কুরআনের রুকিয়াহ’র আয়াতগুলো আত্মস্থ করা

লেখাটি শেয়ার করতে পারেন

পর্ব-১

অনেক দিন ধরে ইসলাম প্র্যাক্টিস করছে এমন মানুষদের কাছ থেকে প্রায়ই আমি শুনি যে, “আপু রুকিয়াহ কী জিনিস? যাদুটোনা বা তাবিজ কবজ এগুলো কি আসলেই করে মানুষ? অথবা এগুলোতে কি কাজ হয় আসলেই?”
বিশ্বাস করেন, আমার না খুব অবাক লাগে! কুরআন থেকে যে আমরা কতটা দূরে এই প্রশ্নগুলো স্রেফ সেটার একটা প্রমাণ।

আসলে জ্বীনজগত সম্পর্কে ধারণার ব্যাপারে আমরা সাধারণত চরমপন্থা অবলম্বন করি। এক দল আছেন যারা সব কিছুকেই জ্বীনের আছর বলে মনে করেন এবং কিছু হলেই পীর, ফকিরদের কাছে যান জ্বীন ছাড়াতে। এসব পীরদের অলৌকিক কর্মকাণ্ড দেখে তারা বিস্ময়াভিভূত হয়ে যান, তাদেরকে আল্লাহর আউলিয়া ভেবে শিরকে লিপ্ত হয়ে যান। অথচ আমরা অনেকেই জানি না যে অলৌকিক কর্মকাণ্ডগুলো অধিকাংশই হয় জ্বীনদের সাহায্যে। যেমনঃ কেউ শূন্যের উপর ভেসে আছে দেখে অনেকে তাকে আল্লাহর আউলিয়া ভাবা শুরু করে। অথচ ব্যাপারটা আসলে সহজ, জ্বীনটা লোকটাকে হাত দিয়ে উপরে তুলে রেখেছে, কিন্তু আমরা মানুষরা জ্বীনটাকে দেখতে পাচ্ছি না, যদিও তারা ঠিকই আমাদের দেখতে পায় (৭:২৭) ।

আরেক দল আছেন যারা এইসব গোঁড়া আচার আচরণকে স্রেফ কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিয়ে জ্বীনের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসেন, ফলে আমাদের জীবনে অনেক অসুস্থতা, ঝামেলা ইত্যাদি যে জ্বীনের প্রভাবে হয় এটার বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করেন।মজার ব্যাপার হচ্ছে, জিজ্ঞেস করলে দেখা যাবে তাদের সবারই কম বেশী সূরা নাস মুখস্থ আছে যেখানে আমরা জ্বীনদের থেকে আশ্রয় চাই। আসলে জ্বীনে বিশ্বাস আমাদের ঈমানের অঙ্গ কারণ আল্লাহ্‌ কুরআনে এদের কথা উল্লেখ করেছেন, এদের ব্যাপারে বহু সহীহ হাদীস রয়েছে। এটা গায়েবে বিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই এই সিরিজে আমরা জ্বীনজগতে বিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ।

প্রথমত: মানুষ কখনো জ্বীনদের উপরে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, তাদেরকে এই ক্ষমতা দেয়া হয়নি।

দ্বিতীয়ত: জ্বীনরা গায়েব জানে না। (৩৪:১২-১৪)

এখন এই সবগুলোর সাথেই ‘কিন্তু’ আছে। যেমন ১নং এর ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে অনেক জ্বীন হুজুরের যে ‘ভালো’ পোষা জ্বীন থাকে বলে আমরা শুনে থাকি? সেই ব্যাপারটা কী? তাছাড়া সুলাইমান আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করতেন বলেই তো আমরা জানি।

আবার ২ নং এর ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে আদতে কিছু ভাগ্য গণকের কথা সত্যি হয়ে যায়। সেটা কিভাবে হয়?

প্রথম মূলনীতি বুঝতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মাঝে শুধু মানুষ ও জ্বীন জগতেরই বিচার হবে। আর মানুষের মাঝে যেমন মুসলিম ও কাফির আছে, জ্বীনদের মাঝেও তেমন আছে। তার উপর আমাদের প্রত্যেকের সাথেই একটি সঙ্গী জ্বীন আছে, যার নাম ক্বারিন, তার কাজই হলো আমাদেরকে খারাপ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়ার পরীক্ষার একটা অংশ। এই বিষয়টি আল্লাহ্‌ স্বয়ং কুরআনে সরাসরি উল্লেখ করেছেন-
”তার সঙ্গী শয়তান বলবেঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমি তাকে অবাধ্যতায় লিপ্ত করিনি। বস্তুতঃ সে নিজেই ছিল সুদূর পথভ্রান্তিতে লিপ্ত। আল্লাহ বলবেনঃ আমার সামনে বাকবিতন্ডা করো না আমি তো পূর্বেই তোমাদেরকে আযাব দ্বারা ভয় প্রদর্শন করেছিলাম। ”(৫০:২৭-২৮)

এখানে মানুষ ও তার ক্বারীনের মাঝে তর্কের কথা বলা হচ্ছে। কিয়ামতের দিন তারা একে অন্যকে দোষারোপ করতে থাকবে।

তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এর ব্যাতিক্রম। হাদীসে আছে-

“জ্বিনদের মধ্য হতে একজন করে সাথী তোমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, এমনকি আপনার সাথেও, হে রাসূলুল্লাহ (সা.)! তিনি উত্তরে বলেন, হ্যাঁ আমার সাথেও। কিন্তু ব্যতিক্রম হচ্ছে যে, আল্লাহ তায়ালা আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছেন এবং সে আনুগত্য স্বীকার করেছে। তাই সে আমাকে শুধু সৎকাজ করতে বলে।”
(সহীহ মুসলিম হা/৬৭৫৭।)

