Let’s ponder over Quran!!

লেখাটি শেয়ার করতে পারেন

পর্ব ১


আসসালামু আলাইকুম সবাইকে! কেমন ভাবে শুরু হল মহিমান্বিত মাসটা?

রামাদ্বানে যেসব ইবাদাত করবো ভেবেছি তার মাঝে কি ‘কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করা’ আছে?

আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বলে যে এইটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে Neglected ইবাদাত among Muslims!

এবারের রমাদ্বানে যদি এই সংক্রান্ত কিছু এক্সারসাইজ করি তাহলে কেমন হয়?

আশা করি এতদিনে আমরা সবাই জানি যে, কুরআনের স্টাইলটা হচ্ছে কথোপকথনের। মানে আল্লাহ এখানে আমাদের সাথে কথা বলছেন। এই ব্যাপারটা না বুঝে শুধু কুরআনের অনুবাদ পড়ে গেলে খাপছাড়া মনে হওয়া অস্বাভাবিক না। তাই কুরআন পড়ার মজা আহরণ করতে হলে, এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হলে তিনটা কাজ করা জরুরি:

১. আরবী কুরআন যে কুরআন এটা সবসময় মাথায় রাখতে হবে।

২. একটা টপিক কুরআনে যতবার এসেছে সেগুলোকে একসাথে করে তারপর পড়তে হবে (’শিকড়ের সন্ধানে’ বইটাতে এই কাজটা বারবার করার চেষ্টা করা হয়েছে)

৩. কুরআনের আয়াতগুলো দুআ তে পরিণত করতে হবে।

আমরা যে এক্সারসাইজগুলো করবো সেটাতে এই বিষয়গুলোর উপর বারবার আলোকপাত করা হবে ইনশাল্লাহ।

শুরু করা যাক একটা প্রশ্ন দিয়ে:

‘ কুরআনের কোন দুআ প্রতিদিন একাধিকবার পড়া আল্লাহ আমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন?’

Hints: উম্মুল কুরআন হিসেবে পরিচিত সূরায় এটা বলা আছে, সুনির্দিষ্ট করে আয়াতটা উল্লেখ করবেন , শুধু সূরার নাম না।

আগামী পর্ব এ উত্তর দিবো ইনশাল্লাহ এবং ছোট্ট আলোচনার মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করবো যে কুরআন আরবীতে না বোঝায় আমরা কী অমূল্য রত্ন হারাচ্ছি!

পর্ব ২


সঠিক উত্তর হলো দুআটা হচ্ছে, ”ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম” (এখান থেকে শুরু করে সূরার শেষ পর্যন্ত ও বলা যায়, তবে আমাদের আজকের ফোকাস থাকবে শুধু এই অংশটা)।
এই আয়াতের অর্থ কী? যে কোনো ইংরেজি/ বাংলা অনুবাদ যদি পড়ি কী দেখবো?
ইংরেজি: Guide us to the straight path
বাংলা: আমাদের সরল পথ দেখাও
এখন যদি বলি এটা একটা অসম্পূর্ণ অনুবাদ? আসুন আরবী বাক্যটির অর্থ ভেঙে ভেঙে দেখি।

ছবিটা খেয়াল করলে দেখবো যে, এখানে কোথাও To শব্দটা নাই যেটার আরবী হচ্ছে إلى । তাহলে কেন আমরা বলি Guide us to the straight path?
আরবী কুরআনে এরকম অনেক শব্দ উহ্য থাকে যার মাধ্যমে অর্থের দ্যোতনা, ব্যাপ্তি অনেক বৃদ্ধি পায়। এই আয়াতটি সেটার ক্লাসিক্যাল উদাহরণ। এখানে উহ্য শব্দটা হতে পারে إلى অথবা على। তাহলে ইংরেজি অর্থ হওয়া উচিৎ GUIDE US TO/ UPON THE STRAIGHT PATH.
আগেরটার সাথে এটার পার্থক্য কী? Guide us to মানে আমি পথ খুঁজে পাচ্ছি না, আমাকে সঠিক পথ কোনটা দেখাও। তাহলে যখন আমরা বুঝি যে ইসলামই সত্য এবং মন থেকে এটা প্র্যাক্টিস করছি তাহলে এই দুআ প্রতিদিন পড়ার মানে কী?
এখানেই Twist! যদি ধরে নেই যে আয়াতটির অর্থ Guide us upon the straight path , তাহলে যে অলরেডি সরল পথে আছে, এই দুআ তার জন্যও প্রযোজ্য হবে।
মানে Guidance বা হিদায়াত কোনো স্থায়ী সম্পত্তি না যে একবার পেয়ে যাওয়া মানেই এই দুআর প্রয়োজন নাই!
জটিল মনে হচ্ছে? GPS এর সাথে তুলনা করলে ব্যাপারটা বোঝা খুব সহজ হবে। অচেনা রাস্তায় চলতে গেলে আজকাল গাড়িতে GPS ব্যবহার করা হয়। শুধুই কি সঠিক পথ খুঁজে পাওয়ার জন্য? নাহ, সঠিক রাস্তা খুঁজে পাওয়ার পর সেটার উপর অবিচল থেকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্যও কিন্তু আমাদের সাহায্য লাগে।
আর এইজন্যই সম্ভবত আল্লাহ আমৃত্যু এই দুআ পড়া আমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন, ঈমানের যেই স্তরেই থাকি না কেন।
বর্তমান সময়ে ইসলাম পালন করতে গেলে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সম্ভবত সঠিক মত কোনটা এটা চিহ্নিত করা। এত কনফিউশন চারদিকে! কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির এক নোংরা কালচারে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এহেন পরিস্থিতিতে সূরা ফাতিহার অর্থের ব্যাপ্তি আমাদের জন্য হতে পারে একটা বিশাল স্বস্তির উৎস।
কার লেকচার শুনবেন, কোন বই পড়বেন, কে ঠিক কথা বলছে এগুলো নিয়ে দ্বিধায় ভুগেছেন?একদম মন থেকে সূরা ফাতিহাটাই পড়ি আসেন। সাথে নিচের দুআ টা complementary হতে পারে।
হে জিবরাইলের রব, মিকাইলের রব, ইসরাফিলের রব! হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা! হে দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী! আপনার বান্দারা যে নিয়ে মতভেদ করে, আপনি তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা হয়েছে সে বিষয়ে আপনি আমাকে পথ দেখান। আপনি যাকে ইচ্ছা করেন, তাকেই সরল পথ দেখান (সহীহ মুসলিমঃ ৭৭০)


আগামীদিনের চিন্তার খোরাক : সূরা ফাতিহার প্রথমদিকের আয়াতগুলো থেকে আমরা দুআ করার একটা গুরুত্ব পূর্ণ আদব শিখতে পারি। কী সেটা?
কুরআনে উল্লেখিত অন্য দুআ গুলোতেও কি আপনার এমন প্যাটার্ণ পাই? উদাহরণ দিন, যে কোনো…

