কুরআনে উল্লেখিত নবী-রাসূলদের দুআ

লেখাটি শেয়ার করতে পারেন

আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) এর  দুআ

তারা বলল,  “হে আমাদের রব। আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন তবে আমরা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব।” ( সুরা আরাফ :২৩)

দুআ’র প্রেক্ষাপট

আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) যখন জান্নাতে ছিলেন তখন মহান আল্লাহ তাআলা তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন । কিন্তু ইবলিশের প্ররোচনায় তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে উক্ত বৃক্ষের ফল খেয়ে ফেলেন। এরপর তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে উক্ত দুআটি করেন। 

দুআ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা 

১. নিজের দোষের দায় স্বীকার করে নিতে হবে- আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) তাদের নিজেদের কৃত ভুলের জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ করেননি। কোনো অজুহাতও দেখাননি। মানব চরিত্রের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, সে সজ্ঞানে কোনো অন্যায় করে ফেললেও তার দায়িত্ব অনেক সময় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:)  তা না করে নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন।

২. দোষ স্বীকার করার পর মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে– মানুষ মাত্রই ভুল করবে, গুনাহ করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষের গুনাহর চেয়ে আল্লাহর ক্ষমাশীলতা বহুগুণ বেশি। তাই তার কাছে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। তার ক্ষমা প্রাপ্ত হলেই কেবল আমরা ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পাবো। 

নূহ (আ:) এর দুআ 

 “হে আমার পালনকর্তা ! যা আমার জানা নেই এমন কোনো দরখাস্ত করা হতে আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের দলে সামিল হবো।” (সুরা হূদ :৪৭)

দুআ’র প্রেক্ষাপট

মহান আল্লাহ তাআলা যখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে নূহ (আ:) এর সম্প্রদায়কে মহাপ্লাবন দ্বারা ধ্বংস করে দেবেন তখন তিনি নূহ (আ:) কে নির্দেশ দিলেন একটি নৌকা তৈরি করে তাতে ঈমানদার নারী, পুরুষ এবং বন্যপ্রাণী, গৃহপালিত প্রাণী এবং পাখিদের এক জোড়া করে তুলে নিতে। আল্লাহ তায়ালা নূহ (আ:) কে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদেরকে সুরক্ষিত রাখা হবে।

নূহ (আ) এর এক পুত্র নৌকাতে উঠল না বরং সে কাফেরদের সাথে থাকাকেই পছন্দ করলো। চোখের সামনে নিজ সন্তান প্লাবনে ডুবে যাবে এটা মানতে না পেরে নুহ (আ:) আল্লাহর কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন –

“ হে রব! আমার পুত্র তো আমার পরিজনদের অন্তর্ভুক্ত আর আপনার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য এবং আপনি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিচারক ।” (সূরা হুদ: ৪৫)

তাঁর এই আবেদনের প্রত্যুত্তরে আল্লাহ বলেন – 

“ হে নূহ! নিশ্চয়ই সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়, নিশ্চয়ই সে দুরাচার, তাই আমার কাছে এমন দরখাস্ত করবে না যার খবর তুমি জানোনা । আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে তুমি অজ্ঞদের দলভুক্ত হয়ো না।” (সুরা হূদ :৪৬)

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিলেন যে, যারা ঈমানের বদলে কুফরি ও শিরক বেছে নেয় তারা নিজের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় হলেও তাদের শাস্তি রহিত করার জন্য অনুরোধ করা যাবে না। 

নুহ (আ:) তখন আল্লাহর সিদ্ধান্তের তাৎপর্য বুঝতে পারেন এবং নিজের ভুল স্বীকার করে উপরোক্ত দুআ করেন ।

দুআ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা 

১) যে বিষয়ে আমাদের সুস্পষ্ট জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তকেই মেনে নিতে হবে।

 আমাদের মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক। মানুষ হিসেবে আমরা অনেক সময় রক্ত, আত্মীয়তা, বন্ধুত্বের সম্পর্কের কারণে আবেগতাড়িত হয়ে যাই। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা  এই সবধরনের দুর্বলতার ঊর্ধ্বে। তিনি যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তার পেছনে সুনির্দিষ্ট হিকমাহ থাকে। যা আমরা অনেক সময় অনুধাবন করতে পারিনা। তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের আল্লাহ সিদ্ধান্তকে নি:সংশয়ে মেনে নিতে হবে। 

২) মানুষ হিসেবে আবেগতাড়িত হয়ে আল্লাহর কোন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে  যদি আমাদের মনে কোনো প্রশ্ন এসেও থাকে তবে সেটাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তৎক্ষণাৎ আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। 

নবী, রাসুলরা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া সত্ত্বেও তারা জানতেন যে আল্লাহর ক্ষমা ছাড়া তারাও ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাবেন না। 

