
ভূমিকা
আমি সাধারণত সোশাল মিডিয়ায় নিজের ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করি না। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, পরিবার, আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কিছু মানুষদের নিয়ে লিখি, যাদের চরিত্রের বিভিন্ন দিক গুলো আমার নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য গঠনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে আমি ইদানীং উপলব্ধি করি।
প্রতিটা মানুষই তার নিজের অজান্তেই তার পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনদের অনেক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জিনগতভাবে ধারণ করে। সেই সাথে সে তার শৈশব-কৈশোর যাদের সান্নিধ্যে কাটিয়েছে তাদের চরিত্রেরও কিছু বৈশিষ্ট্য তার নিজের চরিত্রে অনুপ্রবেশ করে, যা হয়তো সে পরবর্তী জীবনে উপলব্ধি করে।
এখন এই নিজের চরিত্রের আত্ম-বিশ্লেষণ করা নিজের আত্ম-উন্নয়নের জন্য অনেক জরুরী। কারণ আপনি যখন আইডেন্টিফাই করতে পারবেন যে, আপনার কোন স্বভাবটা আপনার কোন আত্মীয় বা পরিচিতের কাছ থেকে এসেছে তখন আপনি তার চরিত্রের বিভিন্ন দিকগুলো বিশ্লেষণ করতে পারবেন এবং দেখবেন যে তার চরিত্রের বেশ কিছু অন্ধকার দিকও রয়েছে। তখন আপনি আর সেই মানুষটাকে অন্ধভাবে অনুকরণ করবেন না বরং তার চরিত্রের যে দিকটুকু পজিটিভ সেটা নিজের মাঝে ধারণ করার চেষ্টা করবেন। এভাবে বিভিন্ন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ফিল্টার করে তাদের পজিটিভ দিকগুলোকে যদি নিজের মাঝে ধারণ করা যায় তবে নিজেকে আরও ’বেটার আমি’ তে পরিণক করা সম্ভব।
পৃথিবীতে খুব মানুষই আছে যারা তার জীবনের সবগুলো রোল এ পারফেক্ট ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই কাউকে সম্পূর্ণ অনুকরণ না করে যে যেই রোল এ বেটার পারফর্মার, তার থেকে যদি সেই বিষয়ে অনুপ্রেরণা নেয়া যায়, তবেই বিভিন্ন মানুষের থেকে পজিটিভ বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব।
ব্যপারটা অনেকটা আকাশের থেকে উদারতা, পাহাড়ের থেকে দৃঢ়তা শেখার মতো।
People who are my inspirations…..এই সিরিজে আমি তাই আমার বাস্তবজীবনের কাছের মানুষদের গল্প বলবো, যাদের চরিত্রের পজিটিভ দিকগুলো থেকে আমি পজিটিভ অনুপ্রেরণা পাওয়ার চেষ্টা করি।
পাঠকদের হয়তো মনে হতে পারে, আমার পরিচিতদের গল্প পড়ে আপনার কি লাভ? আসলে
এভাবে অন্যের চরিত্রের পজিটিভ দিকগুলোকে ফিল্টার করে নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা একটা
Good practice. আমি চাই সমালোচনা, মিম, ট্রল—এর এই যুগে পাঠকদের মধ্যে অন্যের ভালো দিকগুলোকে খুঁজে বের করার এই good practice গড়ে উঠুক।
মহান আল্লাহ যেন আমার এই প্রচেষ্টা কবুল করেন।
পর্ব – ১