পর্ব ৩


সূরা ফাতিহার প্রথম দিকের আয়াতগুলোতে আমরা আগে আল্লাহর প্রশংসা করে নিচ্ছি, তাকে তার গুণবাচক নামগুলো ধরে ডাকছি। এটাই দুআ করার একটা খুব গুরুত্ব পূর্ণ আদব, যেটা সূরা ফাতিহা থেকে শিখি।
আচ্ছা জীবনে কি এমন কখনো হয়েছে যে অনেক দুআ করার পরও সেটা কবুল না হওয়ায় আল্লাহর উপর রাগ উঠেছে? কিংবা নিদেনপক্ষে অভিমান হয়েছে?
আমাদের সবারই হয়তো কমবেশি এমন অভিজ্ঞতা আছে।
এটা কেন বা কখন হয়?
যখন আমরা আল্লাহকে চিনি না।
যেমন ধরেন, কুরআনে শিখিয়ে দেয়া অধিকাংশ দুআ গুলো শুরু হয়েছে রাব্বানা দিয়ে, মানে আমরা আল্লাহকে রাব হিসেবে মেনে নিয়ে দুআ করছি। এই রাব মানে কী?
এটার একটা অর্থ হচ্ছে mentor, যার কাজ হচ্ছে যখন যেটা দরকার তখন সেটা দেয়া। একজন শিক্ষক যেমন ছাত্রদের অবস্থা বুঝে lesson plan তৈরি করেন, তেমন ব্যাপারটা। একটু গভীরভাবে ভাবলে এই একটা উপলব্ধি জীবন বদলে দিতে পারে…
কিভাবে?
আমরা যদি ভিতর থেকে বিশ্বাস করি যে জীবনে যখন যা কিছু পেয়েছি বা পাই নি সেটা ডিজাইন করেছেন একজন mentor যিনি জানেন কখন কোন অবস্থায় আমাদের কী দিতে হবে।
তাই আমাদের সব দুআ হয়তো manifest হয় নাই। দুআ manifest না হওয়ার মানে এই না যে দুআ কবুল হয় নাই।
কী বলছি?
জ্বী, আমাদের সব দুআ কবুল হয়, সব! কখনো যেটা চাই সেটা তখনই দেন, কখনো তার চেয়ে বেশি কিছু দেন, কখনো খারাপ কিছু থেকে রক্ষা করেন আর কখনো পরকালে দিবেন বলে তুলে রাখেন!
তাই শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন থাকা উচিত। দুআ কবুলের গল্প না বলে বলা উচিত দুআ manifest হওয়ার গল্প!
এভাবে যখন ভাবতে শিখবো, তখন কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর প্রতি সুধারণা নষ্ট হবে না। আর তখনই ইনশাল্লাহ আমরা যাকারিয়া আলাইহিস সালামের মত বলতে পারবো- ”হে আমার রব, তোমাকে ডেকে আমি কখনো রুষ্ট (displeased) হইনি।” (১৯:৪)
আমরা সবাই জানি যে, এটা যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সন্তান চেয়ে যে দুআ করেছিলেন সেটার অংশ বিশেষ।
আচ্ছা যাকারিয়া কি এই প্রথম সন্তানের জন্য দুআ করেছিলেন?
অবশ্যই না!
তাহলে কী শিখলাম?
অসংখ্যবার একটা জিনিস চাওয়ার পরও যদি সেই দুআ manifest না হয়, তার পরও সেটা চাইতে পারা এবং এই পুরো সময়টাতে আল্লাহর উপর সুধারণা রেখে চলা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ, অথচ খুবই গুরুত্বপূর্ন ইবাদাত কিন্তু।
এই ইবাদাত কি রামাদ্বানে লিস্টে আছে? দুআ লিস্টে কি এটা রেখেছি যে আল্লাহ তোমার প্রতি সুধারণা রাখা অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়?

আগামী দিনের চিন্তার খোরাক:
১। সূরা মারইয়াম এর প্রথম দিকের আয়াতগুলোতে যেখানে যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সন্তানের জন্য দুআ করছেন তখন উনি সন্তানের মাঝে কোন বৈশিষ্ট্য চাচ্ছেন?
২। এখান থেকে আমরা কুরআন/ হাদীসে উল্লেখিত দুআগুলোর কোন বৈশিষ্ট্য টের পাই? যখন চাওয়াগুলো মিলে যায় তখন নিজেদের ভাষায় দুআ করার চাইতে আল্লাহ ও রাসূলের শিখানো দুআগুলো করলে কী সুবিধা?

পর্ব ৪


কুরআন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার একটা সৌন্দর্য হচ্ছে অনেক সময়ই এতে right/ wrong উত্তর থাকে না। আমি হয়তো একভাবে চিন্তা করছিলাম, কিন্তু আপনাদের উত্তর থেকে চিন্তার আরো খোরাক পাই, নিজে ঋদ্ধ হই আলহামদুলিল্লাহ।

আমি যখন জাকারিয়া আলাইহিস সালামের দুআ টা নিয়ে ভাবছিলাম, আমার ফোকাস ছিল সূরা মারইয়াম এর ৬ নং আয়াতের শেষ অংশ- এমন সন্তান যার উপরে আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকবেন।

এবার আমার একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি। প্রেগন্যান্সির জার্নি আমার কাছে কেন যেন খুব ভয়ের লাগতো। তাই আমি সবসময় যখন কারো গর্ভকালীন জটিলতার কথা শুনতাম, সেটা যেন আমার না হয় এভাবে দুআ করতাম। যখন সত্যি সত্যি প্রেগন্যান্ট হলাম, তখন একটা বিষয় অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম – আমি যা কিছু জন্য দুআ করেছি সেগুলো কিছু হয়নি, কিন্তু অন্য নানা জটিলতা এসেছে যেগুলো আমার মাথাতেই আসে নি কখনো।

এই ঘটনা থেকে আমি বুঝলাম যে আমাদের চিন্তার পরিধি কত সীমিত। তাই আগে আমি বাচ্চার জন্য যেভাবে দুআ করতাম সেটা বদলে ফেললাম। আগে কিভাবে করতাম?

আল্লাহ আমার অনাগত সন্তানের মধ্যে যেন অমুক অমুক কোয়ালিটি থাকে।

জাকারিয়া আলাইহিস সালামের দুআ টা পড়ার পর আমার মনে হল It says it all! আমি আসলে চাই আমার সন্তানের উপর আল্লাহ যেন সন্তুষ্ট থাকেন। ব্যাস!

একই কথা সূরা ফুরক্বানের ৭৪ নং আয়াতের জন্যও প্রযোজ্য! আমি চাই আমার জীবন সঙ্গী ও সন্তান যেন আমার চক্ষু শীতলকারি হয়।

মানুষের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা নিজেরাই জানি না আমরা কী চাই। আল্লাহ, আমাদের সৃষ্টিকর্তা সেটা জানেন বলেই আমাদেরকে দুআর শব্দ গুলোও শিখিয়ে দিয়েছেন!

তাই এক কথায় গত দিনের ২য় প্রশ্নের উত্তর হল – কুরআন হাদীসে বলে দেয়া দুআগুলো comprehensive, আর আমাদের বানানো দুআ গুলো বাহুল্য, খাপছাড়া, অপরিকল্পিত।

কুরআন হাদীসে বলে দেয়া দুআ গুলো পড়লে আমার কেমন যেন একটা কান্না আসে। মনে হয়, Yes! আমিতো এটাই বলতে চেয়েছিলাম। এই অনুভূতি সবচেয়ে তীব্র হয়েছিল ইস্তেখারার দুআ পড়ার পর। এত সুন্দর, এত সুন্দর এই দুআর শব্দ চয়ন যে আমার মনে হয় বলি – তোমাকে ভালোবাসি ইয়া রব!

তাই রমাদ্বানে সম্ভাব্য একটা ইবাদত হতে পারে –

১) কুরআন হাদীসে বর্ণিত দুআ গুলো ভালোভাবে জানা এবং চেক করা যে কোন দুআগুলো আমার বর্তমান চাওয়ার সাথে মিলে যায়।

২) কুরআনের যে কোনো আয়াতকে কিভাবে দুআ তে পরিণত করা যায় সেটা বোঝা।

২য় কাজটা আমার অসম্ভব প্রিয়। কুরআন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার জন্য এটা খুবই কার্যকরী কৌশল মনে হয় আমার কাছে।

আগামী দিনের করণীয় :

১. ৪০টা রাব্বানা দুআর লিস্ট আজকাল সার্চ দিলেই পাওয়া যায়। সেগুলো একটু ভালো করে পড়বেন এবং চিন্তা করবেন যে কোনগুলো আপনার বর্তমান চাওয়ার সাথে একদম মিলে যাচ্ছে। অনুরোধ থাকবে কমেন্টে উল্লেখ করার জন্য।

২. কুরআনের যে কোনো আয়াতকে কিভাবে দুআ তে পরিণত করা যায় সেটার উপর আমার একটা লেখা ছিল, সেটা পড়বেন এবং randomly কুরআন খুলে যে আয়াত চোখে পড়ে সেটাকে কিভাবে দুআতে পরিণত করা যায় সেটা ভাববেন, তারপর কমেন্টে লিখবেন যে আয়াতটা কী ছিল, সেটাকে কিভাবে দুআতে পরিণত করেছেন।