আইয়ুব (আ) এর দুআ

“ যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহবান করে বলেন, আমি দুঃখ- কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও শ্রেষ্ঠ দয়াবান।” (সূরা আম্বিয়া :৮৩)

দুআ’র প্রেক্ষাপট 

নবী আইয়ুব (আ:) ছিলেন আল্লাহর একজন পরহেজগার বান্দা, যাকে আল্লাহ বিপুল সম্পদ দান করেছিলেন। তাঁর ছিল জমি, গবাদি পশু, দাস- দাসী এবং অনুগত পরিবার। এসব নিয়ামতের জন্য তিনি সর্বদা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁকে নানা ধরনের বিপর্যয় দিয়ে পরীক্ষা করা শুরু করলেন। প্রথমে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পদ হারালেন , এরপর সন্তানদের হারালেন। সবশেষে কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন, যে রোগের চিকিৎসা তখন সহজলভ্য ছিল না । তাঁর এই রোগ অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় তাঁকে শহর থেকে বের করে দেওয়া হলো। একমাত্র স্ত্রী ছিলেন তাঁর নিত্য সঙ্গী। এক পর্যায়ে আইয়ুব (আ:) স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এভাবে বছরের পর বছর চলতে থাকে । দীর্ঘ সময় অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করার পর একসময় আইয়ুব (আ:)  আল্লাহর কাছে উপরোক্ত দুআ  করেন। 

দুআ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা 

১) সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করতে হবে।

 এই দুআতে আইয়ুব (আ:) যে শব্দ চয়ন করেছেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর। সন্তান, সম্পদ, স্বাস্থ্য- সবকিছু হারানো নিঃস্ব একজন ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কোনো রকম অভিযোগ করেননি,সবকিছু হারানোর জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করেননি বরং এত কিছুর পরও তিনি তাঁর প্রভুকে ‘ শ্রেষ্ঠ দয়াবান’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন।

 একজন বান্দা তাঁর রবের প্রতি কতোটা সুধারণা পোষণ করলে সর্বস্বান্ত অবস্থায়ও তাঁর প্রশংসা করতে পারেন, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ এই দুআ।

২) আল্লাহর সাথে আত্মিক বন্ধন দৃঢ় হলে সবসময় মৌখিক আবেদনের প্রয়োজন হয় না।

এই দুআর কোথাও আইয়ুব (আ:) তাঁর রোগ মুক্তির জন্য সরাসরি আকুতি প্রকাশ করেননি এমনকি তাঁর সন্তান, সম্পদ ফিরে পাওয়ার জন্য একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তারপরও আল্লাহ তাঁর মনের অবস্থা বুঝে নিয়ে তাঁর দুআ কবুল করেছেন। তাঁকে সুস্থ করে দিয়েছেন, তাঁর সম্পদ, সন্তান সব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

বস্তুত: আল্লাহর সাথে যখন বান্দার আত্মিক বন্ধন দৃঢ় হয়ে যায় তখন বান্দার সব চাওয়ার কথা মুখ ফুটে বলতে হয় না, শুধু নিজের বর্তমান অবস্থার কথা প্রকাশ করলে এবং তাতে সন্তুষ্ট থেকে সবর করলেই মহান আল্লাহ বান্দার জন্য কল্যাণকর সময়ে তার সমস্যার সমাধান করে দেন। 

সুলাইমান(আ:) এর দুআ

“হে আমার পালনকর্তা ! আপনি আমাকে সামর্থ্য দেন যেন আপনি আমাকে ও আমার পিতা মাতাকে যে নিয়ামত দান করেছেন তার শুকরিয়া আদায় করতে পারি। যেন আমি আপনার পছন্দনীয় সৎ কাজ করতে পারি । 

হে আমার প্রতিপালক!! আমাকে আপনি আপনার নিজ অনুগ্রহে আপনার সৎ ইবাদতগুজার বান্দাদের মাঝে শামিল করুন। ”(সুরা নমল, ২৭:১৯)

দুয়ার প্রেক্ষাপট 

সুলাইমান (আ:) কে আল্লাহ এমন এক রাজত্ব দান করেন যা তার আগের বা পরের কোনো নবী ও রাসুল কে দেওয়া হয়নি। মানুষ ছাড়াও পশু, পাখি, মেঘ, বাতাস এমনকি জ্বীনদের কেও তার অধীনস্থ করে দেওয়া হয়। পশু -পাখিদের ভাষা বোঝার ক্ষমতাও তাকে দান করা হয়। 

