
পর্ব – ১
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটা মানুষকে নানাবিধ সম্পর্কের জালে জড়িয়ে থাকতে হয়। কারও না কারও সন্তান হিসেবে যে জীবনের সূচনা হয় মৃত্যুর সময় সে জীবনের সমাপ্তি ঘটে অনেকগুলো সম্পর্কের পরিচয় নিয়ে। একজন মানুষের পক্ষে কি আদৌ সম্ভব এই সবগুলো পরিচয়ে সফল হওয়া?
সত্যি কথা বলতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না সবার কাছে একজন ’আদর্শ মানুষ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়া। তবে অন্তত এমন একজন মানুষ হওয়ার চেষ্টা তো করাই যায়, যার মৃত্যুর পর তার সাথে বিভিন্ন সম্পর্কের বাঁধনে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তাকে নিয়ে দোয়া না করলেও অন্তত বদদোয়া করবে না, তার মৃত্যুতে শোকে ব্যাকুল না হলেও অন্তত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে না।
এমন একজন মানুষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন জীবনের সম্পর্কগুলো maintain করার ক্ষেত্রে কৌশলী ও চিন্তাশীল হওয়া। এ ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা লব্ধ কিছু টিপস শেয়ার করতে চাই এই লেখায় ।
পারিবারিক সম্পর্ক, বাইরের মানুষের সাথে সম্পর্ক, ভার্চুয়াল সম্পর্ক, দ্বৈত সম্পর্ক, নিজের সাথে সম্পর্ক এবং সর্বোপরি স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক—-এই বহুবিধ সম্পর্কগুলো কিভাবে maintain করা যায়, সে বিষয়গুলোতে ফোকাস করবো ইনশাআল্লাহ।
প্রথমত: পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে সরলরৈখিকভাবে judge করা।
যেমন- সন্তান হিসেবে আমাদের কর্তব্য হওয়া উচিত মা এবং বাবাকে দুটি পৃথক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে তারা আমাদের প্রতি তাদের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করেছে /করছে কিনা তা বিবেচনা করা ।কিন্তু আমরা যে বিরাট ভুল করি তাহলো মা-বাবার মধ্যকার দাম্পত্য সম্পর্ককে আমরা আমাদের জাজমেন্টের মধ্যে নিয়ে আসি। আমরা ভুলে যাই যে, দাম্পত্য সম্পর্ক আর অপত্য সম্পর্ক এক নয়। দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে ভিন্ন কিছু কেমিস্ট্রি থাকে, মান -অভিমান থাকে, ঝগড়া -ভালোবাসা থাকে. পাওয়া -না পাওয়ার হিসাব থাকে— যা নিজেরা বিবাহিত জীবনে প্রবেশ না করা পর্যন্ত বোঝা যায় না। তাই সন্তান হিসেবে আমাদের উচিত তাদের সম্পর্কের ঠিক/ ভুলের ব্যাপার বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হওয়া ।
In general আমরা সন্তান হিসেবে মায়েদের কাছ থেকে খাবার, পোশাক, সেবা- যত্ন, পড়াশোনা, আখলাক, ধর্মীয় জ্ঞান- এসব বিষয়ে এবং বাবাদের কাছ থেকে ভরণপোষণ, বেড়ানো, বাইরের জগত সম্পর্কে জ্ঞানার্জন— এসব বিষয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালন expect করি। এবার মা/বাবা যদি সন্তানের প্রতি এই দায়িত্বগুলো পালনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ effort দিয়ে থাকেন, তবে সন্তানদের উচিত হবে না মা-বাবার inter-personal relationship নিয়ে bother করা।
এটা ঠিক যে, একটি সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্ক যেমন সন্তানকে sense of security দেয় তেমনি একটি দ্বন্দ্বমুখর সম্পর্ক সন্তানের সঠিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই বাবা- মা’রও উচিত নিজেদের সম্পর্কের টানাপোড়েন যেন সন্তানের ওপর প্রভাব না ফেলে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা।
একজন মানুষ ভালো জীবনসঙ্গী নাই হতে পারে কিন্তু তাকে ভালো অভিভাবক হওয়ার সুযোগটা দেওয়া উচিত।