পর্ব ৫


প্রথমেই আমার অনুভূতি বলি, কুরআনে সরাসরি উল্লেখিত দুআগুলো নিয়ে। সূরা নামলের ১৯ নং আয়াতে উল্লেখিত দুআটা আমার খুবই পছন্দের-
” রাব্বি (হে আমার রাব), তুমি আমার প্রতি ও আমার পিতামাতার প্রতি যে অনুগ্রহ দান করেছ তার কৃতজ্ঞতা আদায়ের শক্তি দান করো আর যাতে এমন সৎকাজ করতে পারি যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও আর তোমার অনুগ্রহ বশতঃ আমাকে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো।’’
একটা অনুরূপ দুআ হচ্ছে সূরা আহকাফের ১৫ নং আয়াতে-
” রাব্বি (হে আমার রাব), তুমি আমার প্রতি ও আমার পিতামাতার প্রতি যে অনুগ্রহ দান করেছ তার কৃতজ্ঞতা আদায়ের শক্তি দান করো আর যাতে এমন সৎকাজ করতে পারি যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও, আমার সন্তানদেরকে সৎকর্মপরায়ণ কর, আমি তোমার প্রতি তওবা করলাম এবং আমি অনুগত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত”।


এখন আসুন এই দুআ গুলো নিয়ে একটু চিন্তা করি। আজকে কথা বলবো শুধু সূরা নামলের দুআটা নিয়ে।একটা অভ্যাস আমাদের গড়ে তোলা খুব জরুরী, কুরআনের যে কোনো আয়াত খণ্ডিতাংশ না পড়ে পুরোটা বা আগের/পরের আয়াত সহ মিলিয়ে পড়া। তাহলে দেখি যে সূরা নামলের দুআটা কোন প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে। আগের আয়াতটা পড়লেই আমরা বুঝবো যে এই দুআ সুলাইমান আলাইহিস সালাম করেছিলেন এবং পিপড়াদের ভাষা বোঝার পর।
আমরা সবাই জানি যে, পশু পাখিদের ভাষা বোঝার এই অনন্য ক্ষমতা শুধু সুলাইমান আলাইহিস সালামকেই দেয়া হয়েছিলো। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো? আল্লাহর একটা রহমত উপলব্ধি করার পর উনি এই দুআটা করেছিলেন।


এখন এই দুআর ব্যাপারে আমার অনুভূতি একটু শেয়ার করি। আমি মাঝে মাঝেই শুনি যে ‘শিকড়ের সন্ধানে’ বইটা পড়ে মানুষ কিভাবে উপকৃত হয়েছেন। এটা শোনার পর আমার প্রতিক্রিয়া কী হয়?
১) আলহামদুলিল্লাহ্‌, আল্লাহ আমাকে এই কাজটা করার সুযোগ দিয়েছেন
২) আল্লাহ যেন কাজটা ক্ববুল করে নেন
৩) আমার আব্বা আম্মাকে যেন এই কাজের সাওয়াবের কপি দেন কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ,আমার আব্বার দুআতে আমি হিদায়াত পেয়েছি এবং আম্মার পড়ুয়া স্বভাব না পেলে এই বই লেখার জন্য প্রয়োজনীয় পড়াশোনা করার ধৈর্য্য আমার হতো না
৪) আল্লাহ যেন এমন আরো কাজ করার তৌফিক্ব দেন

এখন আসেন তো একটু চিন্তা করি যে এই সবগুলো অনুভূতি সূরা নামলের দুআটা দিয়ে কাভার হয়ে গেছে কী না?
Amazing না? এটাই বলেছিলাম যে কুরআন হাদীসে উল্লেখিত দুআগুলো Comprehensive! তবে ‘শিকড়ের সন্ধানে’ বইটার ইতিবাচক ফিডব্যাক শোনার পর আমার আরেকটা অনুভূতি হয় যেটা সূরা নামলের দুআতে নেই যেটা সূরা আহকাফের দুআতে কাভার করা হয়েছে।
কী সেটা কেউ বলতে পারবেন? সূরা আহকাফের দুআর আয়াতটা আমাদের মেয়েদের জন্য বিশেষভাবে খুব প্রশান্তিদায়ক। কেন কেউ বলতে পারবেন?
এই আয়াতে একটা Tragedy of life ফুটে উঠেছে পরোক্ষভাবে। সেটা কী, কেউ বলতে পারবেন?

পর্ব ৬


যারা সূরা নামলে উল্লেখিত দুআ নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছেন যে এখানে সন্তানদের কথা উল্লেখ করা হয় নাই যেটা সূরা আহকাফে আছে। এই ব্যাপারটা দারুণ লাগে আমার কাছে।
যদি আপনার সন্তান থাকে তাহলে সূরা আহকাফের দুআটা পড়বেন, না থাকলে সূরা নামল কারণ আগের অংশগুলো মোটামুটি একই।
যাদের সন্তান নেই তাদের সূরা আহকাফের দুআটা পড়ে কষ্ট হবে না আর ইনশাল্লাহ! সুন্দর না ব্যাপারটা?
যেহেতু শিকড়ের সন্ধানে বইটার প্রেক্ষিতে দুআগুলো নিয়ে কথা বলছিলাম, তাই আবারও ফিরে আসছি সেই প্রসঙ্গে। আমি বইটার টপিক নিয়ে লেখা শুরুই করেছিলাম পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে, তারা যেন জেনে বড় হয় যে আমরা কেন মুসলিম, আমাদের মত অনেক বেলা পার হয়ে যাওয়ার পর আবিষ্কার করতে না হয়। তাই আমি খুব আকুলভাবে চাই যে আমার মেয়ে ইসলাম ভালোবেসে পালন করুক, রীতি নীতির শিকল পরে বাধ্য হয়ে না। সেই আকুতি টা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে সূরা আহকাফের দুআতে। সন্তানদের জন্য আরো দারুন কিছু দুআ আছে ২৫:৭৪, ১৪:৪০-৪১ আয়াতে।
এসব দুআ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ইসলাম একা পালন করার বিষয় না। এটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যেন চলমান থাকে সেটার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত। তাই আমার খুব খারাপ লাগে যখন দেখি যে মসজিদে বাচ্চারা ছোটাছুটি করলে এক শ্রেণীর মুরুব্বীরা খুব রেগে যান, তাদের নামাজের মনোযোগ ব্যহত হয় বলে। অথচ আমরা ভুলে যাই যে এই ছোট ছোট বাচ্চারা ভবিষ্যত মুসলিম। তারা যদি মসজিদে খুব স্বাগতম বোধ না করে তাহলে মসজিদে আর আসতে চাইবে না। এভাবে আমরা বাচ্চার মায়েদের মসজিদে আসার পথও রুদ্ধ করে দেই, অথচ তারা বিষন্নতা, ক্লান্তি এমন নানা অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যান, মসজিদে যেতে পারলে তাদেরও খুব ভালো লাগতো!
সূরা আহকাফের দুআর আরেকটা দারুন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে মায়েদের মাতৃত্বের যাত্রার কষ্টগুলোকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আমাদের রাব কর্তৃক এই স্বীকৃতিটা নতুন মায়েদের জন্য যে কী ভয়ংকর রকম প্রশান্তিদায়ক সেটা বলে বুঝানো সম্ভব না। নির্ঘুম রাতগুলোতে বাচ্চাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, এই কাজগুলোর স্বীকৃতি আমরা পরিবার থেকে অধিকাংশ সময় তো পাইই না উল্টা বরং নতুন মায়েদের শুনতে হয় যে কিছু পারে না, বাচ্চার যত্ন হচ্ছে না ইত্যাদি।
Lastly, এই আয়াতে একটা ট্রাজেডি ফুটে উঠেছে বলে আমার কাছে মনে হয়। এখানে মানুষ পূর্ণ বয়সে পৌঁছানোর পর এই দুআ করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণত আমরা আমাদের মা -বাবাদের কষ্ট, ত্যাগ গুলো বুঝতে পারি নিজেরা মা -বাবা হওয়ার পর। এটা খুব দেরী হয়ে যেতে পারে যদি আমাদের মা-বাবার জীবদ্দশায় আমরা মা-বাবা না হতে পারি। তখন প্রচণ্ড আফসোস হতে থাকে।
কিন্তু তারপরও সব দরজা কি বন্ধ হয়ে যায়?
নাহ, সূরা আহকাফের আয়াতেই Golden Solution রয়েছে।
কী সেটা?
তওবা করা!
নিজেদের ফেলে আসা জীবনের ভুলগুলোর জন্য তওবা করে আমরা সহজেই আমাদের মা-বাবার জন্য সাদকায়ে জারিয়া হতে পারি। তখন কী মনে হবে?
আমি যে ভুল করেছি সেটা যেন আমার সন্তানেরা না করে!
আর সেজন্যই সূরা আহকাফের দুআটা অসাধারণভাবে আগের পরের সব প্রজন্মকে এক সুতায় গাঁথছে!