একদিন তিনি জ্বীন, মানুষ ও পাখিদের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে একটি উপত্যকা অতিক্রম করছিলেন। সেখানে ছিল পিঁপড়াদের বাসা। একটি পিঁপড়া এই সেনাদলের আগমন টের পেয়ে তার নিজ সম্প্রদায়কে সতর্ক করে নিরাপদ আশ্রয়ের সরে যাওয়া নির্দেশ দেয়। এই ঘটনার ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে,

” যখন তারা পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছায় তখন এক পিপীলিকা বলল, হে পিপীলিকার দল !তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ করো অন্যথায় সুলাইমান ও তার বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদের পিষ্ট করবে ।”

সুলাইমান (আ:) ঐ পিঁপড়ার ভাষা বুঝতে পারেন এবং তার সৈন্যবাহিনীকে দিক পরিবর্তনের আদেশ দেন। এরপর তিনি উপরোক্ত দোয়া করেন।

দুআ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা 

১) নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে হবে।

সুলাইমান (আ:) কে আল্লাহ যে বিশাল সাম্রাজ্য দান করেছিলেন তাতে তার পক্ষে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে অকৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন আল্লাহ যেন তাকে শুকরিয়া আদায়কারী বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করেন।

 সুলাইমান (আ:) এর পিতা দাউদ (আ:) ও ছিলেন একজন নবী ও রাজা। পিতার কাছ থেকে তিনি হিকমাহ ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে রাজ্য শাসন করার প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন ।এরকম প্রজ্ঞাবান অভিভাবক পাওয়াও আল্লাহর একটা রহমত। তাই তিনি তার নিজের এবং পিতা-মাতার প্রতি আল্লাহ যে নিয়ামত দান করেছিলেন তার শুকরিয়া আদায় করার তৌফিক দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন ।

২) সৎ কাজ করার তৌফিক অর্জনের জন্য দুয়া করতে হবে।

মানুষ যখন ক্ষমতা ও কৃতিত্ব লাভ করে তখন তার মধ্যে দুর্নীতির মাধ্যমে আরো সম্পদশালী হওয়া কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করার প্রবণতা দেখা দেয়। সুলাইমান (আ:) এই বিষয়টি উপলব্ধি করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যেন রাজত্ব ও ক্ষমতা পাওয়া সত্ত্বেও তিনি সৎকাজ করা থেকে গাফেল না হন বরং এই ক্ষমতা ও কৃতিত্বকে তিনি আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে নিয়োগ করতে পারেন। 

৩) সৎ কাজ কবুল হওয়ার জন্য দুয়া করতে হবে।

মানুষ যতই ভালো কাজ করুক না কেন মহান আল্লাহ যদি তার অনুগ্রহে সেগুলো কবুল করে না নেন তবে সেগুলো বৃথা হয়ে যাবে। তাই মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে হবে আল্লাহ যেন আমাদের ভালো কাজগুলোকে কবুল করে আমাদেরকে তার সৎকর্মশীল প্রিয় বান্দাদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।

ইউনুস আলাইহিস সালামের দোয়া 

 “আর স্মরণ করুন যুন নুনকে যখন তিনি ক্রোধ ঘরে চলে গিয়েছিলেন, অতঃপর মনে করেছিলেন যে আমরা তাকে পাকড়াও করবো না। তারপর তিনি অন্ধকারে আহ্বান করেছিলেন যে আপনি ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, আপনি কতই না পবিত্র ও মহান! নিশ্চয়ই আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি।”

দুয়ার প্রেক্ষাপট 

ইউনুস (আ:) কে মুসেলের একটি জনপদ নায়ুনয়ার অধিবাসীদের হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি তাদেরকে ঈমানের দাওয়াত দিলে তারা অবাধ্যতা প্রদর্শন করে। তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি তাদের আজাবের ভয় দেখিয়ে ঐ জনপদ ত্যাগ করেন। 

তিনি একটি নৌকায় আরোহন করে ভিনদেশে হিজরত করার ইচ্ছায় সফর শুরু করলেন । ঘটনাক্রমে নৌকাটি  ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলো এবং মাঝিরা বললো যে, আরোহীদের মধ্য থেকে একজনকে নদীতে ফেলে দিতে হবে, তাহলে অন্যরা ডুবে মরার কবল থেকে রক্ষা পাবে।

 এবার কাকে ফেলে দেওয়া হবে তা নিয়ে লটারি করা হলে ইউনুস (আ:) এর নাম আসলো। তিনি এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিলেন। এদিকে আল্লাহর নির্দেশে একটি মাছ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং ইউনুস (আ:) কে গিলে ফেলে। আল্লাহ তায়ালা মাছকে নির্দেশ দেন যেন ইউনুস (আ:) এর অস্থি-মাংসের কোনো ক্ষতি না হয়।