একই টেকনিক ফলো করতে হবে ভাই- বোনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও।
আপনার দৃষ্টিতে দারুণ কেয়ারিং ভাই /বোনটি হয়তো তার জীবনসঙ্গী বা সন্তানদের ব্যাপারে দারুন উদাসীন ব্যক্তি। আপনার সুখ -দুঃখের সময় সবার আগে এগিয়ে আসা ভাই /বোনটি হয়তো তার নিজের জীবনসঙ্গী, সন্তানের বেসিক দায়িত্বগুলোও পূরণ করে না। তাই তাদের পারিবারিক বিষয়ে নিজের ভাই/ বোনকে অন্ধভাবে সমর্থন করা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়।
বিবাহিত ভাই/বোনদের বরং উচিত নিজেদের মধ্যেকার কমন টপিক, যেমন – নিজেদের আত্মীয়-স্বজন. নিজেদের প্রাক্তন প্রতিবেশী, নিজেদের সম্পত্তি– প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে নিজেদের মধ্যকার বন্ডিং বজায় রাখা।
ভাই /বোন বা তাদের জীবনসঙ্গী যদি তাদের পারিবারিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেও চায় তবে সেক্ষেত্রে নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করাই নিরাপদ। অনাবশ্যক কৌতূহল প্রকাশ করা বা উপযাচক হয়ে উপদেশ দেওয়া– কোনটাই করার দরকার নেই।
একান্তই যদি কোনো বিষয়ে মীমাংসা করতে হয় ,তবে অবশ্যই উভয় পক্ষের কথা শুনতে হবে। যদিও রক্তের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে unbiased desicion দেওয়া খুব টাফ, তবুও নিজস্ব হিকমাহ কাজে লাগিয়ে মতামত দিতে হবে।
একই কথা প্রযোজ্য শ্বশুর/ শাশুড়ি হিসেবে পুত্রবধূ এবং মেয়ের জামাইয়ের ক্ষেত্রেও। মা-বাবার অতি বাধ্য পুত্র /কন্যাটি দাম্পত্য জীবনে স্বামী/স্ত্রী হিসেবে কেমন তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই না করে কারো প্রতি একতরফা পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। তার চেয়ে বরং তাদের সম্পর্ক তাদেরকেই build up করতে দিতে হবে। সম্পর্কে উত্থান-পতন আসবে, সেগুলোকে handle করার জন্য তাদেরকে time, space দিতে হবে। নিজেরা direct interfere করা যাবে না ।
এক কথায় One-to-one relationship maintain করতে হবে। মা-বাবার সাথে সন্তানের সম্পর্ককে মা-বাবার নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্ক কিংবা সন্তানের নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্ক দ্বারা প্রভাবিত করা যাবে না। যদিও এভাবে One-to-one relationship maintain করা tough কিন্তু impossible না। এজন্য দরকার নিজের অধিকারের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সব ব্যাপারে নাক গলানোর স্বভাবকে কন্ট্রোল করা। না হলে দেখা যাবে secondary relation এ interfere করতে গিয়ে primary relation নষ্ট হয়ে যাবে।
পর্ব – ২
গত পর্বে বলেছিলাম , কিভাবে পারিবারিক সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে one-to-one relation maintain করতে হবে সে ব্যাপারে। এই পর্বে অন্যান্য সম্পর্কগুলো নিয়ে আলোচনা করবো।
দ্বিতীয়ত : বাইরের মানুষের সাথে সম্পর্কের গভীরতা তৈরি এবং প্রায়োরিটি সেট করার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা।
পার্থিব সম্পর্কগুলোকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। Fixed relationship এবং Variable relationship. মা, বাবা, ভাই, বোন, জীবনসঙ্গী ও তাদের পরিবার, সন্তান, সন্তানের জীবনসঙ্গী, তাদের সন্তান——- এসব পারিবারিক সম্পর্কগুলো হলো Fixed relationship আর সহপাঠী, সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব প্রতিবেশী—– এগুলো হলো Variable relationship. এই Variable relationship গুলো জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তৈরি হয়, আবার সময়ের প্রয়োজনে হারিয়েও যায়।