আগামী দিনের করণীয়ঃ
১। কুরআনের অন্যান্য দুআগুলো নিয়ে এভাবে ভাববো
২। যে কোনো একটা আয়াত নির্বাচন করে সেটাকে দুআতে পরিণত করার চেষ্টা করবো, কমেন্টে লিখবো।

পর্ব ৭


কুরআনের আয়াতকে দুআ বানানোর প্রচেষ্টায় সূরা ফুরক্বন আমার খুব প্রিয় সূরা। যারা শিকড়ের সন্ধানে বইটা পড়েছেন তারা হয়তো খেয়াল করবেন যে মোটিভেশন হিসেবে আমি ৩০ নাম্বার আয়াতটা উল্লেখ করেছি – আমি/ আমার আশে পাশের মানুষ যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত না হয় যাদের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলে নবীজী বলবেন যে এরা কুরআনকে পরিত্যাগ করেছে!
আজকে কথা বলবো এই সূরার আরেকটা আয়াত নিয়ে যেটাকে শক্তশালী দুআতে পরিণত করা যায়- ৭০ নাম্বার আয়াত।
এখানে আল্লাহ বলছেন যে তওবা করে ঈমান আনয়ন ও সৎকর্ম করার পর উনি আমাদের গুনাহ গুলোকে সওয়াবে পরিণত করে দিবেন।
কী amazing ব্যাপার না?
কখনো কি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি এটা?
গভীরভাবে উপলব্ধি করলে বুঝবো যে আমাদের গুনাহ গুলো দিয়ে একাধিক বিষয় হতে পারে –
১. শাস্তি পেতে হতে পারে
২. আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন কিন্তু আমলনামায় থেকে যাবে ( আল্লাহ গাফুরুর রহীম তাই এমন করেন)
৩. আল্লাহ কাজগুলো মুছে দিবেন, যেন আমলনামায় কখনো অস্তিত্ব ছিল না এগুলোর (শবে ক্বদরের দুআতে উল্লেখিত শব্দটার মানে আমরা জানি নিশ্চয়ই সবাই, না জানলে জেনে নিবো প্লিজ)
৪. এটা একদম শ্রেষ্ঠ অবস্থা, আল্লাহ গুনাহগুলোকে সওয়াবে পরিণত করে দিবেন।
এই আয়াতে আমরা একদম বেস্ট পরিণতির জন্য দুআ করছি। এখন এই দুআ টাকে প্রাণ দিতে পারি কিভাবে?
আসুন ফেলে আসা জীবনের আমলনামার দিকে তাকাই। কোন পাপের জন্য আমাদের অনুশোচনা সবচেয়ে তীব্র, সবচেয়ে খারাপ লাগে?
আসুন সেই পাপের কথা উল্লেখ করে আল্লাহকে বলি।
সাথে একটা কল্পনা করি। ধরেন দুইটা পাহাড় ছিল, একটা খুব ছোট, আরেকটা বিশাল। হঠাৎ বিশাল পাহাড়ের অধিকাংশ মাটি ছোট পাহাড়ে চলে আসলো।
মানে আমাদের গুনাহের পাহাড় ছিল বিশাল, আল্লাহ সেগুলোকে সওয়াবের ছোট পাহাড়ে ট্রান্সফার করে দিলেন, ফলে সওয়াবের পাহাড় হয়ে গেলো ভাবনার চেয়েও বড়!
কেমন হবে তাহলে?
এটা হচ্ছে visualization technique যেটা দুআকে জীবন্ত করে বলে আমার মনে হয়। যেমন গুনাহ মাফের দুআ করার সময় আমি মাঝে মাঝে ভাবি যে আমি সমুদ্র তীরে দাড়িয়ে আছি, একের পর এক ঢেউ এসে বালির উপর লেখা নাম যেমন মুছে দেয়, সেভাবে আমার গুনাহ গুলো গফুরুর রহীম মুছে দিচ্ছেন!
আল্লাহ যেন কবুল করেন!


চিন্তার খোরাক: এই সূরার ৬৬ নাম্বার আয়াতে জাহান্নামের দুইটা বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে। ৭৬ নাম্বার আয়াতে জান্নাতের একই দুইটা বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে। এই দুইটা আলাদা করে বলার উদ্দেশ্য কী? আমরা কি দুআ করবো যে আল্লাহ জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও? নাকি আরো বেশি কিছু?

পর্ব ৮


আলহামদুলিল্লাহ্‌, যারা উত্তর দিয়েছিলেন তারা সূরা ফুরক্বানের ৬৬ এবং ৭৬ নাম্বার আয়াতে উল্লেখিত জাহান্নাম ও জান্নাতের বৈশিষ্ট্যদ্বয়ের তাৎপর্য ঠিকভাবেই চিহ্নিত করতে পেরেছেন। এখানে مُسْتَقَرًّا (বাসস্থান ) শব্দটা দিয়ে স্থায়ী আবাস ও مُقَامًا (অবস্থানস্থল) শব্দটা দিয়ে সাময়িক একটা দাঁড়ানোর জায়গা বুঝানো হয়েছে। আগের পর্বে Visualization Technique এর কথা বলেছিলাম না? আসুন এবারেও সেটা প্রয়োগ করি।
মনে করি যে আমরা একদম অল্প সময়ের জন্য বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছি বা বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচার জন্য কোনো দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়েছি। আমরা জানি যে এখানে আমি অল্প একটু সময় আছি। বাসটা চলে আসলে/ বৃষ্টি থামলেই চলে যাবো। তখন সেই জায়গাটা যদি খুব দুর্গন্ধময় বা কষ্টদায়ক হয় আমাদের কি অসহ্য লাগবে? হয়তো না।
আল্লাহ কী বলছেন?
আল্লাহ বলছেন যে জাহান্নাম এরকম সাময়িক Resting Place হিসেবেও খুবই খারাপ। এটা আমাদের মত জন্মগতভাবে মুসলিমদের জন্য একটা বিশাল সতর্কবার্তা। কালিমা পড়লেই একসময় জান্নাতে যাওয়া যাবে এই ধারণা পেয়ে বেড়ে ওঠা এই আমরা কি আসলে জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে সম্যক অবগত?
আসুন দেখি কুরআন কী বলছে। এই মুহুর্তে মনে পড়ছে সূরা কাহফের (১৮ নং সূরা) ২৯ নং আয়াত, সূরা ফুরক্বানের (২৫ নং সূরা) ১৩-১৪ নং আয়াত, সূরা নাবার (৭৮ নং সূরা) ২৩-২৫ নং আয়াত, সূরা সাফফাতের (৩৭ নং সূরা) ৬২-৬৭ নং আয়াত ইত্যাদির কথা যেখানে জাহান্নামের বর্ণনা দেয়া আছে।
এগুলো পড়ার পর কি আমাদের মনে এই দুআ আসা উচিৎ যে আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও?
আসুন আবার একটা কল্পনা করি।
আপনাকে বিশাল বড় LED স্ক্রিনে দেখতে হচ্ছে যে মানুষ আগুনে পুড়ে মারা যাচ্ছে, বাঁচার জন্য চিৎকার করছে। বহুতল বিল্ডিং এ আগুন লাগার এমন ঘটনার কথা তো আমরা অনেকই জানি, সেগুলোই সহ্য করার মত না, তাহলে জাহান্নামের আগুনে যদি আমি নাও পরি, অন্যরা পরছে সেটা কি সেটা কি উপভোগ্য কিছু হবে?
তাহলে আমাদের দুআ হওয়া উচিৎ না যে জাহান্নামকে যেন চোখেই দেখতে না হয়, নিজে যাওয়া তো দূরের কথা?
তাই কি?
সেটা বোঝার জন্য আসুন আরেকটা দৃশ্য কল্পনা করি। আপনি একজন মা, আপনার সন্তানকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেছে, আপনি তাকে দেখতে পাচ্ছেন না কিন্তু আপনি তার চিৎকার করে কান্না শুনতে পাচ্ছেন। কেমন লাগবে? বুকটা ফেটে যাবে না?
তাহলে জাহান্নামে অন্য মানুষকে ফেলা হচ্ছে, তারা বাঁচার জন্য চিৎকার করছে, সেটা কি না দেখলেও শুনতে ভালো লাগবে?
অবশ্যই না। আর সেইজন্যই সূরা ফুরক্বানের ১২ এবং মূলকের (৬৭ নং সূরার) ৭-৮ নং আয়াত পড়ার পর থেকে আমি দুআ করি যে আল্লাহ এমন আমল করার তৌফিক্ব দাও যেন জাহান্নামের শব্দও শোনা না লাগে।
এটা ছিলো আমার মস্তিষ্ক প্রসূত একটা দুআ। তারপর সেদিন যখন সূরা আম্বিয়া (২১ নং সূরা) ১০২ নং আয়াত পড়লাম, মনে হল সুবহানাল্লাহ, এই কথাও আল্লাহ বলে দিয়েছেন কুরআনে!
তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো?
জাহান্নামকে স্থায়ী আবাসস্থল তো না, সাময়িক অবস্থানস্থল ও না বরং দুআ করবো যে এর ক্ষীণতম শব্দও যেন শোনা না লাগে।
আমরা কি এভাবে দুআ করি?
নাকি ভাবি যে আরে কালিমা পড়েছি, গোণা গুণতি কয়েকদিন মাত্র জাহান্নামে থাকতে হবে, Not a big deal?