এখন আমাদের জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে (যেমন: সংসার ভাঙা, বিয়ে থেমে থাকা, বারবার কোনো মেডিক্যাল কারণ ছাড়াই গর্ভপাত ঘটা ইত্যাদি) যেগুলো আসলে যাদু টোনার মাধ্যমে জ্বীনদের সহায়তায় করা হয়। এগুলো করা হয় খারাপ জ্বীনদের সাহায্য নিয়ে। কিন্তু আমরা বলছি যে এইসব খারাপ জ্বীনদের উপরে কোনো মানুষ কখনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না…তাহলে উপর্যুক্ত কাজগুলো আসলে কিভাবে করা হয়?

পর্ব ২

এটা করা হয় ‘পারস্পরিক সমঝোতার’ ভিত্তিতে। আমরা সবাই জানি যে ইবলীসের মিশন হচ্ছে যত বেশী সংখ্যায় সম্ভব আদম সন্তানকে তার সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া। জ্বীনদের মাঝে যারা তার অনুসারী, তারা তাকে এ কাজে সাহায্য করে। এ ব্যাপারে নিচের হাদীসটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ-

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন :

ইবলীস (শায়ত্বন) সমুদ্রের পানির উপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর মানুষের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য সেখান থেকে তার বাহিনী চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শায়ত্বনই তার নিকট সর্বাধিক সম্মানিত যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশী ফিতনায় নিপতিত করতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে, আমি এরূপ এরূপ ফিতনাহ্‌ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। তখন সে (ইবলীস) প্রত্যুত্তরে বলে, তুমি কিছুই করনি। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, অতঃপর এদের অপর একজন এসে বলে, আমি মানব সন্তানকে ছেড়ে দেইনি, এমনকি দম্পতির মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করে দিয়েছি। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, শয়তান এ কথা শুনে তাকে নিকটে বসায় আর বলে, তুমিই উত্তম কাজ করেছো। বর্ণনাকারী আ’মাশ বলেন, আমার মনে হয় জাবির (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, “অতঃপর ইবলীস তার সাথে আলিঙ্গন করে”। (সহীহ : মুসলিম ২৮১৩)

অর্থাৎ জ্বীনদের একটা দল সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে মানুষকে বিপথগামী করার, বিনিময়ে শয়তান তাদেরকে নানা ধরণের পুরষ্কারের প্রলোভন দেখায়। শয়তানের কমন দুইটা পুরষ্কার হচ্ছে ক্ষমতা এবং রাজত্ব, সাথে অনন্তকালের জীবন। ইবলিস আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও ঠিক একই কথা বলেছিল। সে তাঁর কাছে এসেছিল একজন চরম হিতাকাংখী হিসেবে (৭:২০-২১), (২০:১২০)

শয়তানের এসব ওয়াদা দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে একদল জ্বীন মানুষকে বিপথগামী করতে উদ্যোগী হয়, মানুষের মাঝে একদল স্থূলবুদ্ধি সম্পন্নরা আবার তাতে সাড়া দেয়। তারা দুনিয়াতে অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি এগুলোর মোহে আবিষ্ট হয়ে গিয়ে শয়তানের সাহায্য নেয়, নানা ধরনের কুফরী কালামে লিপ্ত হয়-যেমন তাবিজ কবজ, যাদু টোনা, ভাগ্য গণনা ইত্যাদি। কিন্তু ওই যে বললাম যে মানুষের পক্ষে জ্বীনদের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব না, তাই জ্বীনরা ওইসব মানুষদের সাথে একটা ‘চুক্তি’ করে। সেই চুক্তির ধারা অনুযায়ী মানুষ নানা ধরণের শিরকি, হারাম কাজে লিপ্ত হয়, জ্বীনদের ইবাদত করে। এজন্য তাদেরকে কিছু কিছু কাজ অকল্পনীয় কাজও করতে হয় যেমন মেয়েদের ঋতুস্রাবের রক্ত পান, কুরআনের মুসহাফের উপর বাথরুম করা, সেটা দিয়ে শৌচকাজ করা, অন্য মানুষ বা পশুপাখির রক্ত পান, বিশিষ্ট কোনো মানুষের রক্ত হাজির করা (ফলে তারা তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, অনেকসময় করে), জ্বীনদের সিজদাহ করা, তাদের নামে উৎসর্গ করা ইত্যাদি। বিনিময়ে দুষ্ট ও শয়তান জিনেরা তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয় এবং মানুষ যেসব কাজ করতে চায় সেগুলো করে দেয়। যেমনঃ কাউকে বাণ মেরে অসুস্থ করে ফেলা, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো, ভবিষ্যৎ বলে দেয়া, মানসিক বিকৃতি, ভুল দেখা বা শোনার উপসর্গ দেখা দেয়া ইত্যাদি……তবে এগুলোর কোনোটাই কার্যকর হয় না যদি না আল্লাহ্‌ অনুমতি দেন। এগুলোর স্বীকার হলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উল্টা যাদুটোনার আশ্রয় না নিয়ে শরীয়তসম্মত চিকিৎসার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকা।

