রাসূল সাল্লা্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ইহুদীদের যে ঝামেলা হয়েছিলো সেটার সময়ক্রম অনুসারে বনু নাদীর ছিলো ২য় গোত্র। বনু কাইনুকাকে নির্বাসনের ঘটনা ঘটেছিল বদরের যুদ্ধের পর, ওহুদের আগে। এই সমসাময়িক সময়েই বনু নাদীর গোত্রেরও ইসলাম বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বনু নাদীর গোত্রের একজন বিশিষ্ট নেতা ছিলো কা’ব ইবনে আল আশরাফ ।বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের নিরংকুশ বিজয়ের অব্যবহিত পরে কা’ব বনু নাদীরের শীর্ষস্থানীয় আরো কিছু নেতাকে নিয়ে আবু সুফিয়ানের সাথে গোপন জোট বাঁধে। এই ব্যাপারটা আবু সুফিয়ানকেও কিছুটা বিস্মিত করেছিলো, তাই সে কা’বকে জিজ্ঞেস করেছিলো, “ আল্লাহর শপথ! দুই ধর্মের মাঝে কোনটা তোমার কাছে আল্লাহর কাছে বেশী পছন্দনীয় মনে হয়?”
আমাদের আশা করি মনে আছে যে তৎকালীন আরবরা ইহুদীদের একটু সমীহের চোখে দেখতো ওদের সমৃদ্ধ সভ্যতার কারণে। আজকাল আমরা যেন ইউরোপ আমেরিকার কাউকে তুলু তুলু করি, সেরকম কিছুটা। কা’ব একজন একেশ্বরবাদী হয়েও কী উত্তর দিয়েছিলো?
তোমরা নিশ্চয়ই ওদের চাইতে বেশী হিদায়াতপ্রাপ্ত!!
আল্লাহ কুরআনে সূরা নিসার ৫০-৫১ নং আয়াতে তাদের এই গোপন কথোপকথনের রেফারেন্স দেন।
বদরের যুদ্ধের অপমানজনক পরিণতির পর আবু সুফিয়ান প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে এটার প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত সে গোসল করবে না । তাই একরকম মরিয়া হয়ে গিয়ে সে ১৫০-২০০ জনের দল একত্র করে মদীনায় মুসলিমদের একটা খেজুর বাগানে আচমকা আক্রমণ করে বসে, কোনো উপলক্ষ ছাড়াই। তারা বাগানটা পুড়িয়ে দেয় এবং দুজন আনসারীকে হত্যা করে, তারপর তড়িঘড়ি করে পালিয়ে যায়। তাদের এই কাজে সর্বোতভাবে সাহায্য করে বনু নাদীর, এমনকি কুরাইশদের আতিথেয়তার কাজও সম্পন্ন হয় ওদের দ্বারা।
এই দুটো বিষয়ই নিঃসন্দেহে মদীনার চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সাহায্য না করার বিষয়টা চুক্তিতে দ্ব্যর্থহীণভাবে উল্লেখিত ছিলো। এছাড়াও তাদের গোত্রের কয়েকজন আসহাবে সুফফাহ কে হত্যার পরিকল্পনাও করে। কিন্তু সেটা কার্যকর হতে পারে নি কারণ এই ষড়যন্ত্রের খবর মুসলিমদের কাছে প্রকাশ হয়ে গিয়েছিলো।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম কিন্তু এগুলোর কোনটার পরই পুরো গোত্রের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন নাই। বনু কাইনুকার ক্ষেত্রেও আমরা হয়তো এটা লক্ষ্য করেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম অপেক্ষায় ছিলেন কখন ইহুদীরা একটা কিছু ভুল করবে আর উনি ওদের বের করে দিবেন, ব্যাপারটা কখনই এমন ছিলো না। বরং ব্যাপারগুলো রাষ্ট্রদ্রোহীতার পর্যায়ে যাওয়া পর্যন্ত তিনি ধৈর্য্য ধারণ করেছেন। তবে ব্যক্তিবিশেষের ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো, যেমন কা’ব ইবনে আল আশরাফকে হত্যার নির্দেশ এসেছিলো স্বয়ং নবীজীর কাছ থেকে।
যাই হোক, বনু নাদীরকে নির্বাসনের ঘটনা কেন ঘটেছিলো সেটা জানতে হলে আমাদের জানতে হবে ‘বীর মাঊনার হত্যাকাণ্ড’ সম্পর্কে। এটা একটু সংক্ষেপে বলছি। বীর মাউনা নামের উত্তর আরবের এক গোত্র প্রধান মদীনাতে এসে ইসলামের বাণী দ্বারা মুগ্ধ হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের কাছে অনুরোধ করে যেন কিছু সাহাবীকে উনার সাথে পাঠানো হয় যারা তার গোত্রের মাঝে ইসলাম প্রচার করবে। সে সাহাবীদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দান