আগামী দিনের করণীয়ঃ

১। জাহান্নামে অল্প কিছুদিন মাত্র থাকবো, এটা কোনো ব্যাপার না এমন চিন্তা কি আমরা জন্মগত মুসলিমরাই প্রথম করছি? এহেন ধারণার ব্যাপারে কুরআন কী বলছে? (Hint: সূরা বাক্বারার ৭০-৮৫ নং আয়াত পড়তে হবে)
২) এমন কি হতে পারে যে পরিমাণ আমল করে আমরা সন্তুষ্ট থাকছি, ভাবছি জান্নাতে চলে যাবো সেটা আসলে পাশ মার্কের নিচে? কুরআনের কোন সূরাতে ন্যুনতম পাশ মার্কের ব্যাপারে ধারণা দেয়া হয়েছে? (Hint: শেষের ১২টা সূরার মাঝে কোনো একটা সূরা)

পর্ব ৯

আশা করি গত পর্ব থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে স্রেফ অবস্থান স্থল হিসেবেই জাহান্নাম একটা ভয়ংকর জায়গা,খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও। এই নির্মম সত্যটা আমরা যখন বুঝি না, তখন আমাদের জীবনাচরণে সেটার প্রকাশ কিভাবে ঘটে?
১. আমরা ভাবি আরে অল্প কিছুদিন জাহান্নামে যদি থাকতেও হয় সেটা এমন কী ব্যাপার, ultimately তো জান্নাতে যাবই!
২. আমরা সামান্য কিছু ভুলের জন্য/ পান থেকে চুন খসলেই অন্য সবাইকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেই, ভাবি যে আমরা নিজেরাই খালি জান্নাতে যাবো
ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে এই দুইটা স্বভাবই কুরআনে খুব নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, আমাদের পূর্বসুরীদের ভুল হিসেবে। যেমন প্রথম পয়েন্টটা এসেছে সূরা বাক্বারার ৮০ নং আয়াতে, আর ২য় পয়েন্টটা এসেছে ১১১ নং আয়াতে। আলহামদুলিল্লাহ, গত পর্বের উত্তরে অনেকেই সেটা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন।
এখন আসুন এই আয়াতদুটিকে একটু বিশ্লেষণ করা যাক। ১১১ নম্বর আয়াতে যেটা বলা হয়েছে সেটা কিন্তু আমরা অহরহ করি। কিভাবে? এই যে সারাক্ষণ অমুক স্কলার, তমুক বক্তা এদের বিরুদ্ধে মানুষকে সতর্ক করতে থাকি, একবারও কি ভেবেছি যে এইভাবে দ্বীন ইসলামকে আমরা কতটা টুকরা টুকরা করে দিচ্ছি?
একমাত্র নিজেরাই সঠিক আর বাকি সবাই পথভ্রষ্ট এইরূপ চিন্তা ভাবনাকে কুরআন কী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে?
أَمَانِيَّ ‘মিথ্যা আশা ‘
এটা কখন গড়ে ওঠে আমাদের মধ্যে?
কুরআন সেটাও আমাদেরকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে – যখন আমরা উম্মি বা নিরক্ষর হই! ( সূরা বাকারার ৭৮ নং আয়াত দ্রষ্টব্য)
সেজন্যই গত পর্বে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে কোন সূরায় পাশ মার্কের কথা বলা হয়েছে?
জ্বী, সবাই ঠিকই ধরেছেন যে সূরা আসরে পাশ মার্কের কথা বলা হয়েছে কারণ এখানে কোনো পুরস্কারের কথা নাই, কিভাবে চরম ক্ষতি থেকে বাঁচা যাবে শুধু সেটার কথা বলা হয়েছে।
এখন আসুন নিজেকে প্রশ্ন করি – আমি কি জান্নাত/ জাহান্নামে যাওয়ার criterion আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ থেকে জানি নাকি নিজেদের মত একটা কিছু বানিয়ে নিয়েছি? ব্যাপারটা এমন না তো যে আমি ভাবছি ৩৩ পেলেই পাশ আর এই নিয়ে খুশি আছি, জানিই না যে আসলে হয়তো ৬০ এ পাশ?
আমরা যদি আসলেই নিজেদের বদলাতে চাই তাহলে কুরআনের পাতায় পাতায় আল্লাহ পূর্ববর্তীদের করে যাওয়া যে ভুলগুলোর ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সেগুলো আমরাও করছি নাকি সেটা চিনতে পারতে হবে। শিকড়ের সন্ধানে বইটাতে আমি বারবার সেটাই করার চেষ্টা করেছি।


আগামী দিনের চিন্তার খোরাক:
”আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের পুত্রদেরকে। আর নিশ্চয়ই তাদের একটি সম্প্রদায় জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে (2:146)”
আশা করি সবাই বুঝতে পারছেন যে এখানে আহলে কিতাবদের কথা বলা হচ্ছে যারা নবীজিকে সত্য নবী হিসেবে বুঝতে পেরেও অস্বীকার করেছিল।
এখন আমরা, আজকের মুসলিমরা এই আয়াতটাকে কিভাবে দুআতে পরিণত করতে পারি?
Any idea?
কোনো কাল্পনিক/ সত্য ঘটনা/ প্রেক্ষিতসহ বললে ভালো