যাই হোক, এই উভয় দলের মাঝে এই সমঝোতাপূর্ণ সম্পর্কের কথা আল্লাহ্‌ কুরআনে আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন-

আর যেদিন আল্লাহ তাদের সবাইকে সমবেত করবেন। সেদিন বলবেন, “হে জিনের দল, মানুষের অনেককে তোমরা বিভ্রান্ত করেছিলে” এবং মানুষদের মধ্য থেকে তাদের সঙ্গীরা বলবে, “হে আমাদের রব, আমরা একে অপরের দ্বারা লাভবান হয়েছি এবং আমরা পৌঁছে গিয়েছি সেই সময়ে, যা আপনি আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।” তিনি বলবেন, “আগুন তোমাদের ঠিকানা, তোমরা সেখানে স্থায়ী হবে। তবে আল্লাহ যা চান তা ব্যতীত।” নিশ্চয় তোমার রব বিজ্ঞ, সর্বজ্ঞ। (৬:১২৮)
কিন্তু আদতে শয়তানের কি সাধ্য আছে তাদেরকে পুরস্কৃত করার? নিচের আয়াতটা একদম সত্য উন্মোচন করে দিয়েছে আমাদের সামনে-

“ যখন সব কাজের ফায়সলা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবেঃ নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছি, অতঃপর তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের উপর তো আমার কোন ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু এতটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছি, অতঃপর তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছ। অতএব তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করো না এবং নিজেদেরকেই ভৎর্সনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্যকারী নই। এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্যকারী নও। ইতোপূর্বে তোমরা আমাকে যে আল্লাহর শরীক করেছিলে, আমি তা অস্বীকার করি। নিশ্চয় যারা জালেম তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। ” (১৪:২২)

তাই কেউ যদি দাবী করে যে তার পোষা ভালো জ্বীন আছে, তাহলে তাকে নির্দ্বিধায় মিথ্যাবাদী বলা যাবে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে সুলাইমান আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে তা করতেন?
আসলে এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন সুলাইমান আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ্‌ তাঁকে এই বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছিলেন (৩৮:৩৭-৩৮, ৩৪:১২-১৩) যা আর কাউকে দেননি, এমনকি আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও না। আমরা নিচের হাদীস থেকে এটা জানতে পারি-
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “একটি শক্তিশালী জ্বিন গতরাত্রে আমার নামায নষ্ট করার জন্য আমার ঔদাস্যের সুযোগ নিতে চাচ্ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাকে আমার আয়ত্তে করে দিলেন, সুতরাং আমি তার গলা টিপে ধরলাম। আমি সংকল্প করলাম, মসজিদের খুঁটিসমূহের কোন এক খুঁটিতে তাকে বেঁধে রাখি। যাতে সকালে তোমরা সকলে তাকে দেখতে পাও। অতঃপর আমার ভাই সুলাইমানের দুআ স্মরণ হল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক রাজ্য দান কর, যার অধিকারী আমার পরে অন্য কেউ হতে পারবে না।’ (৩৮ঃ৩৫) সুতরাং আল্লাহ তাকে নিকৃষ্ট অবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন।” (বুখারী ১২১০, মুসলিম ১২৩৭নং)

পর্ব ৩

জ্যোতিষ শাস্ত্র ও জ্বীন জগত

জ্বীনদের সাহায্য নিয়ে আরো যে একটা কাজ হয় সেটা হচ্ছে ভবিষ্যৎ গণনা। এটা ইসলামে একেবারেই নিষিদ্ধ। হাদীসে আছে,

রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন গণক বা জ্যোতির্বিদদের নিকট যাবে এবং তাকে কোন কথা জিজ্ঞেস করবে ৪০ দিন তার সালাত কবুল করা হবে না। ” (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৫৯৫)

আমরা আগেই আমাদের দ্বিতীয় মূলনীতিতে জেনেছি যে জ্বীনরা গায়েব জানে না। তাহলে গণকদের কিছু কিছু কথা ফলে যায় কিভাবে? সেটাও আল্লাহ্‌ তাঁর অসীম রহমতে আমাদের হাদীসের মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছেন-

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে তিনি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছেন: “ফেরেশতারা আকাশের সীমানায় নেমে আসমানে মীমাংসা হওয়া বিষয়ের উল্লেখ করেন, ফলে শয়তানরা তা চুরি করে শোনে এবং গণকদের কাছে গোপনে পৌঁছে দেয়, অতঃপর তারা এর সাথে নিজেরা একশটি মিথ্যা কথা বানিয়ে বলে ।” (বুখারী ৩২১০)

প্রশ্ন উঠতে পারে যে এখানে চুরি করে শোনার কথা আসছে কেন। আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়্যতের পূর্বে জ্বীনরা আকাশের সীমানায় অবাধে বিচরণ করতে পারতো,আসমানে গৃহীত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জানা তাদের জন্য সহজ ছিল। এজন্যই কুরাইশদের মাঝে ভাগ্য গণকদের বিপুল মর্যাদা ছিল। কিন্তু কুরআন নাযিল হওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের প্রথম আসমান পার হওয়ার ক্ষমতাই চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়। মূলত কুরআন যে নাযিল হয়েছে সেটা তারা এই ঘটনা থেকেই বুঝতে পারে। এরপর থেকে কোনো খবর তাদের শুনতে হয় চুরি করে, যদি ফেরেশতারা টের পেয়ে যায় তাহলে আগুনের গোলা ছুঁড়ে দেয়া হয়। যারা পালিয়ে বাঁচতে পারে, শুধু তারাই কিছুটা খবর সংগ্রহ করতে পারে।এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য সূরা জ্বীনের তাফসীর পড়া যেতে পারে।