আমার শৈশব-কৈশোরের দীর্ঘ সময় আমরা যে সরকারী কলোনীতে কাটিয়েছি, সেই কলোনীতে আমাদের বিল্ডিং এর ৬তলায় একজন আন্টি থাকতেন, এখানে আসার পর উনার বিয়ে হয়। বাসাটা ছিল উনার নামে, বিয়ের পরও উনার বৃদ্ধ বাবা উনাদের সাথে থাকতেন। আমরা প্রায়ই উনাকে সিঁড়ি দিয়ে উঠা-নামা করতে দেখতাম, সাদা দাঁড়ি , পাঞ্জাবী পড়া টিপিকাল বৃদ্ধ মানুষ। কলোনীতে থাকা অবস্থায়ই উনি মারা যান। তো উনি মারা যাওয়ার বেশ কিছু দিন পর একদিন আমার আব্বা একদিন আমার সেই আন্টিকে বলতেছিল, আমি কিন্তু তোমার আব্বার জন্য দুআ করি। কথাটা শুনে আমার কিশোর মনে একটু ধাক্কা লাগলো। আমি মনে মনে ভাবলাম, এই অান্টি তো আমাদের আত্মীয় না, উনার বাবাও আমাদের কেউ না, তাহলে উনার জন্য আমার আব্বার দুআ করার কি হইলো? আব্বা নিশ্চয়ই স্বান্তনা দেয়ার জন্য আন্টিকে এই কথা বলতেছে।
কিন্তু এই ঘটনার অনেক পরে আমি বুঝতে পারছি, দুআ করার এক অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে আব্বা জন্মগ্রহণ করছিলেন। তিনি প্রায়ই বিভিন্ন মানুষকে বলতেন, তোমার জন্য দুআ করি/ করবো। আমি বিশ্বাস করি, উনি সেটা করতেনও। কারণ অন্যের জন্য দুআ করার জন্য যে হৃদয়ের উদারতা দরকার, আমার আব্বার মধ্যে সেটা ছিল। আল্লাহ তাকে দুনিয়ার জীবনে অর্থ, সম্পদ, খ্যাতি দেন নাই তবে বিরাট বড় পরোপকারী একটা মন দিছিলেন। তাই তিনি কাউকে ফিনান্সিয়ালি হেল্প করতে না পারলেও তার জন্য দুআ করতেন।
আব্বা মারা যাওয়ার ১৬ বছর পরও যে স্মৃতি মনে করে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই, তাহলো ঘরের লাইট অফ করে, দরজা অর্ধেক বন্ধ করে, জায়নামাজে বসে দুই হাত তুলে , চোখ বন্ধ করে আব্বা দুআ করতেছে। আমি হয়তো কিছু বলার জন্য ঘরে গেছি, গিয়ে দেখি আব্বা এভাবে দুআ করতেছে। আমি অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে চলে আসছি, আব্বার দুঅf শেষ হয় না।
আমি জানি না, আব্বা কি এতো দুআ করতেন!! তবে আমি বিশ্বাস করি, আমরা তিন ভাই-বোন যেটুকু ভালো কাজ করি, তা আমাদের আব্বার দুআর ফসল।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আব্বার জীবদ্দশায় আমরা তার জন্য কিছু করতে পারি নাই।
অনুতপ্ত হৃদয় নিয়ে এখন তাই দুআ করি, আমাদের যেটুকু ভালো কাজ তার অংশ যেন আব্বার আমলনামায়ও যুক্ত হয়। আল্লাহ যেন আমাকেও আব্বার মতো সবার জন্য দুআ করতে পারার মতো একটা উদার মন দেন।
পর্ব – ২
আমি আমার জীবনে যে কয়জন মানুষ দ্বারা পজিটিভলি প্রভাবিত হয়েছি, যাদের জন্য মন থেকে শ্রদ্ধাভরে দুআ করি, তাদের একজন হলেন আমার বড় মামা। প্রফেশনাল জীবনে তিনি ছিলেন সফল একজন মানুষ। ভালো ছাত্র, ভালো শিক্ষক। আমি তার নাম বলবো না, কারণ তিনি স্বনামেই বিখ্যাত ছিলেন, আছেন। আমার ছোট বেলায় আমার ভালো রেজাল্ট করার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলেন বড় মামা। বড় ভাগনী এবং ভালো ছাত্রী হিসেবে আমি তার স্নেহধন্য ছিলাম।
ছোটবেলায় যদিও বা আমি শুধু ভালো ছাত্র, ভালো শিক্ষক রূপটা দেখেই তাকে রোলমডেল ভাবতাম, কিন্তু আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে, আশেপাশের সংসারগুলোতে নানা উত্থান-পতন দেখে আমি বড় মামার জীবনের সাফল্যকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখি, নতুন করে তাকে শ্রদ্ধা করি তার নিজের মাতৃভক্তির জন্য এবং সেই শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্ববোধকে নিজের সন্তানদের মধ্যে সফলভাবে সঞ্চালিত করার জন্য।