পর্ব ১০


গত পর্বে বলেছিলাম যে মিথ্যা আশা তৈরি হয় অজ্ঞতা থেকে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে সতর্কীকরণ কালচারের নামে মানুষের গায়ে বিভিন্ন ট্যাগ লাগাতে আমরা যতটা ব্যস্ত, সাধারণ মানুষকে অজ্ঞতার চক্র থেকে বের করে আনতে আমাদের যেন ঠিক ততটাই অনাগ্রহ! তাই নি:সন্দেহে মিথ্যা আকাঙ্ক্ষার এই চক্র থেকে আমরা যেন বের হতে পারছি না!
কিন্তু জ্ঞান অর্জনই কি শেষ কথা?
যদি সত্য বোঝার পরও আমল না করি?
জ্বী,গত পর্বে উল্লেখিত চিন্তার খোরাকের মূল থিম হচ্ছে জেনে বুঝে সত্যকে অস্বীকার করা। এই আয়াতের আবেদন অবশ্যই তৎকালীন ইহুদীদের মধ্যে সীমিত না যারা নবীজীর নবুয়্যতকে অস্বীকার করেছিল।
আমাদের সময়ে এই আয়াতকে কিভাবে প্রয়োগ করতে পারি?
আসেন চিহ্নিত করার চেষ্টা করি যে আমার জীবনে কি এমন কোনো কাজ আছে যেটা হারাম/ আল্লাহর খুব অপছন্দনীয় এটা শতভাগ জেনেও আমি সেটাতে লিপ্ত আছি বা সেটার পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করছি?
এই মুহূর্তে আমার যেসব উদাহরণ মনে পড়ছে সেগুলো সবই আয় রোজগার সংক্রান্ত। ধরেন আপনি খুব ভালো করেই জানেন যে সুদ হারাম বা আপনি ঠিকই বুঝতে পারেন যে সমাজে এটা কিভাবে বিষ বাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারপরও আপনি সুদী ব্যাংকে কাজ করছেন অথবা বলছেন যে এই সুদ সেই সুদ না ইত্যাদি নানা কথা…
আবার ধরেন আপনি প্রবাসে কোনো গ্যাস স্টেশনের মালিক, সেখানে আপনি অ্যালকোহল বিক্রি করেন। আপনি নিশ্চিত জানেন যে এটা হারাম, তাও আপনি নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছেন যে এটা না বেচলে আমার এখানে কেউ গ্যাস নিতে আসবে না, এটা ছাড়া আমার উপায় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি।
উপরের এই দুটি পরিস্থিতিতেই কিন্তু আমরা নিজের অজান্তেই তৎকালীন ইহুদীদের মতই আচরণ করছি, তাই না?
কুরআন আমাদের পূর্ববর্তীদের যেসব ঘটনা উল্লেখ করেছে সেগুলো আমাদের জীবনে tuning করাটা কিন্তু খুবই জরুরি! আগামী দিন এমন আরেকটা এক্সারসাইজ করলে কেমন হয়?
আমরা সবাই হয়তো সূরা বাকারায় উল্লেখিত ঘটনাটা জানি যেখানে মুসা আলাইহিস সালামের কওমকে একটা গরু জবাই করতে বলা হয়েছিল, একটা খুনের ঘটনায় আসল খুনীর পরিচয় জানানোর প্রেক্ষিতে।
এই ঘটনাটা থেকে যে শিক্ষণীয় বিষয় আমরা সবচেয়ে হাইলাইট করি সেটা হচ্ছে অতিরিক্ত প্রশ্ন করা যাবে না, প্রশ্ন করা খারাপ।
কিন্তু আজকে আমরা একটু অন্য আঙ্গিকে ঘটনাটা বিশ্লেষণ করবো ইনশাল্লাহ।


আগামী দিনের চিন্তার খোরাক:

১) যে কোনো প্রশ্ন করাই কি অপছন্দনীয়? তাহলে আল্লাহ যে কুরআনে বারবার চিন্তা করতে বলছেন?
২) ফেরেশতারাও তো আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করেছিল যে কেন দুনিয়াতে খলিফা সৃষ্টি করতে হবে! ওদের করা প্রশ্নের সাথে বনী ইসরাঈলের করা প্রশ্নের কি কোনো গুণগত পার্থক্য ছিল?
৩) আল্লাহ কেন গরু জবাই করতে বললেন? ঘোড়া/ উট/ ছাগল/ ভেড়া এগুলো কিছু না কেন? গরু জবাই করতে বলার সাথে কি বেশি প্রশ্ন করার কোনো সম্পর্ক আছে বা থাকতে পারে? (Hints: বাছুর পূজার ঘটনা এটার আগে ঘটেছিল নাকি পরে? সূরা বাকারার ৯৩ নং আয়াত থেকে কি কিছু বোঝা যায়?)

পর্ব ১১

কুরআনের অনুবাদ পড়ার সময় পূর্ববর্তীদের ঘটনাগুলোর সাথে আমাদের নিজেদের জীবনের যোগসূত্র স্থাপন করতে না পারলে কুরআন কখনো আমাদের মাঝে জীবন্ত হবে না। সেজন্যই এত জোর দিচ্ছি বনী ইসরাইলদের কাহিনী গুলোতে।
আমরা যদি কুরআনের প্যাটার্ন লক্ষ করি তাহলে দেখবো বারবারই আল্লাহ আমাদেরকে ঈমান আনার পিছনে যুক্তি দেখাচ্ছেন। মাক্কী সূরাগুলো অধিকাংশই এমন, আল্লাহকে চেনানো হচ্ছে, পরকাল কেন নিশ্চিত সেটার পিছনে কারণ দেখানো হচ্ছে। সূরা নাবা, নাজিয়াত, নুহ এগুলো যে কোনটা পড়লেই এটা স্পষ্ট হবে ইনশাল্লাহ। এই ব্যাপারটা দারুন লাগে আমার কাছে! তারপর বারবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছে আফালা তা’কিলুন? মানে তোমরা কি চিন্তাভাবনা করো না?
তাই আমি কখনোই বিশ্বাস করি না যে ইসলাম পালন কোনো অন্ধ বিশ্বাস থেকে প্রসূত বা এটা জোর করে চাপিয়ে দেয়ার জিনিস। আমরা এটার সৌন্দর্যটা বুঝতে পারি না তাই ভয় পাই, প্রশ্নের উত্তর জানি না দেখে প্রশ্ন করাকেই নিরুৎসাহিত করি। যদি উত্তর জানতাম তাহলে বুঝতাম যে প্রশ্ন করা মাত্রই খারাপ কিছু না বরং all what matters is attitude।
জ্বী, আবারও বলছি, এখানে key point হচ্ছে attitude.
সূরা বাকারার ৩০ নম্বর আয়াত ভালো ভাবে পড়লেই আমরা বুঝব যে ফেরেস্তারা কতটা আদব নিয়ে প্রশ্ন করেছিলো। তাদের উদ্দেশ্য আল্লাহকে question করা ছিল না বরং এটা ছিল Inquisitivenes এর প্রকাশ।
নবীজীর জীবনেও আমরা দেখবো যে আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা প্রচণ্ড inquisitive ছিলেন যেটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম খুব পছন্দও করতেন। আর উনার প্রশ্ন গুলো যে খুব ব্রিলিয়ান্ট ছিল তাতো বলাই বাহুল্য। (এটা আজকের যুগে parenting এর জন্য খুব জরুরী, কারণ বাচ্চাদের inquisitiveness কে দমন করা একদমই উচিৎ না)
এখন আসি বাকারার ঘটনায়। যদিও আমরা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারি না, তবে এটা হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল যে এই ঘটনা বনী ইসরাইলের বাছুর পূজার ঘটনার পরে ঘটেছিল। তাই এটা খুবই সম্ভব যে গরুর প্রতি ওদের হৃদয়ে একটা attachment রয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ সেটার কথা জানতেন বলেই ওদেরকে গরু জবাই করতে বলেছিলেন, অন্য কিছু না। সেটা করতে চাচ্ছিলো না বলেই আসলে ওরা এত প্রশ্ন করে এত ধানাই পানাই করছিলো, ওরা আসলে এই অপ্রীতিকর কাজটা এড়াতে চাইছিল। আবার গরু জবাই করার সাথে প্রকৃত খুনি খুঁজে বের করার সম্পর্ক বুঝতে পারছিলো না এজন্য মানতে চাচ্ছিলো না সেটাও ছিলো আরেকটা কারণ (এই দ্বিতীয় কারণটা নিয়ে আমি শিকড়ের সন্ধানে বইতে বিস্তারিত আলোচনা করেছি যে কিভাবে ইসলামের নানা আইনের পিছনের কল্যাণ নিয়ে প্রশ্ন করা/ গবেষণা করা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় কিছু না, তবে আবারো Attitude হচ্ছে মূল ফ্যাক্টর)
আচ্ছা আমরাও কি এমন করি? পছন্দ করি এমন কিছু হারাম জানার পর কি নানা loop hole খোঁজার চেষ্টা করি সেটার উপর যেন আমল না করতে হয় সেজন্য?