এতো গেলো ভবিষ্যতের কথা। ভাগ্যগণকদের কাছে গেলে তারা কারো অতীতের কোনো বিশেষ ঘটনা বলে থাকে যাতে সাহায্য চাইতে আসা ব্যক্তির আস্থা অর্জন করা যায়। এটা কিভাবে সম্ভব হয়? যে ব্যক্তি গণকের কাছে এসেছে তার ক্বারীনতো ওই লোকের সাথে শুরু থেকেই আছে, তাই সে উনার অতীতের ব্যাপারে সব তথ্যই জানেন, তখন ভাগ্যগণকের সাথে সমঝোতায় থাকা জ্বীন ওই লোকের ক্বারীনের কাছ থেকে চমকপ্রদ তথ্য নিয়ে লোকটাকে মুগ্ধ করে ফেলার চেষ্টা চালায়।

যাদুটোনা ও জ্বীন জগত
জ্বীন জগতের সাথে যাদু টোনার সম্পর্ক বোঝার জন্য আমাদের সবার আগে বুঝতে হবে সূরা বাক্বারার ১০২-১০৩ নং আয়াত। এর অর্থ নিম্নরূপ-

“আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমানকুফরী করেনি; বরং শয়তানরা মানুষকে যাদু শেখানোর মাধ্যমে কুফরী করেছে। আর [তারাঅনুসরণ করেছে] যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের উপর।আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, “আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা [আমাদের কাছ থেকে যাদু শেখার মাধ্যমে] কুফরী করো না। এরপরও তারা এদের কাছথেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তারমাধ্যমে কারো কোন ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত যাতাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা নিশ্চয় জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয়করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই-না মন্দ, যারবিনিময়ে তারা নিজদেরকে বিক্রয় করেছে। যদি তারা বুঝত। আর যদি তারা ঈমান আনতএবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে [তাদের জন্য] প্রতিদান উত্তম হত। যদি তারা জানতো। ”
(২: ১০২-০৩)

এই দুই আয়াতে যাদুটোনা কুফর হওয়ার ব্যাপারে কয়েকটি দলীল রয়েছে-
১) বরং শয়তানরা মানুষকে যাদু শেখানোর মাধ্যমে কুফরী করেছে – এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে যাদুটোনা শিক্ষা দেয়া কুফর।
২) আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, “আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা [আমাদের কাছ থেকে যাদু শেখার মাধ্যমে] কুফরী করো না। – এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে যাদুটোনা শেখা কুফর।
৩) এবং তারা নিশ্চয় জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। – আর আখিরাতে যার কোন অংশই নেই সে হচ্ছে অমুসলিম, কাফির।
৪) যদি তারা ঈমান আনতো এবং তাকওয়া অবলম্বন করতো ,অর্থাৎ তাদের ঈমান ছিল না।

পর্ব ৪

সূরা বাক্বারার ১০২-১০৩ আয়াতদ্বয় বুঝতে হলে আমাদের কিছু ব্যাকগ্রাউণ্ড তথ্য দরকার।
আমরা হয়তোবা জানি যে মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে যাদুবিদ্যার খুব বেশী প্রচলন ছিল। উনার সাথে যাদুকরদের ঘটনাও আমরা বিস্তারিত উল্লেখ করেছি। কিন্তু এই যাদুবিদ্যার চর্চা ছিল মিশরের ফেরাউনের অনুসারীদের কাজ। শোনা যায় যে ফিরাউন নিজেও এই কাজ করতো আর সেজন্যই নীল নদের প্রবাহ ওর নির্দেশে (আল্লাহর অনুমতিক্রমে) নিয়ন্ত্রিত হত (৪৩:৫১)। কিন্তু তার কবল থেকে উদ্ধারের পর বনী ইসরাঈলদের জন্য মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে যে শরীয়ত নির্ধারিত হয় তাতে যাদুবিদ্যা নিষিদ্ধ ছিল।
কিন্তু বনী ইসরাঈলদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে মিশরীয়দের অধীনে থাকাকালীন অভ্যাসগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিল না। মূর্তিপূজার মত এক্ষেত্রেও তাদের মাঝে যাদুবিদ্যার চর্চা চলে আসছিল। সুলাইমান আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শাসনামলে এটাকে জোরপূর্বক নিষিদ্ধ করে দেন। তিনি একটা বৈপ্লবিক কাজ করেন, যেসব বই পুস্তক যাদুবিদ্যা চর্চা ও শেখানোর কাছে ব্যবহৃত হত সেগুলো সব একসাথে নিয়ে একটি খুব নিরাপদ ভল্টে রেখে দেন যেন এগুলো একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।
কাহিনীর চমকটা এইখানেই। এভাবে যাদুচর্চা বন্ধ করে দেয়ায় যারা এই কাজ করতো তারা উনার উপর খুবই ক্ষুব্ধ ছিল। তারা উনার নামে অপবাদ দেয়া শুরু করে যে সুলাইমান আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যকে নিষেধ করলে কী হবে, নিজেই এই কাজ করে জ্বীনদেরকে বশীভূত করেন ও তাদের দিয়ে নানারকম কাজ করিয়ে নেন। কেউ যেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত না হতে পারে সেজন্যই তিনি আসলে জোরপূর্বক এই কাজগুলো বন্ধ করিয়েছেন (আস্তাগফিরুল্লাহ)। আল্লাহ্‌ যে বিশেষভাবে উনাকে এই ক্ষমতা দিয়েছেন এবং উনি যা কিছু করেন সবই যে আল্লাহর অনুমতিক্রমে সেটা তারা বিশ্বাস করতে চাইতো না। মোটকথা হচ্ছে যাদু ও আল্লাহর মুযিজার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে তারা অপরাগ ছিল……

