সিত খাতুনঃ এক সাহসী সেনানায়কের মা

লেখাটি শেয়ার করতে পারেন


সিত খাতুন হলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সাহসী সেনানায়ক সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর মা । সালাহউদ্দীন আইয়ুবি টানা বিশ বছর ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছেন এবং সম্মিলিত ইউরোপীয় বাহিনীকে পরাজিত করে মুসলমানদের কাছে তাদের পবিত্র ভূমি জেরুজালেমকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতো বুকে সাহস ও অন্তরে দয়ার সংমিশ্রণ খুব কম সেনাপতির মাঝেই দেখা গেছে। তাঁর মাধ্যমে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার হওয়ার এই গৌরবান্বিত ঘটনার নেপথ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তাঁর মা সিত খাতুন।

কথিত আছে , একদিন সালাহউদ্দিনের বাবা কুরদুনের কমান্ডার নাজম আল-দীন তিকরিতের এক মসজিদে একজন আলিমের সাথে আলাপ করছিলেন। এমন সময় সেখানে একজন তরুণী উপস্থিত হন । পর্দার অপর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি আলিমের সাথে কথা বলতে চান। আলিম তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি তোমার বিয়ের জন্য যে পাত্র পাঠিয়েছিলাম তুমি তাকে কেন প্রত্যাখ্যান করলে?” তরুণীটি উত্তরে বলেন, “আমি চাই এমন একজন সৎকর্মশীল মানুষ যে আমাকে জান্নাতে যেতে সাহায্য করবে এবং আমি তাঁকে এমন একজন সন্তান দিতে চাই যে বড় হয়ে একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে লড়াই করে মুসলিমদের কাছে জেরুজালেমকে ফিরিয়ে দেবে।” তরুণী ও আলিমের এই কথোপকথন শোনার পর নাজম আল-দিন তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আলিমকে বলেন ,“আমি এই তরুণীকে বিয়ে করতে চাই।” এরপর সিত খাতুন নামে সেই তরুণীর সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়।

বিয়ের পর যখন সিত খাতুন গর্ভবতী হন তখন এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন , উনার পেটের ভেতর একটি তরবারি আছে। উনার অনাগত সন্তান যে একদিন বড় সৈনিক হবে মহান আল্লাহর তরফ থেকে এটা তারই ইঙ্গিত তা বুঝতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন।

সালাহউদ্দিন জন্মগ্রহণ করার পর তাঁর মা তাকে একজন ভবিষ্যৎ যোদ্ধা হিসাবে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি ছেলেকে সৈনিকদের জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দিতেন। মুসলিম বীররা যেখানে তাদের তরবারি ও ঘোড়াশাল পরিষ্কার করার প্রশিক্ষণ নিত তিনি ছেলেকে সেখানে তাদের প্রশিক্ষণ দেখার জন্য পাঠাতেন। সেখানে সারাদিন কাটানোর পর শুধু রাত হলেই তিনি ছেলেকে বাড়ি ফিরতে বলতেন।

সালাহউদ্দিন এসব অভিজ্ঞতা থেকে এত কিছু শিখেছিলেন যে, শৈশব থেকে তিনি নিজেও বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ভবিষ্যতে তিনি একজন বড় সৈনিক হয়ে জেরুজালেম উদ্ধার করবেন। শৈশবের এক ঘটনায় তাঁর এই দৃঢ় মানসিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। একবার তিনি বাড়ির কাছে অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলছিলেন। এমন সময় তাঁর বাবা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁকে এভাবে খেলতে দেখে উত্তেজিত হয়ে যান। তিনি সালাহউদ্দিনকে অনেক উঁচুতে উঠিয়ে ধরে বলেন, “তোমার মা তোমাকে এই জন্য জন্ম দেয়নি যে তুমি অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা করে সময় কাটাবে। বরং তিনি তোমাকে এই জন্য জন্ম দিয়েছেন যেন তুমি আল আকসা মসজিদ মুক্ত করতে পার।”এরপর তিনি তাঁর ছেলেকে উঁচু থেকে মাটিতে ফেলে দেন। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি চেহারায় কষ্টের ছাপ দেখতে পান। তখন
তিনি বলেন, “তুমি কি ব্যাথা পেয়েছ?”
সালাহউদ্দিন বলেন, “জি।”
বাবা অবাক হয়ে জানতে চান “তাহলে তুমি কেন চিৎকার দাওনি বা কাঁদনি?”
উত্তরে তিনি বলেন, “আল আকসা মসজিদ মুক্তকারী ব্যথায় চিৎকার দেয় না বা কাঁদে না।”
এই ঘটনা থেকেই শিশু সালাহউদ্দিনের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ পায়। এই সাহসই তাকে শেষ পর্যন্ত সেই বহু প্রতীক্ষিত মহান যোদ্ধায় পরিণত করে যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন এবং আল্লাহর কৃপায় মুসলিমদের কাছে জেরুজালেম ফিরিয়ে এনেছিলেন। তিনি মিশর ও সিরিয়াকেও একত্রিত করেছিলেন এবং মুসলিম ও পশ্চিমা উভয় ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে অঙ্কিত করেছিলেন।

সালাহউদ্দিনের জীবনী থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আল্লাহ্‌ অভিভাবকদের তাঁদের নিয়ত অনুযায়ী সন্তান দান করেন। সালাহউদ্দিনের মা সৎ নিয়ত করেছিলেন এবং সচেতনভাবে চেষ্টা করে গিয়েছিলেন তার ছেলেকে এমন একজন মুসলিম হিসাবে গড়ে তুলতে যে অন্য মুসলিমদের জীবনেও পরিবর্তন আনতে পারবে। তাঁর এই সৎ নিয়ত আল্লাহ কবুল করেছিলেন। সালাহউদ্দিনের অবদানের কারণে মুসলিমরা এখনো জেরুজালেমে বাস করতে পারছে, যা ইসলামের তৃতীয় পবিত্র শহর। এভাবে একজন নারী হয়ত নিজে সৈনিক হতে পারেন না কিন্তু তিনি তার নিজের ঘরে একজন ভবিষ্যত সেনানায়ক তৈরি করতে পারেন। একজন মুসলিমাহর জন্য এই ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়!!

অনুবাদ: রাবেয়া রওশীন

তথ্যসূত্র:

https://www.truth-seeker.info/jewels…/born-good-intentions

https://www.facebook.com/…/when…/769222973091769/ 


লেখাটি শেয়ার করতে পারেন