জীবনের শেষ কয়েকটা বছর তিনি বেশ অসুস্থ ছিলেন এবং দেশের বাইরে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুও হয় দেশের বাইরে। মৃত্যুর আগে তিনি বলে যান, তাঁকে যেন তার মায়ের পাশে কবর দেয়া হয়। তারঁ মতো হাইপ্রোফাইল ব্যক্তি যিনি চাইলেই রাজধানীর যে কোনো ভালো কবরস্থানে শায়িত হতে পারতেন, তিনি কিনা চাইলেন দেশের উত্তরাঞ্চলের অপরিচিত একটি জায়গায় শায়িত হতে, কারণ সেখানে তাঁর মা আছে বলে। আমার নানী যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাঁদের মা-ছেলের বন্ডিং ছিল ঈর্ষণীয়। গত ২ বছর আগে যখন নানাবাড়ি গিয়ে মা-ছেলের পাশাপাশি কবর দেখলাম তখন নতুন করে সেই বন্ডিং আবিষ্কার করলাম।
আমার নানা-নানীর আরও ৯ জন সন্তান আছেন, যদিও তারা এখন সবাই জীবিত, তবে আমি জানি না, তাদের মধ্যে কয়জন আদৌ এভাবে মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখাবে/ দেখাতে চাইবে।
আমার মনে আছে, মামার লাশ বিদেশ থেকে দেশে আনা এবং এরপর দেশের আরেকপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত, রাস্তাঘাট ছিল অনিরাপদ। কিন্তু তারপরও মামার সন্তানরা মামার শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল এবং সফল হয়েছিল। এখনও মামার ছেলে পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে উড়ে এসে, দেশের আরেকপ্রান্তে চলে যায় মামার কবর জিয়ারত করতে। মামার প্রতি ওদের এই ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করে, সেই সাথে এটাও শেখায় যে, If you expect respect from your child, then be a role model of good child of your parents.
আপনার সন্তান যদি দেখে যে, আপনি আপনার বাবা-মাকে সবার আগে প্রায়োরিটি দিচ্ছেন তবে সে সেটাই শিখবে। সে যদি দেখে যে, আপনি দুনিয়াদাবী জীবনে সফল হয়ে আপনার ব্যকডেটেড মা-বাবাকে আর পাত্তা দিচ্ছেন না, শুধু টাকা-পয়সা দিয়েই দায়িত্ব পালন করছেন তবে সে সেটাই শিখবে। আপনার বৃদ্ধ বয়সে সে আপনার সাথে এমন ব্যবহারই করবে।
আমার মামার ছেলে আজ পার্থিব জীবনে মামা’র মতোই সফল আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু তাঁর চেয়েও বড় যে সাফল্য আমাকে মুগ্ধ করে তা হলো, যখনই ও ওর ক্যারিয়ারে কোনো সাফল্য অর্জন করে তখনই সেটা সে মামা-মামীকে উৎসর্গ করে। মামার মতোই ও ওর মাকে ( বড় মামীকে) ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে।
বিদেশে নিজের কাছে নিয়ে রাখছে । আমি বিশ্বাস করি, ওর এই মাতৃভক্তি ও মামাকে দেখেই নিজের মধ্যে ধারণ করেছে এবং তা চর্চা করছে।
বড় মামার মধ্যে আরেকটা যে গুণ ছিল তা হলো নেতৃত্ব দেবার সহজাত ক্ষমতা এবং বড় সন্তান হিসেবে বাকী ভাই-বোনদের প্রতি দায়িত্ববোধ। আত্মীয়-স্বজনদেরকে উনি যাকে যেভাবে পারেন সাহায্য করেছেন।
আমার কাবিন হওয়ার ২০ দিন পর আমার আব্বা মারা যান, এরপর মামা নিজে দায়িত্ব নিয়ে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হলেও সুন্দরভাবে আমার বিদায়ের আয়োজন করেন। এমনকি দেশের বাইরে যাওয়ার পরও আমার মেয়ে হওয়ার পর আমাদের মা-মেয়ের জন্য একরকম ড্রেসের কাপড় পাঠিয়েছিলেন, আমার ছোট বোন বিয়ের পর কাকতালীয়ভাবে যখন একই দেশে পড়তে গেল মামা দাওয়াত করা থেকে অন্যান্য সাহায্য করেছিলেন তার সাধ্যমতো। আজ মামা নেই, আমাদের নানার পরিবারে কোনো অভিভাবকও নেই, যার শূণ্যতা আমরা অনুভব করি।