তো এই Variable relationship গুলোর ক্ষেত্রে deep relation এ না যাওয়াই better. বিশেষ করে নিজের জীবনের পার্সোনাল বিষয়গুলোকে এসব রিলেশনশিপের ক্ষেত্রে disclose করা উচিত নয়। আপনি হয়তো আপনার মন খারাপের মূহূর্তে আপনার পরিবারের কারও সম্পর্কে আপনার সহপাঠীর কাছে নেগেটিভ তথ্য শেয়ার করলেন, এরপর তার সাথে আপনার সম্পর্ক ঠিকঠাক হয়ে গেল, আপনি নিজে সব ভুলে গেলেন, কিন্তু আপনার সহপাঠীর মনে আপনার পরিবারের সেই সদস্য সম্পর্কে একটা negeative impression রয়ে গেল। আবার উল্টোটাও হতে পারে। আপনি হয়তো আপনার সহকর্মীর কাছে আপনার জীবনসঙ্গী সম্পর্কে অনেক প্রশংসা করলেন, তার দোষগুলো গোপন রাখলেন। ফলে আপনার সহকর্মীর মনে ঈর্ষা বা নিজে না পাওয়ার হাহাকার জন্ম নিল, যার খোঁজ আপনি জানলেনও না।
এজন্য এসব variable relationship গুলোতে একটা দূরত্ব বজায় রাখা ভালো। এসব ক্ষেত্রে বরং দেশ, রাজনীতি, খেলাধূলা, সাহিত্য, মিডিয়া এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করা নিরাপদ। অর্থ্যাৎ বাইরের মানুষের সাথে বাইরের জগতের বিষয় নিয়ে discuss করে relationship maintain করতে হবে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Variable relationship গুলোকে Fixed relationship এর উপরে priority দেয়া যাবে না। মা-বাবার অসুস্থতার সময়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়াকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না, জীবনসঙ্গী বা সন্তানদের সময় না দিয়ে ছুটি/ অবসর সময়গুলোতেও সহকর্মীদের সাথে বেড়াতে যাওয়া যাবে না। অর্থ্যাৎ Family comes first এই নীতি মেনে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে আপনার দু:সময়ে কিন্তু সবার আগে পরিবারের সদস্যরাই এগিয়ে আসবে।
তবে এটাও ঠিক variable relationগুলোর মধ্যেও কারও কারও সাথে এমন আত্মিক বন্ধন তৈরি হতে পারে যা সারাজীবন অটুট থাকে। এরকম গুটিকয়েক মানুষ জীবনে আসতেই পারে, তবে তাদেরকে নির্বাচনের ক্ষেত্রেও হিকমাহর পরিচয় দিতে হবে।
তৃতীয়ত: ভার্চুয়াল রিলেশনশীপগুলোকে সিরিয়াসলি না নেয়া।
বর্তমান সময়ের একটি অন্যতম ফিতনা হলো ভার্চুয়াল রিলেশনশীপ। এই রিলেশনশীপগুলোকে মানুষ ইদানীং এতটাই গুরুত্ব দেয় যে, কেউ কেউ অনলাইন থেকে অফলাইন রিলেশনশীপে চলে যায় আবার কেউ কেউ অনলাইন রিলেশনশীপের জন্য অফলাইন রিলেশনশীপগুলোকে নষ্ট করে। অথচ অনলাইন জগতে মানুষ তার জীবনের খন্ডিত অংশগুলোকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী উপস্থাপন করে, যা অনেক সময় fake পর্যন্ত হতে পারে। তাই অনলাইনে পরিচিতদের virtual activities দেখে প্রভাবিত হওয়া যাবে না। যার মধ্যে যেটুকু ভালো আছে সেটুকু নিয়ে নিজের self development এ কাজে লাগানো গেলে that’s enough. ( এই টপিকে আমার একটা বিস্তারিত লেখা আছে)
চতুর্থত: দ্বৈত সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কৌশলী হওয়া।
আমাদের অনেকের জীবনেই এমন অবস্থা তৈরি হয় যে, একই ব্যক্তির সাথে Personal এবং Professional সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। যেমন- স্বামী-স্ত্রী / ভাই-ভাই / বোন-বোন একসাথে ব্যবসা করা বা কোনো প্রতিষ্ঠান চালানো প্রভৃতি। এই ধরনের দ্বৈত সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই যথেষ্ট হিকমাহ’র পরিচয় দিতে হয় যেন দুই ধরনের সম্পর্কের মাঝে কোনো conflict তৈরি না হয় এবং একটি
সম্পর্কের কারণে অন্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
