপান্তরিত নারীদের’ জন্য বিপুলসংখ্যক স্বাভাবিক নারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হবে।
এছাড়া বিভিন্ন ফিল্ডে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ইতিমধ্যেই নারীদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় ’রূপান্তরিত নারী’দের অংশগ্রহণের প্রচলন শুরু হয়ে গেছে, যা স্পষ্টতই প্রতিযোগিতার ফলাফলকে প্রভাবিত করছে। এভাবে সমাজে নারী -পুরুষের পৃথক স্বাভাবিক একটিভিটিসের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয়তঃ জেন্ডার পরিবর্তন করতে হলে কি কি ধরনের শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয় ?
জেন্ডার পরিবর্তন মোটেও কোনো সহজসাধ্য প্রক্রিয়া নয়। প্রকৃতি প্রদত্তভাবে কোনো ব্যক্তি যে লিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে মনে মনে অন্য কিছু ভাবলেই তাতে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া এতটা সহজ নয়। বরং এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী ,কষ্টকর ও ব্যয়বহুল।
বিভিন্ন ধরনের হরমোন রিলেটেড ওষুধ খেতে হয়, নানারকম সার্জারি করতে হয়, যার ফলে শরীরের ওপর দিয়ে অনেক ধকল যায়। এছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবার, আত্মীয়স্বজন এধরনের ’রূপান্তরিত ব্যক্তি’কে সহজভাবে মেনে নেয় না। ফলে তারা মানসিকভাবে অনেক একা হয়ে যায়।
পশ্চিমা বিশ্বের এমন অনেক কেস স্টাডি আছে যেখানে লিঙ্গ পরিবর্তন করতে গিয়ে অনেক ব্যক্তি পার্মানেন্ট শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছে, কেউ আবার নিজের ভুল বুঝতে পেরে জন্মগত লিঙ্গে ফিরে যাওয়ার আকুতি প্রকাশ করেছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
অভিভাবক হিসেবে আমাদের উচিত এই উদাহরণগুলো আমাদের সন্তানদের জানানো যেন তাদের মনে কখনো এ ধরনের চিন্তার উদ্রেক হলেও তারা যেন এর বাস্তবিক পরিণতির কথা ভেবে নিজেদের সংযত করতে পারে।
তৃতীয়ত: জেন্ডার পরিবর্তন কিভাবে সমকামী হওয়ার পথ উন্মুক্ত করে?
জেন্ডার পরিবর্তনের মাধ্যমে মূলত বাহ্যিক কিছু শারীরিক পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও নারী- পুরুষের স্বতন্ত্র যে অঙ্গগুলো তাদেরকে একে অপর থেকে পৃথক করে এবং সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে বংশধারা বজায় রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে সেগুলো শতভাগ পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না।
তাই একজন ’রূপান্তরিত নারীর’ প্রতি একজন জন্মগতভাবে সুস্থ পুরুষ আকষর্ণ অনুভব করবে –এই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অন্যদিকে বেসিক যে ফিতরাত নিয়ে একজন পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিল তার শতভাগ পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না বলে নারীতে রূপান্তরিত হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সে একজন নারীর প্রতিই আকর্ষণ অনুভব করে এবং ফলাফল হিসেবে এরা সমকামীতে পরিণত হয়।
পশ্চিমা বিশ্বে এমন কেস স্টাডি আছে যেখানে একজন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী; যে পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হয়েছিল বিধায় তাকে নারী কয়েদীদের সাথে একই কক্ষে রাখা হয়েছিল। এরপর সে অন্য কয়েদীদের একাধিকবার শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে। অর্থাৎ তার বাহ্যিক শারীরিক পরিবর্তন ঘটলেও তার বেসিক ফিতরাত এর পরিবর্তন হয়নি। তাই্ এধরনের রূপান্তরিত ব্যক্তিদের থেকে স্বাভাবিক মানুষরা নিরপাদ নয়।
এধরনের বাস্তব উদাহরণগুলো জানাতে হবে আমাদের টিনএজ সন্তানদের যেন তারা সচেতন থাকতে পারে।
চতুর্থত: সমকামীতার ব্যাপারে ধর্মীয় বিধান কি?
প্রতিটি ধর্মেই সমকামীতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
ইসলাম ধর্মে এটা এতটাই গুরুতর পাপ যে, আল্লাহ তায়ালা একটি জাতিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন শুধুমাত্র এই পাপের কারণে।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, ”রাসূলা(সা:) নারীর আকৃতি ধারণকারী পুরুষকে এবং পুরুষের আকৃতি ধারণকারী নারীকে অভিশাপ দিয়েছেন”।
তাই লিঙ্গ রূপান্তর শুধু ইহকাল নয় , পরকালের জীবনকেও ধ্বংস করে।
সবশেষে বলতে চাই, ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুকে মিডিয়া, শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্র যতই নরমালাইজ করার চেষ্টা করুক না কেন এর নেগেটিভ দিকগুলো সম্পর্কে আলোচনা করে সন্তানদের মধ্যে এই বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাবের মজবুত ভিত্তি তৈরি করে দেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব আমাদের অভিভাবকদেরকেই পালন করতে হবে।
.