কিছু দিন আগে রিলেশনশীপ ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আমার একটা লেখায় লিখেছিলাম যে, একজন মানুষের পক্ষে তার সবগুলো রোল এ সফল হওয়াটা খুব টাফ, খুব কম মানুষ তা পারে। আমার দেখা সেই অল্প মানুষদের মধ্যে বড় মামা একজন, যিনি সন্তান হিসেবে, পিতা হিসেবে, স্বামী হিসেবে সম্পর্কগুলোতে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করেছেন , একই সাথে প্রফেশনাল ক্যারিয়ারেও সফল ছিলেন।
আমার যদি পরকালে বড় মামা’র সাথে দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হয় তবে তাকে এই কথাটা বলবো যে,
আমি হয়তো পার্থিব ক্যারিয়ার করতে পারি নাই ( আমার যে সম্ভাবনা ছিল সেই অনুযায়ী) কিন্তু তার বিনিময়ে আমি আমার মাতৃত্বকে প্রাধান্য দিয়েছি। সেই সাথে বড় মেয়ে হিসেবে, একমাত্র ছেলের বউ হিসেবে আমার দায়িত্বগুলো পালন করার চেষ্টা করেছি। আর এই পারিবারিক দায়িত্বগুলোর মাঝে ব্যালেন্স করার ক্ষেত্রে আপনি ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা।
মহান আল্লাহ যেন বড় মামাকে বেহেশত নসীব করেন। আমীন।
পর্ব – ৩
আজকে আমি যার কথা বলবো তিনি সম্পর্কে আমার মামী ছিলেন। কিন্তু তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। নিজের মাকে যেসব কথা বলতে সংকোচ বোধ করতাম. তা অনায়াসেই শেয়ার করতে পারতাম মামীর সাথে।
সহজে অন্যকে আপন করে নেওয়ার বিরল গুণ ছিল মামীর মধ্যে। অন্য মামাদের তুলনায় এই মামীর হাসবেন্ডের আর্থিক প্রাচুর্য কম থাকলেও সে ঘাটতি পূরণ হয়ে যেত মামীর ভালোবাসার প্রাচুর্য দিয়ে। মামীর আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ ছিল না এমন কাউকে আমার নানা বাড়িতে পাওয়া যাবে না।
অথচ আমাদের সবার প্রিয় সেই হাসি -খুশি, মিশুক মামী অল্প বয়সেই আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন। তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু আমাদের সবার জন্য ছিল একটা বিরাট আঘাত। ভালো মানুষেরা যে বেশিদিন এই কঠিন, জটিল পৃথিবীতে টিকতে পারে না মামীর চলে যাওয়া তারই একটা উদাহরণ।
মৃত্যুর আগে শেষ কয়েকটা বছর মামী মানসিক অস্থিরতা ও কষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। নিজের সংসারের ব্যস্ততায় আমি সে সম্পর্কে জানতে পারিনি। মামীকে কোনোরকম মেন্টাল সাপোর্টও দিতে পারিনি —এই আফসোস আমার বাকি জীবন রয়ে যাবে।
আমার প্রায়ই মনে পড়ে আমার মেয়ের যেদিন প্রথম দাঁত উঠল সেদিন আমি মামীকে ফোন করে সেটা জানিয়েছিলাম। মামী স্বভাবসুলভ ভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, ’আমি কেমন আছি তা জিজ্ঞেস করলা না!!”
আমি একটু অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন মামীর কন্ঠের অভিমানটা ধরতে পারিনি ।সদা হাস্যোজ্জ্বল মামীর হাসির আড়ালের বিষাদটা বুঝতে পারিনি। কি যে বোকা ছিলাম আমি!!!