মাছের পেটে অবস্থানকালে ইউনুস (আ:) অনুধাবন করেন, আল্লাহ’র সুস্পষ্ট নির্দেশ ছাড়াই নিজ সম্প্রদায়কে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি আল্লাহর অবাধ্যতা করেছেন। তাই নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি আল্লাহর কাছে এই দুআ করেন।

দুয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা 

১) অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন আল্লাহর ক্ষমাশীলতা তার চেয়েও বৃহৎ- এই বিশ্বাস রাখতে হবে। 

আমরা যখন কোনো বড় পাপ করে ফেলি তখন শয়তান আমাদের এই ওয়াসওয়াসা দেওয়া শুরু করে যে, আমরা হয়তো আর আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই। এই হতাশা থেকে আমরা অনেক সময় আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমাদের পাপের চেয়ে আল্লাহর ক্ষমাশীলতা অনেক বৃহত্তর। তাই অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন আল্লাহর ক্ষমাশীলতার ওপর ভরসা রেখে তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

২) সমস্যা যতই গভীর হোক না কেন আল্লাহর পক্ষে তার সমাধান করা অসম্ভব নয়- এই সুধারণা রাখতে হবে। 

 আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে মাছের পেটে বেশিদিন বেঁচে থাকা কিংবা এই অবস্থা থেকে জীবিত বের হওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ইউনুস (আ:) এই অসম্ভব পরিস্থিতিতেও আশাহত হননি বরং  তিনি আল্লাহর কাছে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দোয়া করেছেন।

পার্থিব জীবনে আমাদেরকেও এমন অনেক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় যখন মনে হয় এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় হয়তো নেই। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ চাইলে যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারেন। তাই সমস্যা যতই গভীর হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তার সমাধান আছে— এই বিশ্বাস নিয়ে দুয়া করে যেতে হবে । তিনি হয়তো এমন কোনো উপায়ে সমস্যার সমাধান করে করে দেবেন– যা আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল।

মুসা (আ:) এর দুয়া 

 “হে আমার পালনকর্তা !! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে এবং আমার পরিবার বর্গের মধ্য থেকে আমাকে একজন সাহায্যকারী দিন। আমার ভাই হারূন দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন এবং তাকে আমার কাজে অংশীদার করুন, যাতে আমরা বেশি করে আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারি এবং বেশি পরিমাণে আপনাকে স্মরণ করতে পারি।” (সুরা ত্বোয়াহা:২৫–৩৪)

দুয়ার প্রেক্ষাপট 

 মুসা (আ:) যখন আল্লাহর কালাম লাভের গৌরব অর্জন করলেন এবং নবুয়ত ও রিসালাতের দায়িত্ব লাভ করলেন তখন তিনি নিজ স্বত্তা ও শক্তির উপর ভরসা না করে এই দায়িত্ব পালনের জন্য স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার দারস্থ হলেন। কারণ আল্লাহ তাকে এমন একজনকে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্ব অর্পন করেছেন যিনি তৎকালীন সময়ে জমিনের বুকে সবচেয়ে বেশি অহংকারী ও দাম্ভিক ছিলেন। বহু বছর ধরে রাজত্ব করতে করতে ক্ষমতার দম্ভে সে এতটাই অহংকারী হয়ে গিয়েছিল যে, নিজেকে ইলাহ দাবি করা শুরু করেছিল।

এমন একজন ব্যক্তিকে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়া সহজ কোনো ব্যাপার নয়। তাছাড়া এই ফেরাউনের গৃহে তিনি ছোটবেলা থেকে লালিত পালিত হয়েছিলেন। তার সম্প্রদায়ের একজনকে হত্যা করে তিনি অপরাধী হিসেবে পলায়ন করেছিলেন। তাই এত বছর পর ফিরে এসে ফিরাউনকে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিষয়ে ধারণা দেওয়া, যা তার একচ্ছত্র কৃতিত্বকে চ্যালেঞ্জ করবে– নিঃসন্দেহে কঠিন একটি ব্যাপার।

 তাই এই গুরু দায়িত্ব পালনে যাওয়ার আগে মহান আল্লাহর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য চেয়ে তিনি উপরোক্ত দুয়াটি করেছিলেন।

দুয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা 

১) দাওয়াতী কাজ শুরুর পূর্বে তার সহজতার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া

মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো নি:সন্দেহে একটি কঠিন কাজ। এই কাজ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের আত্মিক গুণাবলীর প্রয়োজন হয়। যেমন- মানুষের কাছে এই স্পর্শকাতর বিষয় উপস্থাপন করার মতো নি:সংকোচতা, প্রতিপক্ষ যদি অপমানজনক কথা বলে বিব্রত করতে চায় তবে সেটা সহ্য করার দৃঢ় মানসিকতা , একাধিকবারের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলেও আশাহত না হয়ে দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো ধৈর্য্য প্রভৃতি।