আগামী দিনের করণীয়:
১)সূরা শুআরা (২৬ নং সূরা) পড়বো ১৬ আয়াত থেকে। এখানে মুসা আলাইহিস সালামের সাথে ফিরাউনের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। মুসা ফিরাউনকে দুইটা অপশন দিলো। প্রতিউত্তরে ফিরাউন কী বললো? সে কি মুসা আলাইহিস সালামের অফারের ব্যাপারে কিছু বললো নাকি distract করতে চাইলো? করলে কিভাবে?
২) আমরা সেক্যুলার জীবন থেকে ফিরে ইসলাম প্র্যাকটিস শুরু করতে চাইলে আশে পাশ থেকে কি অনুরূপ আচরণের স্বীকার হই? কোনো উদাহরণ, কেস স্টাডি মনে পড়ছে?
৩) মুসা আলাইহিস সালামের উত্তর থেকে আমরা কি শিখি যে কিভাবে এহেন পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে? কী সেই কৌশল?

পর্ব ১২


ঘটনা ১: আচ্ছা তোমার না অ্যাফেয়ার ছিল? তোমরা তো মনে হয় অনেক intimate ছিলা? এখন কি অন্য কাউকে বিয়ে করেছো?
ঘটনা ২: খুব যে এখন পর্দা নিয়ে বড় বড় জ্ঞান দিচ্ছিস, তুই নিজে কয়েকদিন আগে কী ছিলি মনে আছে? স্লিভলেস ড্রেস পরা ছবি যে নিউজফিড জুড়ে ঘুরে বেড়াতো সেটা আমরা ভুলে যাই নাই!
ঘটনা ৩: আমাদের খেয়ে আমাদের পরে এখন খুব ধর্মের কথা শুনাচ্ছ মনে হয়? তোমার বাবার অসুস্থতার সময় আমরা কত টাকা দিয়েছি মনে আছে? আমরা না থাকলে তো হাসপাতালের মেঝেতেই পড়ে থাকতে হইতো!
উপরের ঘটনাগুলো কি পরিচিত মনে হয়? সেক্যুলার জীবন থেকে ইসলামের বুঝ আসার পর কাউকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে গেলে আমাদের মোটা দাগে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়! কী সেটা?
১) আমাদের অতীত উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনের কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়া হয়
২) কে কখন আমাদের কী উপকার করেছে সেটার লিস্ট ধরিয়ে দেয়া হয়
আসুন এবার সূরা শুআরার (২৬ নং সূরা) ১৬ আয়াত থেকে পড়ি যেখানে মুসা আলাইহিস সালামের সাথে ফিরাউনের কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। আমরা কি টের পাচ্ছি যে ফিরাউন ঠিক এই দুটো কাজই করেছিল? মুসা আলাইহিস সালাম যে হত্যা করেছিলেন এবং সে ফিরাউনের প্রাসাদে বড় হয়েছে সেটা মনে করিয়ে দিচ্ছে। অথচ দেখুন মুসার দেয়া প্রস্তাবের সাথে এই দুই টপিকের দূরতম সম্পর্ক নাই। ফিরাউনের উদ্দেশ্য তাহলে কী?
মুসা আলাইহিস সালামকে বিব্রত করা, ফোকাস থেকে সরিয়ে দেয়া।
নবী মুসা কি সেই ফাঁদে পা দিলেন?
অবশ্যই না। উনি কিভাবে হ্যান্ডেল করলেন?
উনি দোষ স্বীকার করে নিলেন, কিন্তু আল্লাহকে পিকচার থেকে সরালেন না। বললেন যে আল্লাহই উনাকে হিদায়েত দিয়েছেন। সাথে খুব সুকৌশলে, পরোক্ষভাবে আরেকটা তথ্য দিলেন – যখন ফিরাউনকে ভয় পেতেন, তখন পালিয়ে গিয়েছিলেন।
মানে কী?
এখন ফিরে এসেছেন, মানে এখন আর ভয় পান না!
সাথে আলতো করে এটাও মনে করিয়ে দিলেন যে ফিরাউনের প্রাসাদে উনার বড় হওয়ার নেপথ্য কারণ ছিল বনী ইসরাইলের উপর ওর করা অত্যাচার।
আমরা কি দেখলাম যে কিভাবে মুসা আলাইহিস সালাম উনার প্রাথমিক দুটো অফার থেকে ফোকাস সরালেন না? একবার আল্লাহর প্রসঙ্গ আনলেন, আরেকবার বনী ইসরাইলের।
দারুন না ব্যাপারটা?
এভাবে কি কুরআন পড়ি আমরা?
যদি পড়তাম তাহলে ইসলামে আসার পর কি কথার বানে জর্জরিত হওয়ার ভয়ে সামাজিক মেলামেশা ত্যাগ করতাম নাকি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতাম হ্যাঁ, ভুল করেছি, কিন্তু আল্লাহ হিদায়াত দিয়েছেন, রাহমানুর রাহীম তওবা কবুল করেছেন এই আস্থা আছে!
আর যদি খোটা দেয় কেউ অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করে?
সেটার ব্যাপার কী করণীয় আমাদের প্রেক্ষিতে? তখন কি আমরা ফোকাস হারাতে পারি? কুরআন থেকে গাইডলাইন আছে কোনো?


আগামী দিনের করণীয়: সূরা বাকারার ২৬১-৬৫ আয়াত পড়বো, আত্মস্থ করার চেষ্টা করবো।
এখানে কী উপমা দেয়া হয়েছে? উপমাটা নিয়ে কি একটু চিন্তা করছি আমরা? এটা কি আমাদের চারপাশের প্রকৃতির মধ্য থেকেই আল্লাহকে, পরকালকে চিনে নিতে সাহায্য করে?
এই আয়াত গুলোকে কিভাবে দুআতে পরিণত করতে পারি?

পর্ব ১৩

গত পর্বে যেসব আয়াতের কথা বলেছিলাম সেখানে অনেকগুলো উপমা আছে। ২৬১ নং আয়াতে আল্লাহর রাস্তায় দানের প্রতিদান যে কত শত গুণ হবে এটা বলা হয়েছে। ২৬৫ নং আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি যে দান করা হলে টাকার পরিমাণ মুখ্য বিষয় না বরং অন্তরের অবস্থা ও আন্তরিকতাটুকুই আসল।

তবে এর মাঝে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে ২৬৪ নং আয়াতের উপমাটা। একই সাথে হৃদয় ছোঁয়া ও ভয়ের। আমরা জানি যে মাটিতে বৃষ্টি পড়লে সেখান থেকে গাছ জন্মায়। কিন্তু যদি সেটা পাথরের উপর হয় যাতে বৃষ্টিতে বরং মাটি ধুয়ে মুছে গিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে আসে?

জ্বী, এখানে আমাদের আমলনামার কথাই বলা হচ্ছে যেটা আসলে দানের কারণে বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু খোটা দিয়ে আমরা সেটাকে আগের অবস্থায় নিয়ে চলে আসি।

আচ্ছা এই বিষয়টা কি অন্য উপকারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য? ধরেন কেউ অসুস্থ ছিল, তাকে আপনি রাত জেগে সেবা করেছেন, অথবা কারো বিপদের সময় আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছেন, সেটা নিয়ে পরে কথা শুনালেও কি সেই সৎকর্ম ব্যর্থ হয়ে যাবে?