তার মৃত্যুর পর যখন তার অশান্তির কারণগুলো জানতে পারলাম তখন শোকাহত হলেও পরবর্তীতে সেই ঘটনাগুলো থেকে আমি বেশ কিছু শিক্ষা নিয়েছি এবং নিজের সংসার জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি, এখনও করছি।
মেয়েরা যখন ঘরের বাইরে কাজ করে তখন সে অনেক কিছু অর্জন করে। নিজস্ব পরিচয়, নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা, নিজের পিতা /মাতা /ভাই /বোনকে আর্থিক সাহায্য করার পাশাপাশি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দেওয়ার অধিকার প্রভৃতি। কিন্তু এসবকিছুর বিনিময়ে যদি নিজের সংসারেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তখন এই সবগুলো অর্জন বৃথা হয়ে যায়। তাই ঘরে -বাইরে দুই জায়গায় কাজ করতে হলে, দুই জায়গায় একটা সুশৃংখল পরিবেশ বজায় রাখতে হলে ব্যালেন্স করতে শেখা, প্রায়োরিটি সেট করতে শেখাটা খুব জরুরী।
একটা সংসারে যখন স্বামী ,স্ত্রী দুজনেই উপার্জন করে তখন সেই সংসারের কাজগুলো, সন্তানের প্রতি দায়িত্বগুলো কিভাবে দুজনে মিলে ভাগ করে নিবে এবং সেই সাথে দুজনের উপার্জন থেকে কে কতটুকু অংশ সংসারে কন্ট্রিবিউট করবে এবং কতটুকু নিজের ইচ্ছে মতো খরচ, সঞ্চয়ের জন্য রাখবে সে বিষয়ে দুজনের মধ্যে একটা ক্লিয়ার আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং খোলামেলা আলাপ-আলোচনা হওয়া খুব প্রয়োজন। শুধু এই Understanding এবং Open discussion এর অভাবে অধিকাংশ Working women দের সংসারে অশান্তি হয়।
একটা অত্যন্ত তিক্ত সত্য হলো এখনও আমাদের দেশের মেজরিটি পুরুষরা working wife কে কিভাবে হ্যান্ডেল করতে হয় তা জানে না। বউ ক্যারিয়ার করবে, উপার্জন করে সংসারে কনট্রিবিউট করবে—- এটা মেনে নিতে পারলেও সেজন্য যে সংসার এবং সন্তান প্রতিপালনের কাজে তাকে হেল্প করতে হবে, নিজের অনেক চাওয়া ,পাওয়াকে স্যাক্রিফাইস করতে হবে— এটা এখনও অধিকাংশ পুরুষ মেনে নিতে পারে না।
তারা ভাবে বউ কর্মজীবী হলে সাংসারিক কাজে হয় মেয়ের পরিবার সাপোর্ট করবে, নাহয় বাসায় হেল্পিং হ্যান্ড থাকবে আর না হলে বউ দশভূজার মতো বাইরে কাজ করে এসে ঘরেও পারফেক্ট স্ত্রী, মা, পুত্রবধূর দায়িত্ব পালন করবে। আর এত কিছু করতে গিয়ে যদি তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, কখনো উঁচু গলায় কথা বলে তবে সে আবার বেয়াদব, অবাধ্য আখ্যা পাবে । বহুমুখী দায়িত্বের চাপে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, স্ত্রীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে স্বামী যদি পরকীয়ায় লিপ্ত হয় তবে সেই দায়ও আবার স্ত্রীর ঘাড়ে এসেই পড়বে।
আমি বলছি না যে শতভাগ পরিবারের চিত্র এমন বা শতভাগ নারীরাই নির্দোষ । তবে সংখ্যার বিচারে অধিকাংশ কর্মজীবী নারীকে ঘরে- বাইরে দুই জায়গায় কাজ করতে গিয়ে এই দোটানার যাঁতাকলে পড়ে পিষ্ট হতে হয়। বিশেষ করে যেসব পুরুষেরা নিজেদের পরিবারের মা, বোনকে বাইরে কাজ করতে দেখেনি তাদের স্ত্রীরা যদি কর্মজীবী হয় তবে তাদের প্রচন্ড suffer করতে হয়।