 তাই এই কঠিন কাজ শুরুর পূর্বে আমাদেরও মূসা (আ:) এর মতো হদয়ের দৃঢ়তা বৃদ্ধি ও কাজের সহজতার জন্য আল্লাহর কাছেই সাহায্য করতে হবে।

২) নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা ও তা জয় করার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।

রিসালাত ও তাওহীদের দাওয়াত দেয়ার জন্য স্পষ্টভাষী ও বিশুদ্ধভাষী হওয়া জরুরি একটি বিষয়। মুসা (আ:) জানতেন তার জিহ্বায় জড়তার সমস্যা আছে ।তাই তিনি এই সমস্যা দূর করার জন্য আল্লাহর কাছে দুয়া করেছেন। 

প্রতিটি মানুষেরই কোনো না কোনো বিষয়ে অসম্পূর্ণতা থাকে। নিজের এই সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে হীনমন্যতায় না ভুগে তাকে জয় করার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে, নি:সন্দেহে তিনি বান্দার যে কোনো অসম্পূর্ণতা দূর করতে সক্ষম। 

৩) গুরুত্বপূর্ণ কাজে যোগ্য সাহায্যকারী নির্বাচনের ব্যাপারে বিচক্ষণ হওয়া।

অনেক সময় অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজ আমাদের একার পক্ষে করা সম্ভব হয় না, সাহায্যকারী প্রয়োজন হয়। মুসা (আ:) এই দুয়াতে তার সাহায্যকারী হিসেবে তার আপন ভাই হারুন (আ:) কে মনোনীত করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দুয়া করেছেন।

 সাধারণত নিজের পরিবারের সদস্যদের সাথে আমাদের বোঝাপড়া ভালো হয়। তারা আমাদের স্ট্রেন্থ এবং উইকনেস সম্পর্কে অবগত থাকে। তাই গুরুত্বপূর্ণ কাজে তারা যদি আমাদের সহযোগী হয় , তবে আমাদের শক্তিমত্তা বৃদ্ধি পায় এবং আস্থা ও ভরসার একটা জায়গা তৈরি হয়, যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা অনেক কার্যকরী হয়।

 মুসা (আ:) এর এই দুয়া থেকে আমরা যোগ্য সাহায্যকারী নির্বাচনের ব্যাপারে বিচক্ষণ হওয়ার শিক্ষা পাই।

ইউসুফ আলাইহিস সালামের দুয়া

”হে পালনকর্তা !! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছেন এবং বিভিন্ন জিনিসের তাৎপর্যসহ ব্যখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়েছেন। হে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এর স্রষ্টা !! আপনি আমার অভিভাবক ইহকাল ও পরকালে। আমাকে ইসলামের ওপর মৃত্যুদান করুন এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করুন।” (সূরা ইউসুফ ১০১) 

দুয়ার প্রেক্ষাপট 

কিশোর বয়সী ইউসুফ আলাইহিস সালাম মিশরে এসেছিলেন দাস হিসেবে। এরপর মিশরের তৎকালীন আজিজ তাকে ক্রয় করে নিজগৃহে প্রতিপালন করেন। যৌবনে পদার্পণ করার পর নারীঘটিত কেলেঙ্কারির মিথ্যা অভিযোগে তাকে জেলে যেতে হয়। বেশ কয়েক বছর কয়েদী জীবন-যাপনের পর আজিজের দেখা একটি স্বপ্নের অর্থবহ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জেলখানা থেকে মুক্তি পান। এরপর মিশন এর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং ক্রমান্বয়ে নিজেকে রাষ্ট্রের একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত করেন। এক পর্যায়ে তিনি তার পিতা,মাতা, ভাইসহ পুরো পরিবারকে মিশরে নিয়ে আসেন। দীর্ঘ বছর পর পুরো পরিবারের পুনর্মিলন ঘটে। এই সময় ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার জীবনের নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করে উপরোক্ত দুয়া করেন।

দুয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা 

১) জীবনের আনন্দঘন মুহূর্তেও স্রষ্টাকে ভুলে না গিয়ে এইসব প্রাপ্তিগুলো যে স্রষ্টারই প্রদত্ত নেয়ামত তা স্মরণ করতে হবে।

রাষ্ট্রক্ষমতা প্রদানের মালিক আল্লাহ, যে কোরনা বিষয় ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাও আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত। নিজ পরিবার, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গ উপভোগ করার সৌভাগ্যও আল্লাহর দেয়া একটি রিজিক ।

তিনি যেমন যে কোনো সময়ে নিয়ামতগুলো ছিনিয়ে নিতে পারেন, তেমনি সেগুলো দিয়ে জীবনকে পরিপূর্ণও করতে পারেন। তাই নিঃসঙ্গতা, অসহায়ত্বয়ের সময় যেমন আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে তেমনি পরিপূর্ণতার সময়ও তার শুকরিয়া আদায় করতে হবে।