এখানে উল্লেখ্য যে মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে যাদুকররা উনার মুযিজা দেখার সাথে সাথে ঈমান এনেছিল কারণ এ ফিল্ডে তাদের অসামান্য পারদর্শীতা ছিল এবং সেই জ্ঞান দিয়ে তারা বুঝতে পেরেছিল যে এটা মুযিজা, যাদু নয়। এই জ্ঞান বনী ইসরাইলীয়দের ছিলো না। তাই আল্লাহ্‌ সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি তাদেরকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিবেন যাতে তারা যাদু ও মুযিজার মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারে। এই উদ্দেশ্যে তিনি হারুত ও মারুত নামে দুইজন ফেরেশতাকে পাঠালেন যারা মানুষকে এটা শেখানোর আগেই বলে নিত যে এটা তোমাদের জন্য পরীক্ষা। আমরা তোমাদেরকে এটা শিখাচ্ছি, কিন্তু যদি তোমরা এটা প্রয়োগ করো তবে তা তোমাদের ইসলামের বাইরে নিয়ে যাবে……

এই ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানা থাকা সত্ত্বেও তাদের মাঝে কেউ কেউ সেটা ঠিকই প্রয়োগ করা শুরু করলো। এই ঘটনাটা সম্পর্কে কুরআন আমাদের জানাচ্ছে উপরের আয়াত দুটোতে।

যাদেরকে যাদুবিদ্যা শিখানো হয়েছিলো, তাদের একটি অংশ কুফরি জেনেও এটা নিজেদের মাঝে প্রয়োগ করা শুরু করেই ক্ষান্ত হয় নি, এটাকে তাদের ধর্মের অংশ বানিয়ে ফেলেছিলো, ঠিক এখন যেমন কুফরি কালামের অধিকাংশই হয় এক শ্রেণীর হুজুরদের দ্বারা। ইহুদী ধর্মের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকা জ্ঞানের এই শাখা মূলত Qabbalah নামে পরিচিত। আপনি যদি এই নাম লিখে সার্চ দেন গুগলে তাহলে দেখবেন যে এটা একধরণের Mystic Branch. এর মূল থিম হচ্ছে সংখ্যাতত্ত্ব যা দিয়ে নানা ধরণের যাদুবিদ্যা চর্চা করা হয়…

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এই সংখ্যাতত্ত্বের ব্যাপারটা খুব সূক্ষ্মভাবে ইসলাম ধর্মের মাঝেও প্রবেশ করেছে। আমাদের অনেকের হয়তো মনে আছে যে ছোটবেলায় আমাদের মুরুব্বীরা চিঠির উপরে লিখতেন ৭৮৬, যেটার অর্থ নাকি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আমি প্রথম যখন ছোটবেলায় এটা শুনেছিলাম খুব অবাক হয়েছিলাম যে ৭৮৬ র মানে এটা হয় কিভাবে! আসলে এটার উৎস হচ্ছে এই সংখ্যাতত্ত্বের শাস্ত্র যেখানে একেকটি আরবী শব্দের বিপরীতে একেকটি সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। যেহেতু কোন সংখ্যার বিপরীতে কোন শব্দ আছে তা সাধারণ জনগণের জানার কোনো উপায় নেই, তাই এর মাধ্যমে মানুষকে ইচ্ছামত বোকা বানানোর সুযোগ থেকে যায়। তাই দেখা যায় আল্লাহর কালাম লেখা আছে ভেবে অনেকে যে তাবিজগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলোতে আসলে এসব শয়তানী বিদ্যার সূত্র লেখা হয়, কিন্তু বলা হয় যে এগুলো বিভিন্ন সূরার প্রতীক! আপনি যদি কখনো কোনো তাবিজ আসলে খুলে দেখেন তাহলে দেখবেন যে সেখানে মোটেও আরবীতে কুরআন লেখা নেই বরং দুর্বোধ্য কিছু নকশা লেখা আছে। আদতে সেগুলোর মাধ্যমে কোনো শয়তানের আশ্রয় চাওয়া হয় বা শয়তানের ইবাদাত করা হয়! একবার রুকিয়ার (শরীয়াত সম্মতভাবে জ্বীন তাড়ানোর উপায়) উপর একটা কোর্স করেছিলাম, তখন শিক্ষক উপস্থিত দর্শকদের বললেন কারো সাথে যদি তাবিজ থেকে থাকে তবে সাথে সাথে যেন তা খুলে ফেলা হয় কারণ তা সন্দেহাতীতভাবে শিরক। তারপর বললেন যে সবাই যেন সেগুলো তার কাছে এসে জমা দেয়। জমাকৃত তাবিজগুলো খুলে খুলে তিনি পড়ছিলেন আর আমাদের বলছিলেন যে সেখানে বিভিন্ন শয়তানের নাম লেখা আছে, তাদের স্তুতি করে তাদের সাহায্য চাওয়া হচ্ছে! অর্থাৎ আপনি যখন আপনার নিজের বা সন্তানের গায়ে তাবিজ ঝুলিয়ে দিচ্ছেন তখন আদতে আপনি তাকে আল্লাহ্‌ নয় শয়তানের ভরসায় সমর্পণ করছেন! ভাবা যায়?