আমি নিজেই বিগত ৫ বছর যাবৎ এমন একটি দ্বৈত সম্পর্ক maintain করছি আমার বোনের সাথে। Mubashera sisters পেইজের মাধ্যমে আমরা কোর্স, ওয়েবিনার, সাদাকাহ প্রজেক্ট—-বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি, সাথে লেখালেখি তো আছেই। তো ব্যাপারটা এমন না যে, কখনও দুই বোনের মধ্যে মতানৈক্য হয় না। যেহেতু আমাদের দুইজনের মধ্যে বয়সের একটা পার্থক্য আছে, বেসিক স্বভাবেও কিছু অমিল আছে আবার দীর্ঘদিন যাবৎ দুইজন দুই দেশে অবস্থান করায় পারিপার্শ্বিকতার একটা প্রভাব আছে —–সবমিলিয়ে অনেক বিষয়েই দুজনের মতের পার্থক্য ঘটে। কিন্তু এই মতানৈক্যকে আমরা বেশিদূর বাড়তে দেই না। কখনও একপক্ষ ছাড় দেই, তো কখনও অপর পক্ষ ছাড় দেই। নিজেদের মতানৈক্যের জন্য যেন অডিয়েন্স/ পাঠক ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটাকে প্রায়োরিটি দেই।
আবার একই সাথে পারিবারিক সম্পর্ক আছে বিধায় যেহেতু দুজন দুজনের ব্যস্ততা, সুবিধা-অসুবিধা জানি তাই একজনের critical time এ আরেকজন পেইজের কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যাই যেন পেইজ active থাকে। এটা হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্ককে প্রফেশনাল জায়গায় পজিটিভলি কাজে লাগানোর উদাহরণ।
বিপরীতক্রমে প্রফেশনাল সম্পর্কও আমরা পারিবারিক ক্ষেত্রে কাজে লাগাই। যখন দেখা যায় পারিবারিক কোনো বিষয় নিয়ে মতের অমিল হয়, সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় তখন আমরা প্রফেশনাল কোনো প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করা শুরু করি যেন পারিবারিক বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে যায়।
এভাবে পারিবারিক এবং প্রফেশনাল —এই সম্পর্ক দুটোকে আমরা একটিকে আরেকটির suppliment হিসেবে ব্যবহার করি যেন উম্মাহর জন্য বৃহত্তর কোনো লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
এককথায় একই সাথে Personal এবং Professional সম্পর্ক maintain করতে হলে এই দুই সম্পর্কের
Strength গুলোকে ব্যবহার করতে হবে এবং Weakness গুলোকে উপেক্ষা করতে হবে। তাহলেই
Maximum output বের করা যাবে।
পঞ্চমত: নিজের সাথে সম্পর্কের যত্ন নেয়া।
এই কথাটা খুব অদ্ভূত শোনালেও এটাই বাস্তব যে, নিজের আত্মার সাথে নিজের সম্পর্কের take care না করলে তার প্রভাব অন্যান্য সম্পর্কগুলোর উপরও পড়ে। ঘরে-বাইরে বিবিধ সম্পর্কগুলো tactfully handle করতে করতে আমরা একসময় ক্লান্ত হয়ে যাই। এই ক্লান্তি যতটা না শারীরিক, তার চেয়েও বেশি মানসিক । তাই এই ক্লান্তি দূর করার জন্য নিজেকে সময় দেয়া উচিত, নিজের একান্ত ভালো লাগার কিছু কাজ করা উচিত। সেটা হতে পারে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন সৃজনশীল কিছু। বই পড়া, ছবি অাঁকা, সেলাই করা, লেখালেখি করা—-যার যেটা ভালো লাগে সেটাই করতে হবে। প্রতিদিন না পারলেও প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি মাসে। এর ফলে হতাশা, হীনমন্যতা কেটে গিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে, নিজের কর্মস্পৃহা রিচার্জ হবে। ফলে অন্য সম্পর্কগুলোর প্রতি দায়িত্ব পালনও সহজতর হবে।( এই টপিকে আমার একটা বিস্তারিত লেখা আছে)
শেষ পর্ব
গত দুটি পর্বে আমরা বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক maintain এর ক্ষেত্রে specific কিছু টিপস নিয়ে আলোচনা করেছি। আসলে প্রতিটি সম্পর্কই গাছের মতো যাকে নিয়মিত সময় দিতে হয়, প্রতিনিয়ত যত্ন করতে হয়। তবে বিভিন্ন গাছের পরিচর্যা পদ্ধতি যেমন আলাদা তেমনি প্রতিটি সম্পর্ক মেইনটেইন করার টেকনিকও আলাদা।