২) একজন সুযোগ্য অভিভাবকের অধীনে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। 

মানুষ যতই ক্ষমতাশালী, বিদ্বান হোক না কেন একজন সুযোগ্য অভিভাবকের অধীনে না থাকলে তার পথভ্রষ্ট হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। (বিশেষত: শয়তান যখন সর্বদাই মানুষের পদস্খলন ঘটানোর জন্য তৎপর।) আর ইহকাল ও পরকালের সৃষ্টিকর্তা, পরিচালনাকারী মহান আল্লাহর চেয়ে সুযোগ্য অভিভাবক  আর কে হতে পারে? তাই সঠিক পথে অবিচল থেকে ইহকালে সাফল্য অর্জনের জন্য মহান আল্লাহর অভিভাবকত্ব মেনে নিয়ে তার নির্দেশিত গাইডলাইন অনুযায়ী চলার দুয়া করতে হবে।

৩) ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুবরণ করার জন্য আল্লাহর কাছে তৌফিক চাইতে হবে।

 ইহকালীন জীবনে মানুষ যতই ক্ষমতাধর, সফল হোক না কেন তার সকল অর্জন ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি তার মৃত্যু ইসলামের উপর না হয়। তার সারা জীবন যেভাবেই কাটুক না কেন, মৃত্যুর পর যদি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত না হতে পারে তবে ইহকালের সব কর্মই ব্যর্থ।

তাই মৃত্যুর সময় যেন ঈমান অটুট থাকে এবং মৃত্যুর পর যেন ইহজীবনের সৎকর্মগুলো কবুল হয় সেই তৌফিক অর্জনের দুয়া করতে হবে।

ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর দোয়া 

 “হে আমাদের পালনকর্তা!! আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় আবাদ করেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! যাতে তারা সালাত কায়েম রাখে। অতঃপর আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন এবং তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রিজিক দান করুন। সম্ভবত তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।” (সুরা ইব্রাহিম ১৪: ৩৭)

দুয়ার প্রেক্ষাপট

ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম যখন তাঁর প্রথম সন্তান ইসমাইল ও তার মা হাজেরাকে মহান আল্লাহর নির্দেশে নির্জন মরুপ্রান্ত রেখে চলে যান তখন তিনি তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে যাওয়ার পর এই দুয়া করেন। তার এই দুয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে সেখানে জমজম কূপের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয় এবং এই কূপকে ঘিরে জনবসতি করে ওঠে।

দুয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

১) সন্তানদের ক্ষেত্রে দুনিয়াবী রিজিকের পরিবর্তে দ্বীনকে প্রাধান্য দিতে হবে। 

ইব্রাহিম আলাই সালাম তার সন্তানকে এমন এক জায়গায় রেখে গিয়েছিলেন যেখানে পরিবেশ ছিল প্রতিকূল, গাছপালা ছিল খুবই কম। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে সেখানে দুনিয়াবি রিজিকের অপ্রতুলতা ছিল। কিন্তু যেহেতু তা ছিল আল্লাহর গৃহের কাছে তাই সেখানে সালাত আদায় করা সহজতর ছিল। আর ইব্রাহিম আলাই সালাম এ বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। 

আমরা সাধারণত সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য জমি, বাড়ি, গাড়ি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এসবকে গুরুত্ব দেই। কিন্তু আমাদের উচিত আমাদের সন্তানরা যেন বংশ পরম্পরায় দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে থেকে পরকালের চিরস্থায়ী সাফল্য অর্জনে কামিয়াব হতে পারে সেই দুয়া করা।

২) সন্তানরা যেন মুসলিম উম্মাহর সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমি রাখতে পারে সে দুয়া করা। 

নবী হিসেবে ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম স্বাভাবিকভাবেই চেয়েছিলেন তার বংশধরদের দ্বারা যেন আল্লাহর অনুগত বান্দার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তার অনুসারীদের দেখে যেন অধিক সংখ্যক লোক ইসলাম পালনে উদ্বুদ্ধ হয়।

 কিন্তু তিনি এটাও জানতেন যে, হিদায়াত একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। আল্লাহই একমাত্র অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী। তাই তিনি আল্লাহর কাছে দুয়া করেছেন তিনি যেন আল্লাহর আরও বান্দাকে তার উত্তরসূরীদের সৎকর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে দেন। 

৩) কৃতজ্ঞ বান্দা হবার জন্য দুয়া করা।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হচ্ছে যে কোনো মুমিন বান্দার অন্যতম প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আল্লাহ তার নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেন। তাই ইব্রাহিম আলাইাহস সালাম বিশেষভাবে দুয়া করেছিলেন তার বংশধররা যেন সর্বাবস্থায় কৃতজ্ঞ থাকে , আল্লাহ যেন তাদেরকে সেই তৌফিক দান করেন।