মামীর জীবনের sufferings থেকে এটা আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি।
মামীর ছেলে নিজেও এখন বিবাহিত এবং কর্মজীবী নারীকে বিয়ে করেছে। তার স্ত্রীর ঘরে, বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে সে যেন যোগ্য সহযোগী হতে পারে—এই দুআ করি সব সময় । মামী চলে যাওয়ার পর আমার মামাতো ভাইয়ের উপর দিয়ে ঝড়- ঝাপটা গেছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের লক্ষ্যে ফোকাস থেকে সে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার জন্য আমি ওকে সম্মান করি । ( যদিও ও আমার বয়সে অনেক ছোট, তবে কাউকে সম্মান করতে বয়স কোনো ব্যাপার না।)
মামী না থাকলেও মামীর শেখানো মূল্যবোধেই যে ওকে পথভ্রষ্ট হতে দেয়নি –এটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। মামীর জীবন থেকে তাই আমি সৎকর্মশীল, পরোপকারী অভিভাবক হওয়ার অনুপ্রেরণাও পাই। আমি বেঁচে না থাকলেও মহান আল্লাহ যেন আমার সন্তানের জন্য ’ওয়ালী’ হয়ে যান। নিঃসন্দেহে আল্লাহর চেয়ে সর্বোত্তম অভিভাবক আর কেউ হতে পারে না।
পরকালে যদি মামীর সাথে দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হয়, তবে তাকে একটা কথাই বলতে চাই, জীবদ্দশায় আপনার দেওয়া ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারিনি। তবে আপনি চলে যাওয়ার পর আপনার জন্য নিয়মিত দোয়া করে সেই আফসোস মেটানোর চেষ্টা করেছি। আল্লাহ যেন আমার এই দোয়াগুলো কবুল করে নেন, মামীর সকল দোষ ত্রুটি ক্ষমা করে তাকে বেহেশত নসিব করেন। আমীন।
পর্ব – ৪
আমাকে যদি আমার নিজের একটি গুণের কথা বলতে হয়, তবে আমি যে গুণের কথা বলবো তা হলো আমি যথেষ্ট গোছানো স্বভাবের. মাশাআল্লাহ। যারা আমাকে অফলাইনে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, আমার সাথে কাজ করেছেন তারা জানেন আমি যে কোনো কাজ গুছিয়ে করতে পছন্দ করি। জিনগতভাবে যদিও আমার এই বৈশিষ্ট্য আমি আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছি তবে সেই সুপ্ত সত্তাকে বিকশিত করার practical experience আমি যার কাছ থেকে লাভ করেছি তিনি আমার এক প্রতিবেশী আন্টি।
আমাদের সরকারি কলোনিতে তিনি আমাদের নিচের তলায় থাকতেন। আঙ্কেল, আন্টি দুজনই আমার আব্বার সহকর্মী ছিলেন। তাছাড়া আমাদের উভয় পরিবারের দেশের বাড়ি ছিল উত্তরাঞ্চলে। তাই দুই পরিবারের মধ্যে একটা অন্যরকম হৃদ্যতা ছিল।
আমি আগের একটা পর্বে বলেছিলাম আমরা শৈশব, কৈশোরে যাদের সংস্পর্শে বড় হই অনাত্মীয় হলেও তাদের অনেকের কিছু কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমাদের প্রভাবিত করে। নিজের অজান্তে আমরা তাদের অনেক দোষ/ গুণ নিজের মধ্যে ধারণ করে নেই, যা হয়তো পরবর্তী জীবনে আমরা উপলব্ধি করি।