পরবর্তীতে আমি নিজেও এই কাজ করেছি। আমার এক আত্মীয়ের গলা থেকে তাবিজ খুলে ভেতরের খোলসটা ভেঙ্গে তাকে দেখিয়েছি যে এখানে মোটেও সূরা ইয়াসীন লেখা নেই বরং যে নকশা দেয়া আছে সেটা আসলে শয়তানকে আশ্রয় চাওয়ার তন্ত্র মন্ত্র।

পর্ব ৫

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে অনেক কুরআন শরীফের শুরুতে কিংবা অজীফার বইগুলোতে প্রতিটা সূরার ফযীলাত ও নকশা দেয়া থাকে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে এই বিষয়গুলো অন্য সকল শিরকী ধর্মেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।সাধু সন্ন্যাসী বা মুনী ঋষিরা এইসব তন্ত্র মন্ত্র করতেন।

এগুলোর ইসলামিক ভার্সন হচ্ছে পীর ফকির যাদের আমরা আল্লাহর আউলিয়া ভেবে বিভ্রান্ত হই। আর আছেন এক শ্রেণীর হুজুর যাদের দ্বীনের জ্ঞান খুবই সামান্য, তাই অধিকাংশ সময়েই এরা এগুলো না বুঝেই দেন। আর অনেকে জানলেও মানতে চান না কারণ তাবিজ বিক্রি একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। সমস্যা হচ্ছে এগুলোর গ্রাহক কিন্তু শুধু অশিক্ষিতরা না। শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে আমি মানুষকে অবাধে তাবিজ ব্যবহার করতে দেখেছি। এর কারণের মাঝে রয়েছে খুব তুচ্ছ কারণ যেমন বাচ্চারা রাতে বিছানায় বাথরুম করে দেয় কিংবা ভয় পায়…আবার বড় বড় বিপদ থেকে উদ্ধারের আশাও রয়েছে। আমার কাছে মনে হয় যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে বিপদ আপদের সময় এগুলো না করে থাকা। অনেকে আছেন যে মুখে বলেন যে এসব তাবিজ কবজে তার বিশ্বাস নেই কিন্তু কোনো বিপদে পড়লে ঠিকই এগুলোর আশ্রয় নেন। ঈমানের পরীক্ষাটা এখানেই।

অনেকে আছেন যারা দাবী করেন যে শিরকী কিছু লেখা না থাকলে কুরআনের আয়াত দিয়ে তাবিজ দেয়া যাবে স্রেফ একটা চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে। এখানে আমাদের কয়েকটা জিনিস বুঝতে হবে-

১। তাবিজ কখনওই স্পষ্ট কুরআনের আয়াত/ আল্লাহর নাম দিয়ে দেয়া হয় না। যারা এসব সমর্থন করেন, তারাও এটা স্বীকার করেন। কারণ আমরা সবাই জানি যে কুরআনের আয়াত পবিত্র, এটা লেখা তাবিজ টয়লেট বা সব জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই তারা যেটা করেন সেটা হচ্ছে সংখ্যা তত্ত্ব ব্যবহার করেন, যেটার কথা আগে উল্লেখ করেছি। তাদের দাবী হচ্ছে এটা স্রেফ একটা সাংকেতিক কোডের মত। আমার প্রশ্ন হচ্ছে বিভিন্ন আরবী হরফের এই যে বিভিন্ন সংখ্যা আরোপ করা হচ্ছে, এটার উৎস কী?

আমরা কখনওই এটার কোনো সহীহ উৎস খুঁজে পাবো না।

২। আল্লাহ কুরআনে সুষ্পষ্ট ভাষায় বলছেন যে এটা আরবী কুরআন। আমরা যেন ভুলে না যাই যে অমুক তাবিজ পরলে অমুক উপকার হবে-এটা গায়েবের জ্ঞান। তাই কোনো নির্দিষ্ট আমল করলে কোনো উপকার হবে এটা যদি আমরা বলতে চাই, তবে সেটার উৎস অবশ্যই হতে হবে কুরআন এবং সুন্নাহ। তাই তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই তাবিজ ব্যবহার করা শিরক না, এটা নিঃসন্দেহে বিদআত কারণ এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীরা ইচ্ছাকৃতভাবে বর্জন করেছেন, মানে তাদের সামনে এটা করার সুযোগ ছিলো, কিন্তু তারা তা করেন নি।

৩। এটা সর্বাংশে এড়িয়ে চলা উচিৎ কারণ আমাদের জানা নেই যে এই সংখ্যাগুলো দিয়ে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম লেখা হচ্ছে নাকি শয়তানকে ডাকা হচ্ছে।

৪। যারা তারপরও এটার উপর অটল থাকতে চান, তাদের জন্য মনে করিয়ে দিতে চাই সূরা বাক্বারার ১০১ নং আয়াতের কথা। এখানে বলা হচ্ছে-

“যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রসূল আগমন করলেন-যিনি ঐ কিতাবের সত্যায়ন করেন, যা তাদের কাছে রয়েছে, তখন আহলে কেতাবদের একদল আল্লাহর গ্রন্থকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করল-যেন তারা জানেই না। ”(২ঃ১০১)