রাসূল (সা:) এর দুয়া (১)

”হে আমার রব!! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করো, আখেরাতেও কল্যাণ দান করো এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।” ( সূরা বাকারা: ২০১)

দুয়ার প্রেক্ষাপট 

‎এই দুয়াটি রাসূল (সা:) নিজে নিয়মিত পড়তেন এবং অন্যান্য সাহাবীদেরও পড়ার তাগিদ দিতেন। 

এই দুয়ার প্রেক্ষাপট হজ্ব সংক্রান্ত। সূরা বাকারায় এই আয়াতের আগের ও পরের আয়াতগুলোতে হজ্ব সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করে বোঝানো হয়েছে যে, হজ্বের সাথে এই দুয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু হজ্বের সময় দুয়া সবচেয়ে বেশি এই দোয়া কবুল হয় তাই হজ্বের সময় এই দুয়া বেশি বেশি পড়ার ফজিলত রয়েছে। 

জাহেলী যুগে হজ্বের সময় মানুষ হজ্বের আনুষ্ঠানিকতার শেষ করার পর নিজেদের পূর্বপুরুষদের কথা স্মরণ করতো। এছাড়া তারা দুনিয়াবী সাফল্যের জন্যও দুয়া করতো। তাদের বর্ণনা দিয়ে সুরা বাকারার ২০০ নং আয়াতে বলা হয়েছে –

‎”অতঃপর যখন হজ্বের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ফেলবে তখন স্মরণ করবে আল্লাহকে, যেমন করে তোমরা স্মরণ করতে নিজেদের বাপ-দাদাদের বরং তার চেয়েও বেশি স্মরণ করবে।

‎তারপর অনেকে তো বলে -পরওয়ারদেগার। আমাদের দুনিয়াতে দান করো অথচ তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই।”

 এভাবে শুধু একমুখী দুয়াকারীদের সমালোচনা করে কিভাবে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের জন্যই দুয়া করতে হবে তার দিকনির্দেশনা দিয়ে পরবর্তী আয়াত (২০১ নং) নাযিল হয়েছে।

দুয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা 

এই দুয়ার কাঠামো আমাদের শিক্ষা দেয় দুনিয়া নিয়ে কতটুকু ব্যস্ত থাকা উচিত আর আখিরাত নিয়ে কতটুকু ভাবা উচিত ।

‎‎প্রথমত: আমাদের দুয়ার এক- তৃতীয়াংশ হওয়া উচিত দুনিয়াকে কেন্দ্র করে। দুনিয়ার সুখ-শান্তি ও কল্যাণের জন্য দুয়া করায় দোষের কিছু নেই, দুনিয়া নিয়ে দোয়া করলে অপরাধবোধ এ ভোগারও দরকার নেই। তবে দুনিয়া কেন্দ্রিক দুয়াই আমাদের দুয়ার প্রধান অংশ হবে না বরং তা হবে সমগ্র দুয়ার তিন ভাগের এক ভাগ ।

‎

‎আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দুনিয়াসংক্রান্ত সেসব ব্যপারেই দুয়া করতে হবে যা আমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যেগুলোর উপর মহান আল্লাহও সন্তুষ্ট। উপরোক্ত দুয়ায় যে ’হাসানা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তার অর্থ হলো- পবিত্র, বৈধ, উপকারী প্রভৃতি। যেমন- হালাল ইনকাম সুস্বাস্থ্য সুসন্তান নেককার জীবনসঙ্গী প্রভৃতি। 

‎মনে রাখতে হবে, বান্দার কাছে আপাত দৃষ্টিতে আকাঙ্ক্ষিত দুনিয়াবী অনেক বিষয়ে আখেরে তার জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে ।এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন। তাই দুয়া করার সময় আমাদের জন্য যা কল্যাণকর তা-ই চাইতে হবে বাকিটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে।

 দ্বিতীয়ত আমাদের দুয়ার দুই- তৃতীয়াংশ হওয়া উচিত দুনিয়া -পরবর্তী জীবনকে কেন্দ্র করে। 

দুনিয়া পরবর্তী জীবনের দুটি অংশ রয়েছে। একটি হলো আখিরাতের কল্যাণ, আরেকটি হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি। 

আখিরাতের কল্যাণের সূচনা হয় কবরের যাত্রা থেকে। কবরের হাসানা- যেমন মুনকার নাকিরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারা, হাশরের মাঠে হাসানা- যেমন সেদিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকতে পারা, হাউজে কাউসারের পানি পান করতে পারা, ডান হাতে আমলনামা গ্রহণ করতে পারা, পুলসিরাত অতিক্রম করতে পারা এবং চিরস্থায়ী গন্তব্য হিসেবে জান্নাত লাভ করা—- এসব কিছুই আখিরাতের হাসানার অন্তর্ভুক্ত।