করে। তখনকার সময়ে এক গোত্রের সাথে অন্য গোত্রের চুক্তি থাকা মানে এক গোত্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়া জোটভুক্ত সব গোত্রের থেকে নিরাপদ থাকার নামান্তর। তাই এটা ছিলো অনেকগুলো গোত্রের মাঝে ইসলামের আদর্শ প্রচার করার একটা সুবর্ণ সুযোগ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম এই বিপুল সম্ভাবনার চিন্তা করে আসহাবে সুফফাহর একদম শ্রেষ্ঠ ৭০জন সাহাবীকে পাঠান। কিন্তু একই অঞ্চলের একজন স্থানীয় গোত্র প্রধান আমীর ইবনে তুফায়েলের নির্দেশে (যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে কথা দিয়েছিলেন, সে না, আরেকজন যার সাথে এই গোত্রের চুক্তি ছিলো) চরম বিশ্বাসঘাতকতা দেখিয়ে এই সবগুলো সাহাবীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, বেঁচে যান শুধু একজন সাহাবী, আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের কাছে ফিরে আসার সময় পথিমধ্যে উনি দুজন ব্যক্তির দেখা পান যারা ছিলো আমীর ইবনে তুফায়েলের গোত্রের লোক। ঘটনাক্রমে ওই দুই ব্যক্তি আবার নবীজির কাছ থেকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলো। আমর (রা:) এগুলো কিছুই জানতেন না, উনি মাত্র সাথীদের যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেখে এসেছেন তাতে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ঘুমের মধ্যে ওই দুই ব্যক্তিকে হত্যা করেন, পরে আবিষ্কার করেন যে তাদের সাথে চিঠি আছে যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের দেয়া নিরাপত্তার কথা উল্লেখিত আছে। আমর (রা:) মদীনাতে ফিরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামকে বিস্তারিত খুলে বলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম পুরো ঘটনা শুনে যারপরনাই ব্যাথিত হন এবং ওই দুই ব্যক্তিকে হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে তৎকালীন আরবের নিয়ম অনুসারে রক্তপণ প্রদান করেন। এই ঘটনা থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। সেটা হল, ইসলামের বিধান অনুযায়ী কোনো গোত্র/ জাতি/ পরিবারের একজন কোনো অপরাধ করলে সেটার শাস্তি ঐ গোত্র/ জাতি/ পরিবারের নিরপরাধ কেউ পেতে পারে না। কিন্তু এমনটাই যদি ইসলামের শিক্ষা হয়, তাহলে বনু নাদীরের পুরো গোত্রকে কেন নির্বাসিত করা হয়েছিলো?
বিস্তারিত জানবো পরের পর্ব গুলোতে ইনশাআল্লাহ।
footnote 1: কা’ব ইবনে আল আশরাফকে হত্যার ঘটনা নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের উপর বিষেদ্গার করা হয়, কিন্তু আমরা সেই ঘটনার বিস্তারিততে যাবো না যেহেতু এটা আমাদের টপিকের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না। শুধু এটুকু বলবো যে তৎকালীন আরবের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডার্ডের সাথে এটা পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম এই হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে। আমরা আমাদের সময়ের নিয়ম কানুন সেই সময়ের উপর চাপাবো না, এটা কেন অনুচিত সেটা আমাদের আলোচনার শুরুতেই আমি বলে নিয়েছি। আর আমাদের সময়ে USA যেভাবে ড্রোনের মাধ্যমে নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষ ও শিশুদের হত্যা করেছে সেটা কোন নৈতিকতার কোন মানদণ্ড অনুযায়ী উচিৎ সেটা আল্লাহ জানেন!
footnote 2:
স্বামী স্ত্রীর একান্ত সম্পর্কের পর গোসল করার প্রথা তৎকালীন আরবেও ছিলো
footnote 3:
আসহাবে সুফফাহকে মদীনার আলেম গোষ্ঠী বলা যায়, যারা নিবেদিত প্রাণ ছিলেন ইসলাম শেখার কাজে