আমি জানি না। যেহেতু এই আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে আল্লাহর রাস্তায় দান করার কথা বলা হয়েছে, তাই অন্য উপকারের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য হবে নাকি সেটা স্কলাররা বলতে পারবেন তবে আমি এটা খুব ভয় পাই – আমল ব্যর্থ হয়ে যাওয়া অথচ সেটা টেরও না পাওয়া।

এটা আমার একটা নিয়মিত দুআ – আল্লাহ আমার কোনো কাজের কারণে কি আমার সব আমল নিজের অজান্তেই ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে?এমনটা হওয়া থেকে আশ্রয় চাইতে থাকি!

আচ্ছা আমরা কেন উপকার করার পর কাউকে কথা শুনাই? এখানে কী সাইকোলজি কাজ করে?
আমার সীমিত বুদ্ধি বলে যে আমরা অপর পক্ষের কাছ থেকে বিনিময় চাই, সেটা হতে পারে প্রশংসা, আনুগত্য বা পাল্টা উপকার আশা করার মাধ্যমে। সেটা যদি না পাই, আমাদের মাথা নস্ট হয়ে যায়, মনে করিয়ে দিতে থাকি যে কার জন্য কবে কখন কী করেছি।

কিন্তু কারো উপকার করলে সেও আমার সাথে ভালো ব্যবহার করবে/ মনে রাখবে/ পাল্টা উপকার করবে এটা কি সবসময় হয়? তাহলে তো অকৃতজ্ঞতা, কৃতঘ্নতা এই শব্দগুলো অভিধানে থাকতো না।

আচ্ছা কুরআন কি আমাদের কৃতজ্ঞতা, অকৃতজ্ঞতা, কৃতঘ্নতা এই সবগুলোর উদাহরণ দিচ্ছে? মুসা আলাইহিস সালামের জীবন থেকে?

আসুন একটু চিন্তা করে খুঁজে বের করি সবগুলোর উদাহরণ।

Hints: বনী ইসরাঈলের সমস্ত আচরণ আমার কাছে অকৃতজ্ঞতার উদাহরণ। বারে বারে ওরা মুসা আলাইহিস সালামকে কষ্ট দিয়েছে যদিও উনি এসেছিলেন ওদেরকে ফিরাউনের কবল থেকে উদ্ধার করতে।
বাকিগুলোর উদাহরণ কি মনে পড়ছে?

শেষ পর্ব:

সূরা সফের ৫ নং আয়াতে মুসা আলাইহিস সালামের একটা উক্তি তুলে ধরা হয়েছে – মুসা তার ক্বওমকে বলছেন যে তোমরা আমাকে কষ্ট দাও কেন যেখানে জানো যে আমি তোমাদের জন্য প্রেরিত আল্লাহর রাসূল!  কথাটার মধ্যে একটা তীব্র আকুতি আছে যা মনকে বিষন্ন করে। সত্যিই তো, আমরা যদি বিস্তারিতভাবে পড়ি, দেখবো যে  বনী ইসরাঈল পদে পদে নবী মুসার সাথে চরম অকৃতজ্ঞের মত আচরণ করে গেছে।

শুধু কি অকৃতজ্ঞতা? স্বজাতির একজনকে বাঁচাতে গিয়ে ভুলক্রমে  হত্যা করে ফেলেন এক মিশরীয়কে। অথচ সেই ব্যক্তিই প্রকাশ্য দিবালোকে সবাইকে জানিয়ে দেয় হত্যাকারীর পরিচয়! ফলশ্রুতিতে জীবন বাঁচাতে মুসাকে ত্যাগ করতে হয় মিশরের সীমানা। এটা কি চরম কৃতঘ্নতা নয়?

আচ্ছা এই ঘটনার পর মুসা আলাইহিস সালামের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? আর নয় আগ বাড়িয়ে মানুষকে সাহায্য করতে যাওয়া – এমনটাই কি ছিল উনার সিদ্ধান্ত?

নাহ!

আশ্চর্যজনকভাবে মাদইয়ান পৌঁছেই একদম প্রথম সুযোগেই সাহায্য করলেন দুই বোনকে যারা তাদের পশুকে পানি পান করাতে বেগ পাচ্ছিলো। ব্যাস, আর উনাদের মাধ্যমেই আল্লাহ খুলে দিলেন অভাবনীয় রিযিকের দরজা।

এভাবে মুসা আলাইহিস সালামের জীবনে আমরা দেখি – কৃতজ্ঞতা, অকৃতজ্ঞতা আর কৃতঘ্নতা সব ধরনের অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সমাবেশ।

আমাদের জীবনে এটার প্রয়োগ কী?

নশ্বর এই জীবনে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব হয়তো আমরা সবাই করি। কেউ কম, কেউ বেশি! অপ্রাপ্তির খাতায় মূলত থাকে মানুষের অকৃতজ্ঞ আচরণ। অমুকের জন্য এই করেছি সেই করেছি বিনিময়ে পেয়েছি অপমান বা নির্লিপ্ততা ইত্যাদি।

আমরা যখন কারো জন্য কিছু করি তখন সেটা কেন করি এটা কি স্পষ্ট আমাদের কাছে?  বিনিময়ে কি আমাদের ওই ব্যক্তির কাছ থেকে আশা করা উচিত নাকি আল্লাহর কাছ থেকে?

কারোর কোনো উপকার করলে এই দুনিয়াতে কি কিছুই আশা করা যাবে না?

এই বিষয়টা বোঝা খুব জরুরী মনে হয় আমার কাছে।

আমরা যখন কারো কোনো উপকার করবো সেটা হতে পারে টাকা দিয়ে বা সেবা করে বা বিপদে পাশে থেকে, তখন প্রাথমিকভাবে বিনিময় আশা করবো আল্লাহর কাছে, পরকালে। তবে মাথায় রাখবো যে এটার কিছু পুরস্কার আমরা এই দুনিয়াতেই পাবো, তবে সেটা এই মানুষের দ্বারা নাও হতে পারে, হয়তো অন্য কারো দ্বারা।

উদাহরণ দেই। ধরেন কারো অসুস্থতার সময় আপনি রাত জেগে তার অনেক সেবা করেছেন। এমন কখনো আশা করবেন না যে আপনি অসুস্থ হলে সে সেবা করবে, কিন্তু ইনশাল্লাহ আল্লাহ কাউকে পাঠাবেন আপনার প্রয়োজন পূরণে, যার জন্য আপনি হয়তো কিছু করেন নি। অংকের ভাষায় বলতে গেলে সম্পর্কটা এখানে one to one function না। আর এটাও মাথায় রাখবো যে মানুষকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করা কখনোই সম্ভব না, অথচ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা খুবই সহজ। মানুষের মন জুগিয়ে চলার এক অসম্ভব যাত্রায় যেন নিজেদের সময়, এনার্জি সব কিছু শেষ করে না দেই।

জীবনের এই সহজ হিসাবটা যদি আমরা একবার ব্রেনে গেঁথে নিতে পারি তাহলে আমাদের জীবনের অনেক হাহাকার দূর হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

আমাদের সাথে করা কারো অকৃতজ্ঞ আচরণ দেখে যদি দম বন্ধ লাগে তবে আসুন নিজের দিকে তাকাই: আমরা নিজেরা কি আমাদের রবের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ নই?

Let’s ponder over Quran সিরিজ এবারের মত এখানেই সমাপ্ত। এটা আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটা প্রজেক্ট, আল্লাহ যেন তৌফিক দেন অনেক বড় কিছু করার।

রমাদ্বানে যে কুরআনকে হাতে তুলে নিয়েছি তা যেন আবারও শেলফে তুলে না রাখি, কুরআনের অবস্থান হোক আমাদের প্রতিদিনের জীবনে, একীভূত রূপে।

আল্লাহ কবুল করে নিন এই রমাদ্বানে আমাদের ছোট বড় সব আমল গুলো, তাদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত না করেন যারা রমাদ্বান পেলো কিন্তু গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারলো না!

(সমাপ্ত)


লেখাটি শেয়ার করতে পারেন