আমার জীবনে আন্টি এমনই এক অনুপ্রেরণার নাম, যার কাছ থেকে আমি শিখেছি কিভাবে ৯ টা- ৫ টা চাকরি করেও গুছিয়ে সংসার করতে হয়। আমাদের কলোনির বাসাগুলো ছিল স্বল্প পরিসরের। কিন্তু সেই জায়গারও maximum utilize করে আন্টি এমনভাবে বাসা গুছিয়ে রাখতেন যে উনার বাসায় গেলে একটা চক্ষু শীতলকারী অনুভব আসতো। কলোনির সবার বাসার ডিজাইন এক হলেও উনার বাসায় গেলেই অন্যরকম মনে হতো, অন্যান্য হাউস ওয়াইফ আন্টিদের বাসায় তুলনায়ও উনার বাসা ছিল পরিচ্ছন্ন, টিপটপ। আমি উনার কাছ থেকে শিখেছি একটা পরিপাটি বাসার জন্য দামি ফার্নিচার, চাদর, পর্দা লাগে না। যেটা লাগে সেটা হলো রুচিশীলতা এবং নিজের যা সামর্থ্য আছে সেই অনুযায়ী ঘরের জিনিসপত্র গুলোকে অর্গানাইজডভাবে গুছিয়ে রাখার যোগ্যতা। আমি আমার ১৬ বছরের সংসার জীবনে এই নীতিকে ফলো করার চেষ্টা করে যাচ্ছি আলহামদুলিল্লাহ।
আন্টি শুধু ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখার ক্ষেত্রে দক্ষ ছিলেন তা নয়, মানি ম্যানেজমেন্ট, হেল্পিং হ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ,ফ্যামিলি মেম্বারদের ম্যানেজ করার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।অফিসে যাওয়ার আগে বাসায় হেল্পিং হ্যান্ডকে ঘরের কাজগুলো সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন, মাসের শুরুতে বেতন পাওয়ার পর সংসারের ফিক্সড খরচের টাকাগুলো আলাদা আলাদা খামে ভরে নাম লিখে রাখতেন. প্রত্যেক শুক্রবার বাসায় স্পেশাল খাবার (রুটির বদলে পরোটা, ভাতের বদলে পোলাও) আয়োজন করতেন। সংসারে সুশৃঙ্খলতা ও বৈচিত্র্য বজায় রাখার এই ট্রিক্সগুলো আমি আন্টির কাছে শিখেছিলাম ।
আমাদের সমাজে একটা কমন কনসেপ্ট প্রচলিত যে হাউজ ওয়াইফরা সুগৃহিনী হয় আর কর্মজীবী নারীরা দিনের একটা বড় অংশ বাড়ির বাইরে কাটায় বলে তাদের সংসার হয় এলোমেলো, অগোছালো। কিন্তু এই ধারণা যে শতভাগ সত্য নয় তা আমি বুঝেছি আমার বিয়ের পর। আমার শ্বশুরবাড়ির ৯৮% নারী হাউসওয়াইফ, কর্মজীবী নয় ।কিন্তু তাদের অনেকেরই ঘরের অবস্থা এমন যে বাসায় গেলে বসার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না।এমন না যে বাসা ছোট বা সময়ের অভাব। বরং বাসায় গেলেই দেখি ড্রয়িং রুমে ছড়িয়ে -ছিটিয়ে বসে গল্প করছে, নাহয় টিভি দেখছে নাহয় অযথা মোবাইল স্ক্রল করছে। ডাইনিং, কিচেন বা বেডরুমের কথা না হয় বাদই দিলাম।
ব্যতিক্রম দেখেছি, আমার চাচী শাশুড়ি ও ফুপু শাশুড়ির বাসায়। উনাদের বাসায় যেকোনো সময় হুট করে গেলেও মনে হবে যেন মেহমান আসার জন্য রেডি হয়েছিলেন। উনারা দুজন শুধু নিজেরাই গোছানো ও পরিপাটি তা নন বরং বাসার পুরুষ সদস্যদেরও এমনভাবে ট্রেইনআপ করেছেন যে ওরাও বাসার প্রতিটি জিনিস ব্যবহার করার পর আবার ঠিকমতো গুছিয়ে রাখে। পুরুষ মাত্রই অগোছালো হবে– এই ধারণার ব্যতিক্রম আমার এই চাচাতো, ফুফাতো দেবররা। আর এটার ক্রেডিট তাদের মায়েদেরই প্রাপ্য।
অনেকের মনে হতে পারে উনারা হাউজ ওয়াইফ বলেই এটা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু আমার আন্টি চাকরিজীবী হয়েও এটা মেইনটেইন করেছেন। আর এজন্য প্রয়োজন সংসার এবং কর্মক্ষেত্র- এই দুইয়ের মাঝে ব্যালেন্স করে চলার প্রজ্ঞা ও ধীরস্থিরতা।