তবে In general যে কোনো মানুষের সাথে রিলেশনশিপ মেইনটেইন এর ক্ষেত্রে কয়েকটি কমন বিষয় খেয়াল রাখতে হয়, যেগুলো খুব বেসিক শিষ্টাচার এর অন্তর্ভূক্ত। যেমন-
কারো সাথে আলাপ করার সময় তার দুর্বলতাগুলো নিয়ে কথা বলে তাকে খোঁচা না দেয়া। (শারীরিক/মানসিক /আর্থিক যে কোনো বিষয় হতে পারে)
নিজে যে বিষয়ে দক্ষ না বা নিজের যে বিষয়ে ঘাটতি আছে, অন্যকে সে বিষয়ে উপদেশ না দেওয়া। যেমন – আপনি হয়তো নিজের ঘর ঠিকমতো গুছিয়ে রাখতে পারেন না ,অগোছালো স্বভাবের অথচ অন্যের বাসায় গিয়ে তার ঘরের কোথায় কি ত্রুটি আছে তা খুঁজে বের করে কথা শুনাতে থাকেন। এক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তি আপনার কথাকে গুরুত্ব তো দেয়ইনা, বরং আপনি নিজেই তাদের কাছে হাসাহাসির পাত্র হয়ে যান।
অন্যকে নিজের মন মতো হওয়ার জন্য জোরপূর্বক প্রভাবিত করার চেষ্টা না করা। যদি একান্তই কারো কোনো স্পেসিফিক অভ্যাস বদলাতে চান তবে সেক্ষেত্রে আগে নিজেকে সেই বিষয়ে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। তাহলে আপনার আচরণ দেখে আপনার কাছের মানুষটি নিজেই এক সময় তা দ্বারা প্রভাবিত হবে। যেমন- আপনি যদি পিতা হিসেবে চান আপনার সন্তান ধূমপান না করুক তবে আপনাকে আগে অধূমপায়ী হতে হবে ।
একজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অন্যজনকে না বলা। এটাকে সহজ ভাষায় আমরা ‘চোগলখুরি’ বলি। এই স্বভাব যেমন ধর্মীয়ভাবেও নিষিদ্ধ তেমনি অন্যের সাথে সম্পর্ক নষ্টের জন্য এটা অন্যতম কারণ। অনেকেই Information share করে নিজেকে মূল্যবান হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। অনেকে আবার অন্যের দোষ হাইলাইট করে নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু আদতে যখন আসল সত্য প্রকাশ পেয়ে যায় তখন সবাই চোগলখোর ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক কাটআপ করে। তাই অন্যের সম্পর্কে কোনো কিছু জানলে তা নিজের মধ্যেই রাখতে হবে।
সর্বশেষে যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে আমি এই লেখার সমাপ্তি টানতে চাই, তা হলো ’স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক।’
এটিই একমাত্র সম্পর্ক যা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী, চিরন্তন ও শ্বাশ্বত। সারাজীবন আমরা যতো ধরনের সম্পর্কের বেড়াজালেই জড়াই না কেন, শেষ পর্যন্ত এই সম্পর্কের কাছেই আমাদের আত্মসমপর্ণ করতে হয়। বস্তুত: পার্থিব অন্যান্য সম্পর্কগুলো এক একটি পরীক্ষা, যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে ফলাফল হিসেবে নির্ধারিত হয় স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্কের স্বরূপটা কেমন হবে, ভালো নাকি মন্দ।
পার্থিব সম্পর্কগুলো problematic হলে, সঠিকভাবে handle করতে না পারলে স্রষ্টার প্রিয়াপাত্র হওয়া যায় না– এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে, পার্থিব সব সম্পর্কে পারফেক্ট হতে না পারাটাও মানুষ হিসেবে আমাদের স্বীমাবদ্ধতা, যে স্বীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্রষ্টা স্বয়ং অবগত। তাই একটি স্পেসিফিক সম্পর্কের সাফল্য/ ব্যর্থতা দিয়ে অন্য সম্পর্কগুলোকে judge করার গুরুভার মানুষ হিসেবে আমাদের না নেয়াই ভালো।
এই মহান দায়িত্ব বরং সর্ববিষয়ে বিজ্ঞ স্রষ্টার উপরই ন্যস্ত করা উচিত, যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যয়বিচারক।
আমাদের বরং উচিত প্রতিটি সম্পর্কের ব্যাপারে আমাদের যে দায়বদ্ধতা আছে সেটুকুই হিকমাহর সাথে পালন করা।
মহান আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমীন।