প্যারেন্টিং নিয়ে আমার ভাবনা . . .

লেখাটি শেয়ার করতে পারেন

লিখেছেন – হাবিবা মুবাশ্বেরা

প্রথমে Disclaimar দিতে চাই যে, প্যারেন্টিং নিয়ে আমার কোন প্রফেশনাল ট্রেনিং বা একাডেমিক কোর্স করা নেই। যা আছে, তা হলো মা হিসেবে ১৩ বছরের অভিজ্ঞতা, শিক্ষক হিসেবে ৬ বছর বিভিন্ন ধরনের শিশুদের পড়ানোর অভিজ্ঞতা এবং সর্বোপরি নিজস্ব অবজারভেশন ক্ষমতা। এই সামান্য পুঁজি নিয়ে প্যারেন্টিং বিষয়ে লেখালেখি করি এই প্রত্যাশায় যে, আমার অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনা হয়তো অন্যদের জন্য কিছুটা হলেও হেল্পফুল হবে।

নিঃসন্দেহে বর্তমান সময় প্যারেন্টিং একটি অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জিং টাস্ক। প্যারেন্টিং মানে এখন আর শুধু সন্তানকে ভরণপোষণ দেওয়া নয় বরং চরম অস্থির একটা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে সন্তানকে রাইট ট্র্যাকে রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সময়ের প্যারেন্টদের জন্য। যদিও পারফেক্ট প্যারেন্ট হওয়া কখনো সম্ভব নয় তবে সচেতন প্যারেন্ট হিসেবে নিজের দায়িত্বটুকু পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেলে অন্তত নিজের কাছে এটা ক্লিয়ার থাকা যায় যে, I tried my best.  এই সচেতন প্যারেন্ট হওয়ার জন্য নিজের মধ্যে কিছু মাইন্ডসেট করে নিতে হবে।

#  প্রথমেই এটা মেনে নিতে হবে যে, প্রতিটি সন্তানের শারীরিক ও মানসিক গঠন আলাদা। এমনকি লিঙ্গ ভেদে বেসিক ফিতরাতের কারণে ছেলে ও মেয়েদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। তাই নিজের সন্তানকে কখনও অন্যের মতো হতে বলা যাবে না বরং তাকে ভালোভাবে অবজার্ভ করে তার নিজস্ব শারীরিক, মানসিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে আইডেন্টিফাই করে তার মধ্য থেকে ম্যাক্সিমাম আউটপুট বের করার জন্য তাকে হেল্প করতে হবে। আম গাছে যেমন কাঁঠাল ফলবে না– এটা মেনে নিয়ে আমরা ভালো আম উৎপাদনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি তেমনি আমার সন্তান কেমন সেটা চিহ্নিত করে তাকে সেই অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে প্যারেন্টসদের।

# পারিবারিক গঠন, সামাজিক কাঠামো এমনকি রাষ্ট্রভেদে প্যারেন্টিং এর ধরন ভিন্ন হবে– এটা মাথায় রাখতে হবে। একক পরিবারে প্যারেন্টিং যৌথ পরিবার থেকে আলাদা হবে, গ্রামীণ সমাজে প্যারেন্টিং শহুরে পরিবেশ থেকে ভিন্ন হবে আবার মুসলিম দেশে প্যারেন্টিং নন মুসলিম দেশের চেয়ে ভিন্ন হবে। যেহেতু পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রভেদে প্যারেন্টিং এর চ্যালেঞ্জগুলো ভিন্ন হয় তাই নিজের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অনুযায়ী প্যারেন্টিং এর কৌশল ঠিক করতে হবে।

# সন্তানের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে প্যারেন্টিং এর ধরন বদলাতে হবে। শৈশবে, টিনএইজে , তারুণ্যে, যৌবনে এমনকি সন্তান নিজে যখন প্যারেন্ট হয়ে যাবে তখনও যদি তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে হয় তবে প্যারেন্ট হিসেবে নিজেকেও ক্রমাগত পরিবর্তন করতে হবে। কখনো Adorable  হিসেবে, কখনো Friend হিসেবে, কখনো Guide হিসেবে আবার কখনো নিজের Ego কে স্যাক্রিফাইস করে সন্তানের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে হবে। এক কথায় প্যারেন্টিং একটা Lifelong journey এটা মনে রেখে প্যারেন্টকে Strategic হতে হবে তাহলে সন্তানদের সাথে আজীবন bonding  ভালো থাকবে।

# প্যারেন্টের তরফ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও সন্তান যে সবসময় সঠিক পথে থাকবে এই Over expectation থেকেও বিরত থাকতে হবে। কারণ সন্তান সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন সত্তা। একসময় যার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব তৈরি হবে এটাই স্বাভাবিক এবং এই পার্সোনালিটি যে প্যারেন্টের প্রত্যাশা অনুযায়ী হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই‌।

তাই Last but most important part হলো সন্তানের জন্য দুআ করা। আবার এই দুআ’র ফলাফল জীবদ্দশায় দেখার সৌভাগ্য নাও হতে পারে তবু দুআ করা বন্ধ করা যাবে না।

সম্প্রতি ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর জীবনী সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত গুলো পড়তে গিয়ে যে বিষয়টা প্যারেন্ট হিসেবে মনে নাড়া দিয়েছে তা হলো তিনি শুধু নিজের সন্তানদের জন্যই দুআ করতেন না বরং তাদের পরবর্তী বংশধরদের জন্যও দুআ করতেন আল্লাহর কাছে। আর তার এই দুআ কবুলের ফলাফল হিসেবে তাঁর বংশে এসেছেন ইসমাইল (আ:), ইসহাক (আ:), ইয়াকুব (আ:), মুসা (আ:) এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাই আমরা যদি প্যারেন্ট হিসেবে স্রষ্টার একজন বান্দাকে সঠিকভাবে প্রতিপালন করার যে মহান দায়িত্ব আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন তা সঠিকভাবে পালন করতে চাই, তবে আমাদের দুনিয়াবী সকল প্রচেষ্টার পাশাপাশি সন্তানদের জন্য দুআ করে যেতে হবে নিরন্তর।

প্যারেন্টিং সম্পর্কিত আমার লেখা গুলো-

১. প্যারেন্টিং এর সেকাল-একাল
২. প্যারেন্ট যখন সন্তানের অকল্যাণ ডেকে আনে !!
৩. প্যারেন্ট যখন সন্তানদের মাঝে তুলনা করে !!!
৪. প্যারেন্ট হওয়ার পর নিজের প্যারেন্টদের সাথে আচরণ
৫. সন্তানকে পারিবারিক বাজেট বিষয়ে ধারণা দিবেন যেভাবে
৬. সন্তানকে ‘সামাজিক মানুষ’ হিসেবে গড়ে তুলবেন যেভাবে . . .
৭. সন্তানের মাঝে কোন ধরনের Legacy রেখে যাবেন??
৮. সন্তানকে ’জেন্ডার রোল’ বিষয়ে ধারণা দেবেন যেভাবে . . .
৯. প্যারেন্ট হিসেবে সন্তানের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করবেন যেভাবে. . .

লেখাটি শেয়ার করতে পারেন