এখানে নিক্ষেপ করা অর্থে যে আরবী শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটার থিমটা হচ্ছে Trash করা, মানে আবর্জনা যেভাবে হেলায় ছুঁড়ে দেয় মানুষ, সেভাবে। এর ঠিক পরের আয়াতেই যাদুবিদ্যা যে কুফরী সেটা বলা হচ্ছে। মানে হচ্ছে যে মানুষ যখন আল্লাহর কিতাবকে হেলাফেলা জ্ঞান করে, তখনই তারা সেগুলোকে এভাবে শয়তানি কাজে ব্যবহার করে। আমি বহু মানুষকে দেখেছি যাদের সূরা নাস মুখস্থ, কিন্তু তারা জ্বীনের অস্তিত্বে, যাদু টোনা এগুলোতে বিশ্বাস করে না। যদি কুরআনকে জঞ্জাল হিসেবে গণ্য না করা হয়, তাছাড়া কিভাবে এটা সম্ভব হতে পারে?

আমার সীমিত অভিজ্ঞতা বলে যে যারা এগুলোর উপরে অনেক ভরসা করেন, তারা আসলে শর্টকাট খোঁজেন। তাদেরকে যদি সুন্নাত উপায়ে নিজে কুরআন/ দুআ তিলাওয়াত করতে বলা হয়, তাহলে তাদের খুবই আলসেমী লাগবে এবং তারা নানা অজুহাত খুঁজবেন। ধৈর্য্যের অভাবটাই আমার কাছে এক্ষেত্রে মুখ্য মনে হয়। সুন্নাহ পদ্ধতি ঊনাদের কাছে অনেক দীর্ঘমেয়াদী লাগে, ঊনারা চান দ্রুত সমাধান।

তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে যদি আমাদের বিস্তারিত আইডিয়া থাকে রুকিয়ার আয়াতগুলোর ব্যাপারে, মানে আমরা যদি সেগুলো বুঝে বুঝে পড়ি, তাহলে উপকার তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে ইনশাল্লাহ। আর রুকিয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটার কোনো সাইড এফেক্ট নাই। মানে আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে যাদুটোনা করা হয়েছে নাকি তাহলে প্রচলিত চিকিৎসার সাথে এগুলো পাশাপাশি চালিয়ে গেলে লাভ বৈ ক্ষতি নেই যেহেতু কুরআন শিফা।

পর্ব ৬

আজকের পর্ব থেকে আমরা চেষ্টা করবো রুকিয়াহ’র আয়াতগুলো নিয়ে একটু কথা বলতে, সেগুলো আত্মস্থ করার মানসে ইনশাল্লাহ।আমার সীমিত বুঝ মতে রুকিয়াহ’র আয়াতগুলো হয় আল্লাহর পরিচয় নিয়ে কথা বলে যাতে আমরা এক আল্লাহর উপরই ভরসা করতে পারি। না হয় জ্বীন জগত সম্পর্কে আমাদের এমন তথ্য জানায় যা জানলে আমরা আর জ্বীন সাধক বা ভণ্ড পীরদের কাছে যাবো না। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ধৈর্য্য এইসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেখা যায় ধৈর্য্যের অভাবেই আমরা তাবিজ কবজের দ্বারস্থ হই।

এখানে বলে রাখা ভালো যে রুকিয়ার আয়াত কোনগুলো সে ব্যাপারে সবসময় আমরা সুনির্দিষ্ট হাদীস পাই না। তাই এই লিস্টটা All conclusive কিছু না।

সূরা ফাতিহাঃ

একদম প্রথমেই আছে সূরা ফাতিহা। এটার মর্যাদা নিয়ে তো বলার কিছু নাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীরা স্বয়ং এটা দিয়ে রুকিয়া করেছেন। বুখারীর হাদিস থেকে আমরা তা জানতে পারি।

আবূ সাঈদ (রহ.) থেকে বর্ণিতঃ

“তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একদল সাহাবী কোন এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রে পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সে গোত্রের সরদার বিচ্ছু দ্বারা দংশিত হল। লোকেরা তার (আরোগ্যের) জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কোন উপকার হল না। তখন তাদের কেউ বলল, এ কাফেলা যারা এখানে অবতরণ করেছে তাদের কাছে তোমরা গেলে ভাল হত। সম্ভবত, তাদের কারো কাছে কিছু থাকতে পারে। ওরা তাদের নিকট গেল এবং বলল, হে যাত্রীদল! আমাদের সরদারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা সব রকমের চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারো কাছে কিছু আছে কি? তাদের (সাহাবীদের) একজন বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম আমি ঝাড়-ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারী কামনা করেছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাদের জন্য মেহমানদারী করনি। কাজেই আমি তোমাদের ঝাড়-ফুঁক করব না, যে পর্যন্ত না তোমরা আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ কর। তখন তারা এক পাল বকরীর শর্তে তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হল। তারপর তিনি গিয়ে الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ “আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন” (সূরা ফাতিহা)পড়ে তার উপর ফুঁ দিতে লাগলেন। ফলে সে (এমনভাবে নিরাময় হল) যেন বন্ধন হতে মুক্ত হল এবং সে এমনভাবে চলতে ফিরতে লাগল যেন তার কোন কষ্টই ছিল না। (বর্ণনাকারী বলেন,) তারপর তারা তাদের স্বীকৃত পারিশ্রমিক পুরোপুরি দিয়ে দিল। সাহাবীদের কেউ কেউ বলেন, এগুলো বণ্টন কর। কিন্তু যিনি ঝাড়-ফুঁক করেছিলেন তিনি বললেন এটা করব না, যে পর্যন্ত না আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে এই ঘটনা জানাই এবং লক্ষ্য করি তিনি আমাদের কী নির্দেশ দেন। তারা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি [নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)] বলেন, তুমি কিভাবে জানলে যে, সূরা ফাতিহা একটি দু‘আ? তারপর বলেন, তোমরা ঠিকই করেছ। বণ্টন কর এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রাখ। এ বলে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাসলেন। (বুখারী পর্ব ৩৭ অধ্যায় ১৬ হাদীস নং ২২৭৬; মুসলিম ৩৯/২৩, হাঃ ২২০১)