একজন গৃহিণীকে যে নিজেই সংসারের সব কাজ করে সবকিছু পরিপাটি রাখতে হবে তা নয় বরং তাকে প্রয়োজনে হেল্পিং হ্যান্ড এর সাহায্য নিতে হবে, বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের মাঝে গুড হ্যাবিট গ্রো করাতে হবে এবং নিজেকে সবকিছু ম্যানেজ করার হিকমাহ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে দিনশেষে আমরা আউটপুট দেখি, বিহাইন্ড দা সিনে কে কতটুকু এফোর্ট দিল তা দেখি না।
অনেকেরই মনে হতে পারে আমি কেন গুছানো ব্যাপারটাকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছি, এটা কি আসলেই খুব জরুরী কিছু? সত্যি কথা বলতে পুরুষরা ফিতরাতগতভাবে গুছানো ঘরবাড়ি, পরিপাটি পোশাক- পরিচ্ছদ পছন্দ করে । যেসব সংসারের গৃহিণীরা পরিপাটি, টিপটপ তাদেরকে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা আলাদাভাবে সমীহ করে—- এটা আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা। তাই পুরুষদের কাছ থেকে সম্মান পাওয়ার একটা অন্যতম ট্রিক্স হলো গুড অর্গানাইজার এবং গুড ম্যানেজার হওয়া।
ইদানিং অনেক কর্মজীবী নারীরা আফসোস করেন যে এত শিক্ষিত, উপার্জনক্ষম হওয়ার পরও তারা পরিবারের পুরুষদের কাছে সম্মান পান না অথচ আগেকার যুগের মা/নানিরা উচ্চশিক্ষিত/ উপার্জনকারী না হয়েও অনেক মর্যাদা পেতেন। আমার অবজারভেশন হলো সম্মান ডিপেন্ডস অন পার্সোনালিটি এন্ড ম্যানেজিং ক্যপাসিটি।
গুছানো বা অর্গানাইজড থাকার আরো বহুমুখী উপকারিতা আছে ।
(এই টপিকে আমার একটি বিস্তারিত লেখা আছে।)
যাইহোক আবার ফিরে আসি আন্টির কথায়। আন্টির কাছে আমরা দুই বোনই আরেকটা যে বিষয়ে ঋণী তা হলো আমাদেরকে বইপ্রেমী করে তোলার বিষয়ে। আমাদের ফ্যামিলিতে একাডেমিক বইয়ের বাইরে অন্যান্য বই পড়ার ব্যাপারে তেমন উৎসাহিত করা হতো না। আন্টির ছিল বিভিন্ন ধরনের বইয়ের কালেকশন। সুনীল, শীর্ষেন্দু সমরেশ, সুচিত্রা ভট্টাচার্যের বইয়ের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি আন্টির বইয়ের কালেকশন থেকে। যদিও সময়ের পরিক্রমায় দ্বীনের বুঝ আসার পর এসব বইয়ের অনেক বিষয়বস্তু এখন ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হয়, তবে এসব লেখকদের রচনা শৈলীর গুণগত মান যে আমাদের দুই বোনকে পাঠক হিসেবে একটা উঁচু স্তরে পৌঁছে দিয়েছে তা স্বীকার করতেই হবে। ভালো লেখক হতে হলে ভালো পাঠক হওয়া আগে জরুরী আর এজন্য আমরা আজীবন আন্টির কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।
আন্টির সাথে বহু বছর সামনাসামনি দেখা হয় না, কথা হয় না। কিন্তু সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে শৈশব- কৈশোরে উনার কাছ থেকে পাওয়া সাংসারিক টিপসগুলো আজও আমাকে গাইডলাইন দেয়। তাই সময় সুযোগ পেলে উনার জন্য দোয়া করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। মহান আল্লাহ যেন আন্টিকে হায়াতে তাইয়েবা দান করেন। আমীন।
(চলবে ইনশাআল্লাহ)