পবিত্র কুরআনে জান্নাতের যে নামগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো ’হুসনাহ’, যা আরবি শব্দ হাসান আর একটি প্রতিশব্দ।

‎এ থেকে বোঝা যায়, আখিরাতের হাসানার প্রধানতম লক্ষ্য হলো জান্নাত লাভ, তাই এজন্য দুয়া করতে হবে। 

তৃতীয়ত জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিশেষভাবে দুয়া করতে হবে। 

‎অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে, জান্নাত প্রাপ্তির জন্য দুয়া করার পর আবার আলাদাভাবে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য দুয়া করার যৌক্তিকতা কি? 

এর উত্তর হলো, এমন কিছু জান্নাতবাসী বান্দা থাকবে যারা জান্নাতে যাবে ঠিকই তবে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার পর। তারা দুনিয়াতে ঈমান এনেছিল, নামাজ, রোজা সহ অন্যান্য ইবাদত করেছিল কিন্তু একই সাথে প্রচুর পাপ করেছিল। এই পাপ তাদের জাহান্নামে যেতে বাধ্য করবে। পাপের শাস্তি ভোগ শেষে তারা জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

কিন্তু আমরা এই বান্দাদের দলভুক্ত হতে চাই না, তাই এজন্য দুআ করব। নিঃসন্দেহে জাহান্নামের আগুন অত্যান্ত ভয়াবহ, অল্প সময়ের জন্য হলেও তা সহ্য করা রীতিমত কষ্টকর। তাই জাহান্নামের শাস্তি থেকে পরিপূর্ণ মুক্তির জন্য দুয়া করতে হবে। 

রাসূল (সা:) এর দুয়া (২)

“হে আমার পালনকর্তা !! আমাকে দাখিল করুন সত্যরূপে এবং আমাকে বের করুন সত্যরূপে আর আমাকে নিজের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় সাহায্য দান করুন। ” (সূরা বনি ইসরাইল :৮০ )

দুয়ার প্রেক্ষাপট

ইবনে আব্বাস (রা:) এর মতে, এই দুয়া শেখানোর মাধ্যমে আল্লাহ নবীজিকে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের বিষয়ে একটি আগাম ধারণা দিয়ে রেখেছিলেন। ’সত্যরূপে দাখিল করুন’ বলতে মদিনায় সত্যনিষ্ঠ হিসেবে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। আর ’সত্যরূপে বের হওয়া’ বলতে মক্কা থেকে নিরাপদে ও সততার সাথে বের হওয়ার কথা বোঝানো হয়েছে। 

ইবনে আব্বাস (রা:) এর এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য, কেননা মদিনায় হিজরতের কয়েক মাস আগে আল্লাহ এই সূরাটি নাযিল করেছেন।

দুয়া থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা

পার্থিব জীবনে আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশ ও প্রস্থানের সম্মুখীন হতে হয়। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সামাজিক সংগঠনে, ভ্রমণে— এক কথায় জীবনের বিভিন্ন অঙ্গনে আমরা প্রবেশ করি, নির্দিষ্ট সময় অবস্থান করি আবার একসময় প্রস্থান নেই। 

এই প্রবেশ ও প্রস্থানের সময়টায় আমাদের ভাবমূর্তি যেন স্বচ্ছ, সৎ হয় সেজন্য আমাদেরকে দুয়া করতে হবে। আমরা যখন নতুন কোনো অঙ্গনে প্রবেশ করি তখন সেখানকার মানুষ আমাদের সম্পর্কে যেরূপ ধারণা পোষণ করে সেখানে তাদের সাথে সময় অতিবাহিত করার পর, আমাদের বিভিন্ন কর্মকান্ড দেখার পর আমরা চলে আসার সময় তারা যেন আমাদের সম্পর্কে সুধারনা পোষন করে সেভাবেই আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।এমনকি আমাদের প্রস্থানের পরও সেখানে যেন একটা ইতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকে তা নিশ্চিত করার জন্য সে অনুযায়ী আমল করতে হবে ।

এ ব্যাপারটি শুধু পার্থিব জীবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই দুনিয়াতে আমরা আগমন করি নিষ্পাপ অবস্থায়, পবিত্র ফিতরাত নিয়ে। দুনিয়া থেকে যখন বিদায় নিব তখনও যেন নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ অবস্থায় যেতে পারি সেজন্য মধ্যবর্তী সময়টায় সততার ওপর নিশ্চল থেকে আমল করতে হবে এবং এই তৌফিক অর্জনের জন্যও মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।


লেখাটি শেয়ার করতে পারেন