সূরা বাকারাহ

রুকিয়ার আয়াতের লিস্টে সূরা বাক্বারার অনেকগুলো আয়াত পাওয়া যায়। পুরা সূরা বাক্বারার ফযীলাত নিয়ে নিচের হাদীস আছেঃ

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। (এগুলোতে কুরআন তিলাওয়াত করো) কারণ যেসব ঘরে সূরা আল বাকারাহ্ তিলাওয়াত করা হয় সে ঘর হতে শয়তান ভেগে যায়।” (মুসলিম ৭৮০)

সূরা বাকারাহ ১-৫ আয়াত

অর্থঃ

আলিফ লাম মীম। (1) এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য, (2) যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে (3) এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে।(4) তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথ প্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম। (5)

মূল ভাবঃ

আমার কাছে মনে হয়েছে (ভুল হলে আল্লাহ মাফ করুন) এখানে গায়েবে বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে যেটার একটা অংশ হচ্ছে জ্বীন জগতে বিশ্বাস।

কুরআনের রুকিয়াহ’র আয়াতগুলো আত্মস্থ করা
এই আয়াতদ্বয় নিয়ে আগেই বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

সূরা বাক্বারার ১৬৩-৬৪ আয়াতঃ

অর্থঃ

আর তোমাদের উপাস্য একইমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া মহা করুণাময় দয়ালু কেউ নেই। নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের বিবর্তনে এবং নদীতে নৌকাসমূহের চলাচলে মানুষের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ তা’ আলা আকাশ থেকে যে পানি নাযিল করেছেন, তদ্দ্বারা মৃত যমীনকে সজীব করে তুলেছেন এবং তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সবরকম জীব-জন্তু। আর আবহাওয়া পরিবর্তনে এবং মেঘমালার যা তাঁরই হুকুমের অধীনে আসমান ও যমীনের মাঝে বিচরণ করে, নিশ্চয়ই সে সমস্ত বিষয়ের মাঝে নিদর্শন রয়েছে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের জন্যে।

মূল ভাবঃ

আমার সীমিত বুদ্ধিতে মনে হচ্ছে এই আয়াতে আবার আল্লাহর পরিচয় দেয়া হচ্ছে। ঊনি যে আসলে সব কিছুর নিয়ন্ত্রক এটা মনে প্রাণে বিশ্বাস ও আত্মস্থ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর যখনই আমরা তা না করে তাবিজ কবজের দ্বারস্থ হবো, আমরা শিরকে লিপ্ত হবো, তাই শুরুতেই বলে দেয়া হচ্ছে যে আমাদের ইলাহ শুধু আল্লাহই।

সূরা বাক্বারার ২৫৫-৫৬ আয়াতঃ

অর্থঃ

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী ‘তাগুত’দেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন। (২ঃ২৫৫-৫৬)

মূল ভাবঃ

সূরা বাক্বারার ২৫৫ নং আয়াত আয়াতুল ক্বুরসী হিসেবেই সমধিক পরিচিত। আয়াতুল কুরসীর ফযীলতের কথা মনে হয় নতুন করে বলার কিছু নাই। এটা কুরআনের শ্রেষ্ঠতম আয়াত। বিস্তারিত জানা যাবে এখানে।

উস্তাদ নুমান আলী খান এটার ভাষাগত মিরাক্যল তুলে ধরেছেন, যেটা জানা যাবে এখান থেকে।

আয়াতুল কুরসীতে অবশ্যই আল্লাহর পরিচয় দেয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠতম ভাষাশৈলী দিয়ে। এটাকে নিজে পড়ে, অনুধাবন করে তারপর আমল করলে তবেই ফল পাওয়া যাবে ইনশাল্লাহ। আমরা অনেক সময় স্রেফ বাড়িতে ঝুলায় রাখি বা গাড়িতে। ভাবি যে এটার লেখাটা আমাদের রক্ষা করবে। আলিমরা অধিকাংশ সময়েই এগুলোকে নিরুৎসাহিত করেন কারণ কুরআন একারণে নাযিল হয় নি।
২৫৫ আয়াতের পরই ২৫৬ আয়াতের বিষইয়বস্তুটা কিন্তু খুব interesting. আল্লাহকে ছাড়া আমরা যখনই অন্য কারো দ্বারস্থ হব বিপদ আপদ থেকে মুক্তির আশায়- তাবিজ কবজ, জ্বীন সাধক, পীর বাবা ইত্যাদি, তখনই আমরা হিদায়াতের পথ থেকে পৃথক হয়ে যাবো ও তাগুদের অনুসারী হয়ে যাবো।
আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সেই সুদৃঢ় হাতল ধরে থাকার তৌফিক দিন, যেটার কথা এখানে বলা হয়েছে, আমীন।


লেখাটি শেয়ার করতে পারেন